ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র জনতার আমনত
জনগণের হক আদায়ে বাজেটের ভূমিকা
আমীনুর রহমান নড়াইলী
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৫:৫৭
রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো জাতীয় বাজেট। প্রতি বছর একটি দেশের সরকার আগামী অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করে, যা বাজেট নামে পরিচিত। সাধারণভাবে অনেকেই বাজেটকে কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের দলিল হিসেবে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে বাজেট তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি একটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, দায়বদ্ধতা, নীতিমালা এবং জনগণের প্রতি কর্তব্যবোধের প্রতিফলন। বিশেষ করে জনগণের মৌলিক অধিকার ও ন্যায্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাজেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র কোনো শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; বরং এটি জনগণের আমানত। রাষ্ট্রের সম্পদও জনগণের সম্পদ। তাই সেই সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন, জনকল্যাণে ব্যয় এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমগুলোর একটি হলো বাজেট। তাই প্রশ্ন আসে—জনগণের হক আদায়ে বাজেট কতটা ভূমিকা রাখে? ইসলামের আলোকে এর গুরুত্বই বা কী?
হক আদায়ের ইসলামী ধারণা: ইসলামে 'হক' শব্দের অর্থ হলো প্রাপ্য অধিকার বা ন্যায্য পাওনা। মানুষের ওপর মানুষের হক যেমন রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের ওপরও নাগরিকদের কিছু মৌলিক হক রয়েছে। জীবন, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, ন্যায়বিচার এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন– 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে।' (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
এই আয়াত শুধু ব্যক্তিগত আমানতের ক্ষেত্রেই নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। জনগণের অর্থ, সম্পদ এবং অধিকার রাষ্ট্রের কাছে এক ধরনের আমানত। তাই বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের হক যথাযথভাবে আদায় করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
'বাজেট' জনগণের সম্পদের ব্যবস্থাপনা: রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস হলো জনগণের দেওয়া কর, ভ্যাট, শুল্ক এবং অন্যান্য রাজস্ব। অর্থাৎ বাজেটের অর্থ জনগণের শ্রম ও ঘামের ফসল। ফলে এই অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনগণের কল্যাণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
যদি জনগণের অর্থ জনগণের উন্নয়নের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়, তাহলে জনগণের হক ক্ষুণ্ন হয়। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে যথাযথ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হলে জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং বাজেট হলো জনগণের সম্পদকে জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা।
দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অধিকার: ইসলাম সবসময় সমাজের দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। এতিম, মিসকিন, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কুরআন ও হাদিসে। রাষ্ট্রের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভাতা, খাদ্য সহায়তা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের মাধ্যমে এই শ্রেণির মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
যখন একটি বাজেটে দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়, তখন তা জনগণের হক আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে সমাজের দুর্বল শ্রেণি যদি অবহেলিত থাকে, তাহলে বাজেট যত বড়ই হোক না কেন, তা প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমুখী বলা যায় না।
'শিক্ষা' জনগণের মৌলিক অধিকার: একটি জাতির উন্নয়নের মূল ভিত্তি শিক্ষা। শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষ তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশ করতে পারে না। তাই শিক্ষা শুধু একটি সেবা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে ফরজ ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, 'জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।'
এই শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রকে এমন বাজেট প্রণয়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকে। বিদ্যালয় নির্মাণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং গবেষণার উন্নয়নে বিনিয়োগ জনগণের হক আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটি জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাত যত বেশি গুরুত্ব পায়, জনগণের অধিকার তত বেশি সুরক্ষিত হয়।
স্বাস্থ্যসেবায় জনগণের অধিকার: সুস্থ জীবনযাপন মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। কিন্তু দরিদ্র মানুষের পক্ষে ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণ করা সবসময় সম্ভব হয় না। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবার জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। বাজেটের মাধ্যমে হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, চিকিৎসক নিয়োগ এবং ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয়। যদি স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে জনগণের একটি গুরুত্বপূর্ণ হক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অধিকার: একজন মানুষের সম্মানজনক জীবনের জন্য কর্মসংস্থান অপরিহার্য। বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অস্থিরতারও কারণ। রাষ্ট্রের বাজেট যদি শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়, তাহলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ইসলাম কর্ম ও উপার্জনকে মর্যাদার চোখে দেখে। তাই এমন বাজেট প্রণয়ন করা উচিত, যা মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে এবং আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তোলে।
ন্যায্য করব্যবস্থা ও জনগণের হক: জনগণের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার জরুরি। ইসলাম কর আরোপের বিরোধিতা করে না; তবে তা যেন জনগণের জন্য অসহনীয় বোঝা না হয়।
যখন করব্যবস্থা ভারসাম্যপূর্ণ হয় এবং সংগৃহীত অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় হয়, তখন জনগণও তা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। কিন্তু যদি জনগণের ওপর অতিরিক্ত কর চাপিয়ে সেই অর্থ অপচয় করা হয়, তাহলে তা জনগণের হক নষ্ট করার শামিল। সুতরাং ন্যায্য করনীতি এবং স্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনা জনগণের অধিকার রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
'দুর্নীতি' জনগণের হক নষ্টের প্রধান কারণ: একটি ভালো বাজেটও দুর্নীতির কারণে ব্যর্থ হতে পারে। প্রকল্পে অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয়, ঘুষ এবং অর্থ আত্মসাতের কারণে জনগণের প্রাপ্য সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছায় না।
ইসলাম দুর্নীতিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কারণ দুর্নীতি মূলত মানুষের হক আত্মসাৎ করারই একটি রূপ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, 'যে ব্যক্তি জনগণের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে, সে কিয়ামতের দিন তা বহন করে উপস্থিত হবে।' অতএব, জনগণের হক আদায়ে বাজেটের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন অপরিহার্য।
খোলাফায়ে রাশেদীনের দৃষ্টান্ত: ইসলামী ইতিহাসে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম উদাহরণ পাওয়া যায় খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে। হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) জনগণের সম্পদ ব্যবহারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন।
হযরত উমর (রা.) রাতে ছদ্মবেশে মানুষের খোঁজখবর নিতেন, যাতে কেউ অভুক্ত না থাকে। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক কষ্টে থাকলে তার জন্য শাসক দায়ী। এই চেতনা আধুনিক বাজেট ব্যবস্থাপনায়ও অনুসরণযোগ্য। কারণ বাজেটের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
জনকল্যাণভিত্তিক বাজেটের বৈশিষ্ট্য: যে বাজেট জনগণের হক আদায়ে সহায়ক, তার কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে—শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ; দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা; কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনা; কৃষি ও উৎপাদন খাতের উন্নয়ন; স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা; আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ; জনগণের মতামতের প্রতি গুরুত্ব প্রদান। এসব বৈশিষ্ট্য একটি বাজেটকে সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমুখী ও ন্যায়ভিত্তিক করে তোলে।
মোট কথা, জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের একটি বার্ষিক দলিল নয়; এটি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ, তা অনেকাংশে বাজেটের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের আমানত এবং সেই সম্পদ যথাযথভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করাই শাসকদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাজেট জনগণের হক আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই একটি আদর্শ বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সামগ্রিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। ইসলামের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যে বাজেটে জনগণের হক সংরক্ষিত হয়, সেই বাজেটই প্রকৃত অর্থে সফল ও কল্যাণমুখী বাজেট।
লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা।

