সাত আসমান ও সাত জমিন
আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন ও মানবজীবনের শিক্ষা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৪:৫৯
আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে এমন এক নিখুঁত ও বিস্ময়কর শৃঙ্খলায় সৃষ্টি করেছেন, যার প্রকৃত গভীরতা মানুষের সাধারণ জ্ঞানের বাইরে। আসমান ও জমিনের বিশালতা, স্তরবিন্যাস ও সুনিপুণ ব্যবস্থাপনা আল্লাহর অসীম কুদরতেরই বহিঃপ্রকাশ। পবিত্র কোরআন মাজিদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তিনি সাত আসমান এবং অনুরূপ সাত জমিন সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টি শুধু দৃশ্যমান আকাশ বা পৃথিবী নয়; বরং এটি এক মহাব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রতিটি স্তর আল্লাহর হুকুমে পরিচালিত হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: "তোমাদেরকে অতি সামান্য জ্ঞানই দেওয়া হয়েছে।" (সূরা আল-ইসরা: ৮৫)
সাত আসমান: কোরআনের অকাট্য বর্ণনা
আসমানের সংখ্যা ও কাঠামো সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যিনি সাত আসমান স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন..." (সূরা আল-মুলক: ৩)"তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ কীভাবে সাত আসমান একটির ওপর আরেকটি সৃষ্টি করেছেন?" (সূরা নূহ: ১৫) "আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং জমিন থেকেও অনুরূপ..." (সূরা আত-তালাক: ১২)
এই আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয় যে, আসমানের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে সাতটি। প্রতিটি আসমান স্তরভিত্তিক ও সুবিন্যস্ত। সৃষ্টিজগৎ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত। প্রতিটি স্তর আল্লাহর কুদরত ও মহাবিশ্বের এক বিশাল ব্যবস্থাপনার অংশ।
সাত আসমান: সহিহ হাদিসের বাস্তব প্রমাণ
রাসূলুল্লাহ (সা.) মিরাজের রাতে এক মহান আধ্যাত্মিক সফরে সাত আসমান অতিক্রম করেন এবং প্রতিটি আসমানে মহান নবীগণের সাক্ষাৎ লাভ করেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম সর্বাধিক প্রামাণ্য ঘটনা। (সহিহ বুখারি: ৩২০৭, কিতাবুস সালাত, বাবুল ইসরা ওয়াল মিরাজ; সহিহ মুসলিম: ১৬২, কিতাবুল ঈমান, বাবুল ইসরা ওয়াল মিরাজ)।
আসমানভিত্তিক নবীগণের অবস্থান
মিরাজের দীর্ঘ বর্ণনামতে আসমানসমূহে নবীগণের অবস্থান ছিল নিম্নরূপ:
১ম আসমান: আদম (আ.) — মানবজাতির সূচনা ও পিতৃপুরুষ।
২য় আসমান: ঈসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.) — পবিত্রতা ও একনিষ্ঠ ইবাদতের প্রতীক।
৩য় আসমান: ইউসুফ (আ.) — ধৈর্য ও অলৌকিক সৌন্দর্যের নিদর্শন।
৪র্থ আসমান: ইদ্রিস (আ.) — উচ্চ মর্যাদা ও জ্ঞানের প্রতীক।
৫ম আসমান: হারুন (আ.) — বাগ্মিতা ও নেতৃত্বের আদর্শ।
৬ষ্ঠ আসমান: মূসা (আ.) — সংগ্রাম, দাওয়াত ও আল্লাহর সাথে কথোপকথনের গৌরব।
৭ম আসমান: ইবরাহিম (আ.) — খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু।
সাত আসমানের মহত্ত্ব ও বৈশিষ্ট্য
আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রকাশ: সাত আসমান আল্লাহর সৃষ্টি ক্ষমতার এক জীবন্ত ও চিরন্তন নিদর্শন। (সূরা আল-মুলক: ৩)
ফেরেশতাদের বিশাল কর্মব্যবস্থা: প্রতিটি আসমানে আল্লাহর আদেশে ফেরেশতারা নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করছেন। আল্লাহ বলেন, "যিনি ফেরেশতাদের করেছেন বার্তাবাহক..." (সূরা ফাতির: ১)। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে— রিজিক বণ্টন, বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ, আমল সংরক্ষণ এবং আসমানের শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
ওহি অবতরণের কেন্দ্র: আল্লাহর নির্দেশ ও আসমানী বার্তা আসমান থেকে পৃথিবীতে নাজিল হয়। (সূরা আন-নাহল: ২)
সিদরাতুল মুনতাহা: সপ্তম আসমানের ওপরে অবস্থিত এক মহামহিম স্থান, যা সৃষ্টিজগতের সর্বোচ্চ সীমা। এর আগে গিয়ে জিবরাইল (আ.)-এর মতো মহান ফেরেশতাও থেমে যান। (সূরা আন-নাজম: ১৪-১৬)
সাত জমিন: কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং জমিন থেকেও অনুরূপ..." (সূরা আত-তালাক: ১২)
সাত জমিনের মূল বাস্তবতা
জমিনও আসমানের মতো সাত স্তরের। এর প্রকৃত গঠন ও রূপ মানুষের কাছে পুরোপুরি উন্মোচিত নয়। আল্লাহ তাআলাই এর পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। সহিহ বুখারির ২৪৫২ নং ও সহিহ মুসলিমের ১৬১০ নং হাদিসে জমিনের অধিকার অন্যায়ভাবে হরণ করার শাস্তিস্বরূপ সাত জমিনের নিচে ধসে যাওয়ার কথা উল্লেখ আছে। এই হাদিসগুলো জমিনের সাতটি স্তরের সত্যতা প্রমাণ করে, যদিও এর বিস্তারিত কাঠামো বর্ণনা করা হয়নি।
সাত জমিন সম্পর্কে আলেমদের ব্যাখ্যা
ইসলামী গবেষক ও আলেমদের ব্যাখ্যায় মূলত দুটি প্রধান মত পাওয়া যায়।
অভ্যন্তরীণ স্তরবিশিষ্ট পৃথিবী: আমাদের এই পৃথিবীর অভ্যন্তরেই ভূ-পৃষ্ঠ, ম্যান্টল, কোরসহ সাতটি আলাদা স্তর রয়েছে; যার প্রতিটি স্তরের গঠন ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন।
পৃথক সাতটি ভূমণ্ডল: আল্লাহ তাআলা এই মহাবিশ্বে পৃথিবী সদৃশ আরও একাধিক জগত বা গ্রহ সৃষ্টি করে থাকতে পারেন, যা মানুষের সীমিত জ্ঞানের কারণে এখনো অজানা।
চূড়ান্ত আকিদা: সাত জমিনের অস্তিত্ব সত্য, তবে এর প্রকৃত স্বরূপ ও প্রকৃতি একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
আকিদাগত সতর্কতা
বিভিন্ন অনির্ভরযোগ্য গ্রন্থে সাত আসমান ও জমিনের কাল্পনিক নাম এবং চন্দ্র-সূর্যকে নির্দিষ্ট আকাশ হিসেবে জোড়াতালি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। ইসলামী শরিয়তের অবস্থান হলো—এগুলোর কোনো সহিহ দলিল নেই। এগুলো মূলত অনুমান বা ইসরাইলি রেওয়াত (বর্ণনা)। কোরআন ও সহিহ হাদিসের অকাট্য প্রমাণ ছাড়া আকিদাগত বিষয়ে কোনো মনগড়া বা দুর্বল বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়।
আসমান-জমিনের বিস্তৃতি ও সৃষ্টিগত উদ্দেশ্য
আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।" (সূরা আলে ইমরান: ১৯০) মহাবিশ্ব অসীম বিস্তৃত এবং মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। আধুনিক বিজ্ঞান মহাবিশ্বের যে বিশালতা আবিষ্কার করছে, তা মূলত এই আয়াতের গভীরতাকেই স্পষ্ট করে।
সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য
ক. পরীক্ষা: জীবন ও মৃত্যুকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন কে উত্তম আমল করে তা পরীক্ষার জন্য। (সূরা আল-মুলক: ২)
খ. ইবাদত: মানব ও জিন জাতিকে কেবল আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। (সূরা আজ-জারিয়াত: ৫৬)
গ. আল্লাহর পরিচয় লাভ ও আখিরাতের প্রস্তুতি।
ইসলামী জীবনদর্শন ও উপসংহার
সাত আসমান ও সাত জমিনের এই বিস্ময়কর সৃষ্টি-ব্যবস্থা আমাদের জন্য গভীর বার্তা বহন করে। ক. আল্লাহ সর্বশক্তিমান; পুরো সৃষ্টিজগৎ তাঁর একক নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসিত। খ. মানুষের সীমাবদ্ধতা; মানুষের অহংকার করার কিছু নেই, কারণ তার জ্ঞান অতি সামান্য। গ. আখিরাতমুখী জীবন; জাগতিক জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুই চূড়ান্ত সত্য, তাই আখিরাতের প্রস্তুতিই মুমিনের আসল লক্ষ্য।
পরিশেষে বলা যায়, সাত আসমান ও সাত জমিন ইসলামী আকিদার এক অকাট্য ও সত্যনিষ্ঠ বাস্তবতা। পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসের মাধ্যমে এর সত্যতা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে এর পূর্ণ প্রকৃতি ও রহস্য মানুষের জ্ঞানের আড়ালে রাখা হয়েছে। এই বিশাল সৃষ্টি আমাদের শেখায় বিনয়, তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য। অহংকার পরিত্যাগ করে বিনয়ী ও ইবাদতমুখী জীবন গঠন করাই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতার একমাত্র মাধ্যম।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার; ইমেইল: drmazed96@gmail.com

