Logo

ধর্ম

স্ত্রীর মন খারাপে স্বামীর করণীয়

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৫:৩৫

স্ত্রীর মন খারাপে স্বামীর করণীয়

মানবজীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও পবিত্র সম্পর্কের একটি হলো দাম্পত্য সম্পর্ক। এটি শুধু দুইজন মানুষের একসঙ্গে বসবাসের চুক্তি নয়; বরং ভালোবাসা, মায়া-মমতা, সম্মান, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার এক অপূর্ব বন্ধন। এই সম্পর্কে কখনো হাসি থাকে, কখনো অভিমান থাকে, কখনো আবার মন খারাপও আসে। কিন্তু একজন আদর্শ স্বামী কেমন হবেন? স্ত্রী যখন কষ্ট পান বা মন খারাপ করেন, তখন তাঁর আচরণ কেমন হওয়া উচিত? এ বিষয়ে সর্বোত্তম আদর্শ হলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)।

​আল্লাহ তাআলা কুরআনে দাম্পত্য সম্পর্কের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন: ​"তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তিনি স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" — [সূরা রূম: ২১]

​এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, সংসারের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা ও দয়া। আর দয়া ও ভালোবাসার অন্যতম প্রকাশ হচ্ছে—সঙ্গীর মন খারাপের সময় তার পাশে দাঁড়ানো।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

​উম্মুল মুমিনীন সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা.)-এর একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে এসে দেখলেন, সাফিয়া (রা.) মন খারাপ করে বসে আছেন। তিনি কারণ জানতে চাইলে সাফিয়া (রা.) বললেন, অপর একজন স্ত্রী তাঁকে "ইহুদির মেয়ে" বলে সম্বোধন করেছেন। (যদিও সাফিয়া রা. ইসলাম গ্রহণ করে নবীজির ঘর আলোকিত করেছিলেন, তবুও এ ধরনের কথায় তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন)।

​রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন তাঁকে ধমক দেননি, তাঁর কষ্টকে ছোট করে দেখেননি কিংবা বলেননি—"এতটুকু কথা নিয়ে মন খারাপ করার কী আছে?" বরং তিনি অত্যন্ত স্নেহ ও মর্যাদার সঙ্গে বললেন: ​"তুমি তাকে কেন বললে না, আমার বাবা হারুন (আ.) ছিলেন একজন নবী, আমার চাচা মুসা (আ.) ছিলেন একজন নবী এবং আমার স্বামী মুহাম্মদ (সা.) একজন নবী।"

​এই কথার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাফিয়া (রা.)-এর আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করলেন, তাঁর মনোবল বাড়িয়ে দিলেন এবং বুঝিয়ে দিলেন—একজন স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর হৃদয়কে শক্তি ও প্রশান্তি দেওয়া।

বাহ্যিক প্রয়োজনের চেয়ে আবেগের মূল্য বেশি

​এখানে নববী চরিত্রের একটি অসাধারণ দিক ফুটে ওঠে। তিনি মানুষের বাহ্যিক সমস্যার চেয়ে তার হৃদয়ের কষ্টকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। আজ আমাদের সমাজে অনেক স্বামী স্ত্রীর মন খারাপকে গুরুত্ব দেন না। তাঁরা মনে করেন, সংসারের খরচ চালানোই যথেষ্ট; স্ত্রীর আবেগ-অনুভূতি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ইসলাম আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়।

​নারীরা সাধারণত শুধু অর্থ বা উপহার পেয়ে সুখী হন না; তাঁরা চান সম্মান, গুরুত্ব, ভালোবাসা এবং মানসিক নিরাপত্তা। অনেক সময় স্বামীর একটি সুন্দর বাক্য, একটি আন্তরিক প্রশংসা কিংবা কয়েক মিনিট মনোযোগ দিয়ে কথা শোনাই স্ত্রীর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার হয়ে ওঠে।

​রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে ছিলেন অনন্য। তিনি শুধু স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করেননি; বরং তাঁদের আবেগ ও অনুভূতির প্রতিও অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। তিনি আয়েশা (রা.)-কে স্নেহভরে "হুমায়রা" বলে ডাকতেন, তাঁর সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতেন, দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন, সফরে সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং তাঁর মন ভালো রাখার চেষ্টা করতেন।

​একবার আয়েশা (রা.) কোনো বিষয়ে অভিমান করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি বুঝতে পারি, তুমি কখন আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো আর কখন অসন্তুষ্ট থাকো।" আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কীভাবে বুঝতে পারেন?" তিনি বললেন, "তুমি যখন সন্তুষ্ট থাকো তখন বলো—'মুহাম্মদের রবের কসম'; আর যখন অসন্তুষ্ট থাকো তখন বলো—'ইব্রাহিমের রবের কসম'।" এ কথা শুনে আয়েশা (রা.) মুচকি হেসে ফেললেন।

​এই ঘটনা প্রমাণ করে, একজন ভালো স্বামী তাঁর স্ত্রীর মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি শুধু নিজের কথা বলেন না, বরং স্ত্রীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তাঁর অনুভূতির মূল্য দেন।

পারস্পরিক অনুভূতির অবমূল্যায়ন: দাম্পত্য কলহের মূল কারণ

​আজকের সমাজে দাম্পত্য জীবনের অনেক সমস্যার মূল কারণ হলো পারস্পরিক অনুভূতির অবমূল্যায়ন। স্ত্রী কষ্ট পেলে অনেক স্বামী বলে বসেন:

​"এসব নাটক কোরো না।"

​"এত আবেগপ্রবণ হওয়ার কী আছে?"

​"এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।"

​এসব কথা সাময়িকভাবে সমস্যাকে চাপা দিলেও হৃদয়ের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। ছোট অভিমান একসময় বড় বিরোধে রূপ নেয়। পক্ষান্তরে, স্বামী যদি একটু সময় নিয়ে স্ত্রীর পাশে বসেন, তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তাঁর কষ্টের কারণ বোঝার চেষ্টা করেন এবং আন্তরিকভাবে সান্ত্বনা দেন, তবে অনেক বড় সমস্যাও সহজে মিটে যেতে পারে।

সুন্দর আচরণই সর্বোত্তম ইবাদত

​ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, সুন্দর আচরণও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ​"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।"

​এই হাদিসে দাম্পত্য জীবনের এক অনন্য নীতি তুলে ধরা হয়েছে। একজন মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ পায় তার ঘরের মানুষের সঙ্গে আচরণের মাধ্যমে।

স্ত্রীর মন খারাপ দেখলে একজন স্বামীর করণীয়

  • ​কারণ খোঁজা: প্রথমত, স্ত্রীর মন খারাপের কারণ জানার চেষ্টা করা।
  • ​সহমর্মিতা: তাকে দোষারোপ না করে ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলা।
  • ​গুণাবলি স্মরণ করানো: তার ভালো গুণগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং তাকে সম্মানিত বোধ করানো।
  • ​আশ্বাস দেওয়া: প্রয়োজন হলে তাকে সময় দেওয়া এবং তার পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া।

​পারস্পরিক চাওয়া: সর্বোপরি, তার সঙ্গে এমন আচরণ করা, যেমন আচরণ আমরা নিজের জন্য প্রত্যাশা করি।

​একজন নারী যখন স্বামীর কাছ থেকে সম্মান, মূল্যায়ন ও আন্তরিকতা পান, তখন তিনি সংসারের প্রতি আরও বেশি নিবেদিত হন। আর যে সংসারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকে, সে সংসার হয়ে ওঠে শান্তি ও প্রশান্তির নীড়।

নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন

​আমাদের প্রত্যেক স্বামীর উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা—

  • ​আমি কি স্ত্রীর কষ্টকে গুরুত্ব দিই?
  • ​আমি কি তার মনের কথা শোনার জন্য সময় বের করি?
  • ​আমি কি তার ভালো দিকগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দিই?
  • ​আমি কি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো তার হৃদয়কে খুশি করার চেষ্টা করি?

​যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হয়, তবে দাম্পত্য জীবন আরও সুন্দর হবে। আর যদি কোথাও ঘাটতি থাকে, তবে এখনই নিজেকে সংশোধনের সময়।

উপসংহার

রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু একজন মহান নবীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, দাম্পত্য জীবনের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালনে নয়; বরং একে অপরের হৃদয়ের যত্ন নেওয়ার মধ্যেও নিহিত। তাই ঘরে ফিরে যদি কখনো স্ত্রীর গোমড়ামুখ দেখেন, তাকে অবহেলা করবেন না। তার পাশে বসুন, তার কথা শুনুন, তার কষ্ট বুঝুন এবং এমন কিছু কথা বলুন যা তার হৃদয়ে আনন্দ ও আত্মমর্যাদার অনুভূতি সৃষ্টি করে। হয়তো আপনার একটি সুন্দর বাক্যই তার পুরো দিনের কষ্ট দূর করে দিতে পারে এবং আপনার সংসারকে আরও সুখী ও শান্তিময় করে তুলতে পারে।

লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন