মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোর একটি হলো বৈবাহিক সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের ওপর একটি সুখী পরিবার প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে পরকীয়া একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা শুধু একটি দাম্পত্য সম্পর্ককেই ধ্বংস করে না; বরং পরিবার, সন্তান এবং সমাজের স্থিতিশীলতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইসলামে পরকীয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 'তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।' (সুরা ইসরা: ৩২)
পরকীয়া থেকে বেঁচে থাকার দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ের। তবে একজন নেককার ও প্রজ্ঞাবান স্ত্রী তার আচরণ, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে স্বামীকে ঘর ও পরিবারের প্রতি অধিক আকৃষ্ট রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
আল্লাহভীতি ও দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তোলা
পরকীয়া থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আল্লাহভীতি। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে আল্লাহ তাকে সর্বদা দেখছেন এবং তার প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে, সে হারাম সম্পর্কের দিকে সহজে ঝুঁকবে না। তাই পরিবারে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি আলোচনা এবং সন্তানদের ইসলামী শিক্ষায় গড়ে তোলার মাধ্যমে ঘরে একটি বরকতময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এমন পরিবেশ মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে।
স্বামীর হক যথাসম্ভব আদায় করা
ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একজন স্ত্রী যখন স্বামীর বৈধ চাহিদা, প্রয়োজন ও অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হন, তখন স্বামী সংসারের প্রতি আরও অনুরক্ত হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে দয়া, মমতা ও ভালোবাসার ভিত্তিতে পরিচালিত করার শিক্ষা দিয়েছেন। তাই স্বামীর প্রতি দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হওয়া দাম্পত্য সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করা
অনেক সময় মানুষ মনে করে ভালোবাসা শুধু অন্তরে থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু ভালোবাসা কথায় ও কাজে প্রকাশ করাও প্রয়োজন। স্বামীকে সম্মান দেওয়া, তার ভালো কাজের প্রশংসা করা, তার কষ্ট ও পরিশ্রমের মূল্যায়ন করা—এসব বিষয় সম্পর্ককে গভীর করে। একজন পুরুষ যখন ঘরে সম্মান ও ভালোবাসা পায়, তখন সে বাইরের অবৈধ সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
নিজের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি খেয়াল রাখা
ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। স্বামীর জন্য পরিপাটি ও আকর্ষণীয় থাকা একজন স্ত্রীর সুন্দর গুণ। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, 'আমি যেমন আমার স্ত্রীর জন্য নিজেকে সাজাতে পছন্দ করি, তেমনি আমার স্ত্রীও আমার জন্য সাজুক তা পছন্দ করি।' তাই পরিচ্ছন্ন পোশাক, সুন্দর ব্যবহার ও পরিপাটি জীবনযাপন দাম্পত্য সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অযথা ঝগড়া ও কটূক্তি পরিহার করা
প্রতিনিয়ত ঝগড়া-বিবাদ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং অপমান সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তা সমাধান করতে হবে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।' দাম্পত্য জীবনে কোমলতা ও ক্ষমাশীলতা সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী ও সুখময় করে।
ভালো সঙ্গ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা
মানুষ তার বন্ধু ও সঙ্গীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। অনেক সময় খারাপ বন্ধুবান্ধব ও অনৈতিক পরিবেশ মানুষকে পরকীয়ার দিকে ধাবিত করে। তাই স্বামীকে সৎ, দ্বীনদার ও চরিত্রবান মানুষের সান্নিধ্যে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। ইসলামী মাহফিল, মসজিদকেন্দ্রিক কার্যক্রম এবং নেককার মানুষের সঙ্গ একজন ব্যক্তির চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সন্দেহ নয়, বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করা
অমূলক সন্দেহ দাম্পত্য জীবনের একটি বড় সমস্যা। অতিরিক্ত সন্দেহ অনেক সময় এমন সম্পর্কও নষ্ট করে দেয় যেখানে কোনো অপরাধই ছিল না। ইসলামও অযথা সন্দেহ করতে নিষেধ করেছে। তাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, স্বচ্ছতা ও খোলামেলা যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। বিশ্বাস একটি সম্পর্ককে শক্তিশালী করে, আর সন্দেহ তা দুর্বল করে দেয়।
সংসারকে শান্তির ঠিকানা বানানো
কর্মব্যস্ত জীবনের নানা চাপ ও ক্লান্তির পর একজন মানুষ ঘরে শান্তি ও স্বস্তি খোঁজে। স্ত্রী যদি হাসিমুখে স্বামীকে গ্রহণ করেন, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং ঘরে প্রশান্তির পরিবেশ বজায় রাখেন, তাহলে স্বামী ঘরের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হবে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে 'সাকিনা' বা প্রশান্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই সংসারকে কলহের নয়, শান্তির নীড় বানানো প্রয়োজন।
একসাথে ইবাদত করা
স্বামী-স্ত্রী যখন একসাথে ইবাদত করেন, তখন তাদের আত্মিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। একসাথে সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার এবং দ্বীনি আলোচনা পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। যে পরিবার আল্লাহর স্মরণে জীবন্ত থাকে, সেখানে শয়তানের প্রভাব কমে যায় এবং পরকীয়ার মতো গুনাহের পথও সংকুচিত হয়ে আসে।
স্বামীর জন্য বেশি বেশি দোয়া করা
হেদায়েত ও নেক আমলের তাওফিক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই একজন স্ত্রীর উচিত স্বামীর ঈমান, তাকওয়া, চরিত্রের পবিত্রতা এবং গুনাহ থেকে হেফাজতের জন্য নিয়মিত দোয়া করা। দোয়া মুমিনের শক্তিশালী অস্ত্র। আল্লাহ তাআলা আন্তরিক দোয়া কবুল করেন এবং বান্দার জন্য কল্যাণের পথ সহজ করে দেন।
সমাজের জন্য আদর্শ পরিবার
পরকীয়া থেকে বাঁচার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহভীতি, চরিত্রের পবিত্রতা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং দাম্পত্য ভালোবাসা। একজন স্ত্রী তার সুন্দর আচরণ, প্রজ্ঞা, আন্তরিকতা ও দ্বীনি চেতনার মাধ্যমে স্বামীকে পরিবারের প্রতি অধিক আকৃষ্ট রাখতে পারেন। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, পরকীয়া থেকে বেঁচে থাকার দায়িত্ব শুধু স্ত্রীর নয়; স্বামীরও নিজের দৃষ্টি, মন ও চরিত্রকে সংযত রাখা ফরজ দায়িত্ব। যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আল্লাহকে ভয় করে একে অপরের হক আদায় করেন, তখন তাদের সংসার সুখ, শান্তি ও বরকতে পরিপূর্ণ হয়। এমন পরিবারই সমাজের জন্য আদর্শ এবং পরকীয়ার মতো ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ।
লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর।

