মুহাল্লাব একটি নাম, একটি ইতিহাস। এক নামেই যার পরিচয়। এই তল্লাটে এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তার নাম শোনেনি কিংবা আলিশান প্রাসাদের মতো তার বাড়িটি চেনে না। অজস্র ধন-সম্পদ আর বিত্তের প্রাচুর্যে মুহাল্লাবের জীবন ছিল মধ্যগগনের সূর্যের মতো দীপ্তিময়। কিন্তু আলো যেমন আসে, তেমনি আলোর সাথে ছায়াও আসে। এই বিপুল ঐশ্বর্যের পরিমাণের ফলে তার অন্তরে দানা বেঁধেছিল এক পর্বতপ্রমাণ অহংকার!
তিনি যখন মস্তক উন্নত করে রাজপথে হাঁটতেন, তখন তার রাজকীয় চালচলনে মিশে থাকত এক তীব্র দম্ভ।
মুহাল্লাবের আরও একটি সুখ্যাতি কিংবা কুখ্যাতি ছিল তার সুগন্ধির বিলাসবহুল অভ্যাসে। তিনি যখনই মহল থেকে বের হতেন, শরীর মাখিয়ে নিতেন এমন এক দুর্লভ ও দামি আতরে, যার সুবাস পুরো বাতাসের বুকে তোলপাড় সৃষ্টি করত। লোকে বলত, কোনো দৃষ্টিহীন মানুষও কেবল বাতাসের সেই ঘ্রাণ শুঁকে বলে দিতে পারত, এখন মুহাল্লাব যাচ্ছেন।
তেমনই এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে, রেশমি ও মহামূল্যবান পোশাক পরিধান করে, অনুচরদের এক বিশাল দল নিয়ে রাজপথে বের হলেন মুহাল্লাব। তার গায়ে জড়ানো রাজকীয় রাজপোশাক আর চারপাশের সুগন্ধির তীব্রতায় পুরো পথচারী মহল থমকে দাঁড়াল। সবাই মুগ্ধ ও বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “ওই দেখো, আমাদের অধিপতি মুহাল্লাব যাচ্ছেন!” চারপাশের এই স্তুতি আর প্রশংসার সৃষ্টি মুহাল্লাবের ভেতরের অহংকারকে যেন আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
ঠিক তখনই, রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণবসন পরিহিত এক খোদাতরু সাধক, আল্লাহর এক ওলি এই দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। মানুষের এই আত্মঅহংকার ও দম্ভ দেখে তার অন্তর কেঁদে উঠল। তিনি ভিড় ঠেলে খানিকটা এগিয়ে এলেন। তারপর অত্যন্ত কোমল অথচ এক মহাসত্যের গাম্ভীর্য মেশানো সুরে সাহসের সাথে ডেকে উঠলেন, “ওহে আল্লাহর বান্দা! একটু থমকে দাঁড়াও। এই দম্ভ পরিহার করো। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ কোনো অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
হঠাৎ এমন মন্তব্যে পুরো রাজপথ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। থমকে দাঁড়ালেন মুহাল্লাবও। পথিকের এমন দুঃসাহস দেখে পথচারীরাও এর পরিণাম কী হতে পারে তা নিয়ে ফিসফিস করতে লাগল।
অপমানে ও রাগে তার চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে লাল টকটকে হয়ে উঠল। ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে, তীব্র উপহাসের দৃষ্টিতে ওলির দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, “হে বুড়ো পথিক, স্পর্ধা তো কম নয়! বেটা, তুই জানিস আমি কে? কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস? আমাকে উপদেশ দেওয়ার দুঃসাহস তোকে কে দিল রে?”
চারপাশের মানুষ মুহাল্লাবের হুঙ্কার শুনে যখন ভয়ে কাঁপছিল, তখন সেই নির্ভীক সাধক পুরুষটি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক স্মিত, মায়াবী হাসির রেখা। তিনি শান্ত ও ধীর কণ্ঠে বললেন, “খুব ভালো করেই জানি তুমি কে। আজ যে পোশাকে আর সুগন্ধে তুমি চারপাশ মোহিত করছ, তার পেছনের সত্যটা আমি জানি। তোমার এই জীবনের শুরুটা হয়েছিল অত্যন্ত তুচ্ছ, এক ফোঁটা অপবিত্র পানি দিয়ে। মায়ের জঠরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সেই রক্ত আর তরল খেয়েই তুমি বড় হয়েছ; তখন তোমার কোনো অহংকার ছিল না। আর একদিন যখন মৃত্যুর অমোঘ ডাক আসবে, তখন কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হবে তুমি। এই সুন্দর, কমনীয় দেহ পচে-গলে মাটির পোকামাকড়ের খাদ্যে পরিণত হবে। আর এই দুই চরম শূন্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, তুমি পেটের ভেতরে দুর্গন্ধযুক্ত মলমূত্র বহন করে ফিরছ! এই তো তোমার প্রকৃত পরিচয়। তবে কিসের এত দম্ভ হে মানুষ? এই নশ্বর দেহ নিয়ে অহংকার কি তোমাকে আসলেই শোভা পায়?”
ওলির মুখ থেকে নিঃসৃত প্রতিটি শব্দ যেন তপ্ত সীসার মতো মুহাল্লাবের কানে গিয়ে বিঁধল। এতক্ষণের লালিত অহংকার, আভিজাত্যের গর্ব আর রাজকীয় বাহাদুরি এক নিমেষেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সত্যের এই আকস্মিক ও তীব্র আঘাত মুহাল্লাবের মনের গহীনে এক প্রচণ্ড তোলপাড় বা সুনামির সৃষ্টি করল। এক অজানা ঐশ্বরিক ভয় এবং গভীর অনুশোচনায় তার ও বুক কেঁপে উঠল। তিনি আর নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারলেন না; কাঁপতে কাঁপতে সংজ্ঞাহীন হয়ে ধূলিবালির মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
সেই ঘটনার পর থেকে, মুহাল্লাবের জীবনের মোড় চিরতরে ঘুরে গিয়েছিল। বিলাসবহুল পোশাক আর দম্ভের সুবাস ছেড়ে তিনি ধারণ করলেন বিনম্রতার চাদর। দুনিয়ার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আর কোনো মানুষ মুহাল্লাবকে মস্তক উন্নত করে অহংকারের সাথে চলতে দেখেনি।
এভাবেই পতন ঘটেছিল এক চরম অহংকারীর। কারণ, অহংকার কেবল মানুষের পতনই ডাকে না, তা সমস্ত পাপের উৎস। হাদিস শরিফে এসেছে, অহংকার হলো স্বয়ং মহান আল্লাহর চাদর বা পোশাকস্বরূপ। কোনো বান্দা যখন অহংকার করে, সে যেন আল্লাহর সেই চাদর বা পোশাক নিয়েই টানাটানি করার ধৃষ্টতা দেখায়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে রক্ষা করুন। আমিন। (তথ্যসূত্র: গীবত — আব্দুল হাই লাখনভী)
লেখক: সালনা, জয়দেবপুর, গাজীপুর। ইমেইল: jony90siddique@gmail.com

