আজ বিশ্ব বাবা দিবস
জীবিত ও মৃত বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১৩:০৬
প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব বাবা দিবস। ২০২৬ সালে দিবসটি পালিত হচ্ছে ২১ জুন। এই দিনটি বাবার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ হলেও ইসলামে পিতার সম্মান ও অধিকার কোনো নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে পালনীয় একটি ধর্মীয় দায়িত্ব।
পিতা পরিবারের অভিভাবক, সন্তানের রক্ষক, শিক্ষাগুরু ও জীবনের পথপ্রদর্শক। সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার পর থেকে আত্মনির্ভরশীল হওয়া পর্যন্ত পিতা অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। তাই ইসলাম পিতার প্রতি সম্মান, আনুগত্য ও সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
পিতার মর্যাদা কোরআনের আলোকে
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন—তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে।”(সুরা আল-ইসরা: ২৩)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন-আমাকে এবং তোমার পিতা-মাতাকে কৃতজ্ঞতা জানাও; আমার কাছেই প্রত্যাবর্তন।”(সুরা লুকমান: ১৪)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ঈমানি দায়িত্বের অংশ।
হাদিসে পিতার মর্যাদা
হজরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।”(সুনান আত-তিরমিজি: ১৮৯৯) আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন—তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার পিতার জন্য।”(সুনান ইবনে মাজাহ: ২২৯১) এ হাদিসের অর্থ হলো, সন্তানের ওপর পিতার বিশেষ অধিকার রয়েছে এবং সন্তানকে পিতার প্রয়োজন ও কল্যাণে সহযোগিতা করতে হবে।
জীবিত পিতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব
১. সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন
পিতার সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলা, রূঢ় আচরণ করা বা অবজ্ঞা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন—তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না এবং ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।”(সুরা আল-ইসরা: ২৩)
২. আনুগত্য ও সহযোগিতা
যেসব বিষয়ে শরিয়তের বিরোধিতা নেই, সেসব ক্ষেত্রে পিতার কথা মান্য করা সন্তানের কর্তব্য। পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক বিষয়ে পিতার অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে মূল্যায়ন করা উচিত।
৩. ভরণ-পোষণ ও সেবা
বৃদ্ধ বয়সে পিতা কর্মক্ষমতা হারালে সন্তানের দায়িত্ব হলো তাঁর প্রয়োজন পূরণ করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং মানসিকভাবে পাশে থাকা।
৪. দোয়া করা
সন্তান সর্বদা পিতার জন্য দোয়া করবে—হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।”(সুরা আল-ইসরা: ২৪)
৫. মানসিক প্রশান্তি দেওয়া
শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, পিতার সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁর খোঁজ নেওয়া এবং তাঁর অনুভূতির মূল্য দেওয়া সন্তানের দায়িত্ব।
মৃত পিতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব
পিতা মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। ইসলামে মৃত্যুর পরও পিতার প্রতি সন্তানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
১. নিয়মিত দোয়া ও ইস্তিগফার
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল অব্যাহত থাকে—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।”(সহিহ মুসলিম: ১৬৩১) তাই মৃত পিতার জন্য নিয়মিত মাগফিরাতের দোয়া করা সন্তানের অন্যতম দায়িত্ব।
২. ঋণ পরিশোধ করা
যদি পিতার কোনো বৈধ ঋণ থেকে থাকে, তাহলে সামর্থ্য অনুযায়ী তা পরিশোধের চেষ্টা করা উচিত। ঋণমুক্ত করা মৃত ব্যক্তির জন্য বড় উপকার।
৩. বৈধ অসিয়ত বাস্তবায়ন
পিতা শরিয়তসম্মত কোনো অসিয়ত করে গেলে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা উচিত।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—পিতার বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা সর্বোত্তম নেক কাজের অন্তর্ভুক্ত।”
(সহিহ মুসলিম: ২৫৫২) পিতার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
৫. সদকা ও কল্যাণমূলক কাজ করা
মৃত পিতার সাওয়াবের উদ্দেশ্যে দান-সদকা, কোরআন শিক্ষা, মসজিদ, মাদরাসা, নলকূপ বা জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা উত্তম।
ছেলে সন্তানের ওপর বিশেষ দায়িত্ব
ইসলামে ছেলে সন্তানকে পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। বিশেষত পিতা বৃদ্ধ হলে বা মৃত্যুবরণ করলে পরিবারকে সহযোগিতা করা ছেলে সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
১. পিতার সম্মান রক্ষা করা
সন্তানের চরিত্র, আচরণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পিতার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা প্রয়োজন।
২. পিতার অসমাপ্ত কল্যাণকর কাজ এগিয়ে নেওয়া
যদি পিতা সমাজসেবা, দান-খয়রাত বা কোনো ভালো কাজে সম্পৃক্ত থাকেন, তাহলে সন্তান তা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবে।
৩. পরিবারকে সহযোগিতা করা
পিতা না থাকলে মা, ভাই-বোন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দায়িত্ব নেওয়া ছেলে সন্তানের অন্যতম কর্তব্য।
৪. পিতার শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করা
সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পরিশ্রম ও মানবিকতার যে শিক্ষা পিতা দিয়ে গেছেন, তা জীবনে বাস্তবায়ন করাই তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান।
পিতার অবাধ্যতার পরিণতি
ইসলামে পিতা-মাতার অবাধ্যতাকে কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ সম্পর্কে জানাব না? ... আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্যতা।”
(সহিহ বুখারি: ২৬৫৪; সহিহ মুসলিম: ৮৭) অতএব পিতার সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অবহেলা বা সম্পর্কচ্ছেদ একজন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়।
আধুনিক সমাজে পিতার প্রতি দায়িত্ববোধ
বর্তমান সময়ে কর্মব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক বাবা একাকীত্বে ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধ পিতা পরিবারের কাছেই অবহেলিত হন। অথচ ইসলাম আমাদের শেখায়—পিতা-মাতার সেবা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি, যে তার পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েও জান্নাত অর্জন করতে পারল না।(সহিহ মুসলিম: ২৫৫১)
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব বাবা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একজন পিতার ভালোবাসা, ত্যাগ ও অবদান কখনো পরিমাপ করা যায় না। ইসলাম পিতাকে পরিবারের সম্মানিত অভিভাবক হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে এবং সন্তানের ওপর তাঁর বহু অধিকার নির্ধারণ করেছে। জীবিত পিতার প্রতি সম্মান, সেবা, আনুগত্য ও ভালোবাসা প্রদর্শন যেমন জরুরি, তেমনি মৃত পিতার জন্য দোয়া, সদকা, ঋণ পরিশোধ ও তাঁর সম্পর্কগুলো রক্ষা করাও সন্তানের দায়িত্ব।
পিতার প্রতি দায়িত্ব পালন কেবল সামাজিক কর্তব্য নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই বিশ্ব বাবা দিবসকে উপলক্ষ করে আমরা যেন প্রতিজ্ঞা করি—জীবিত পিতার যথাযথ সেবা করব এবং মৃত পিতার জন্য নিয়মিত দোয়া ও নেক আমলের ব্যবস্থা করব। এটাই হবে একজন সন্তানের পক্ষ থেকে পিতার প্রতি সর্বোত্তম উপহার।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার। ইমেইল : drmazed96@gmail.com

