বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস আজ
ভূমি সুরক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলামের দিকনির্দেশনা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১০:৫১
প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো—খরা, ভূমির অবক্ষয় ও মরুকরণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূগর্ভস্থ পানির অযাচিত ব্যবহার এবং কৃষিজমির ক্ষয় বিশ্বব্যাপী উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে শুধু ইবাদত-বন্দেগির শিক্ষা দেয়নি; বরং পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার ব্যাপারেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। কুরআন ও হাদিসে ভূমি, পানি, বৃক্ষ ও পরিবেশ রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
পৃথিবী মানুষের কাছে আমানত
আল্লাহ তাআলা মানুষকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি বলেন: "আর স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি (খলিফা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।" (সূরা আল-বাকারা: ৩০)
এই প্রতিনিধিত্বের অর্থ হলো—পৃথিবীর সম্পদকে ধ্বংস না করে সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা। ভূমির উর্বরতা নষ্ট করা, বন ধ্বংস করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা খিলাফতের দায়িত্বের পরিপন্থী।
পরিবেশ ধ্বংস মানুষের কর্মফল
আল্লাহ তাআলা বলেন: "মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে আল্লাহ তাদের কিছু কর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।" (সূরা আর-রূম: ৪১)
আজকের খরা, মরুকরণ, নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং জলবায়ু সংকট মূলত এ আয়াতেরই বাস্তব প্রতিফলন। মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে।
অপচয় পরিহারের নির্দেশনা
পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় খরা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আল্লাহ বলেন: "তোমরা খাও, পান কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।" (সূরা আল-আ‘রাফ: ৩১)
পানি ব্যবহারে সংযম ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। রাসূলুল্লাহ (সা.) অজুর সময়ও অপ্রয়োজনীয় পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে অজু করতে দেখে বললেন, "এ অপচয় কী?"
সে ব্যক্তি বলল, "অজুতেও কি অপচয় আছে?"
রাসূল (সা.) বললেন, "হ্যাঁ, যদিও তুমি প্রবাহমান নদীর তীরে থাকো।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫)
বৃক্ষরোপণ একটি সদকাহ
বন উজাড় মরুকরণের অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলাম বৃক্ষরোপণকে সওয়াবের কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে বা ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকাহ হিসেবে গণ্য হয়।" (সহিহ আল-বুখারি: ২৩২০; সহিহ মুসলিম: ১৫৫৩)
এই হাদিস বৃক্ষরোপণের সামাজিক ও পরিবেশগত গুরুত্বকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরে।
কিয়ামত আসন্ন হলেও গাছ লাগানোর শিক্ষা
পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির এক অনন্য উদাহরণ হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণী: "যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারা থাকে এবং তা রোপণ করার সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে।" (মুসনাদ আহমাদ: ১২৯০২) এ হাদিস পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার গুরুত্ব নির্দেশ করে।
অনাবাদি জমি আবাদ করার উৎসাহ
মরুকরণ প্রতিরোধে জমিকে উৎপাদনশীল রাখার প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"যে ব্যক্তি কোনো অনাবাদি জমি আবাদ করে, সেই জমির অধিকারী সে-ই।" (সুনানে আবু دাউদ: ৩০৭৩; সুনানে তিরমিজি: ১৩৭৮)
এ নির্দেশনা কৃষি সম্প্রসারণ, ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং মরুকরণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন: "তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য, যাতে তোমরা ভারসাম্য নষ্ট না কর।" (সূরা আর-রহমান: ৭-৮)
পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ইসলামী দৃষ্টিতে একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। বন ধ্বংস, দূষণ বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ এ ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বৃষ্টির জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা
খরা দেখা দিলে ইসলামে 'সালাতুল ইস্তিসকা' (বৃষ্টির জন্য বিশেষ নামাজ) আদায়ের শিক্ষা রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) বর্ণনা করেন:
"রাসূলুল্লাহ (সা.) বৃষ্টির জন্য ময়দানে বের হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন এবং আল্লাহর নিকট দোয়া করেন।" (সহিহ আল-বুখারি: ১০২৪; সহিহ মুসলিম: ৮৯৪)
এ থেকে বোঝা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষকে একদিকে যেমন বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যদিকে আল্লাহর সাহায্যও কামনা করতে হবে।
প্রাণিকুল ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একটি চড়ুই পাখিও হত্যা করে, কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" (সুনানে নাসাঈ: ৪৪৪৫)
সুতরাং, প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ পরিবেশ সংরক্ষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। উত্তরাঞ্চলে খরা, উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস এবং কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাওয়া দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত বৃক্ষনিধন ও জলাশয় ভরাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন:
- ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ।
- কৃষিজমি ও জলাশয় সংরক্ষণ করা।
- বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
- ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করা।
- পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
- সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশগত সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
- সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের কার্যকর সমন্বয়।
আমাদের করণীয়
বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি সুযোগ। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয়:
১. ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষ সংরক্ষণে অংশগ্রহণ করা।
২. পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
৩. কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় সচেতন হওয়া।
৪. পরিবেশ দূষণ কমাতে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নেওয়া।
৫. জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
৬. প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে আল্লাহর প্রতি তাওবা, ইস্তিগফার ও দোয়ার মাধ্যমে রহমত কামনা করা।
পরিশেষে বলা যায়, খরা ও মরুকরণ আজ বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ভূমির উর্বরতা রক্ষা, পানি সংরক্ষণ, বনায়ন বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। ইসলাম এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ করে আমরা যদি প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করি, তবে খরা ও মরুকরণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ আমাদের সেই দায়িত্বই স্মরণ করিয়ে দেয় যে—পৃথিবী আমাদের মালিকানা নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি আমানত, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুণ্ন রাখা আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্য।
লেখক: কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

