মানবসভ্যতার ইতিহাসে কৃষি ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি-১
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:১২
মানবসভ্যতার ইতিহাস যদি একটি শব্দে সংক্ষিপ্ত করতে হয়, তবে সেই শব্দটি হবে—মাটি। কারণ মানুষ যখন প্রথম পৃথিবীতে বসতি গড়তে শিখল, তখন তার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল না স্বর্ণ, রৌপ্য কিংবা অস্ত্র; ছিল এক টুকরো উর্বর জমি। সেই মাটির বুকেই মানুষ প্রথম বীজ বুনেছিল, প্রথম ফসল ঘরে তুলেছিল, আর প্রথমবারের মতো আগামী দিনের জন্য স্বপ্ন দেখতে শিখেছিল।
সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটেছে, রাজা বদলেছে, রাষ্ট্রের সীমানা পাল্টেছে; কিন্তু মানুষের সঙ্গে মাটির সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। কারণ খাদ্য ছাড়া যেমন জীবন চলে না, তেমনি কৃষি ছাড়া খাদ্যেরও কোনো অস্তিত্ব নেই।
আজ আমরা প্রযুক্তিনির্ভর এক অভূতপূর্ব সময়ে বাস করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, রোবট, স্মার্ট শহর কিংবা ডিজিটাল অর্থনীতি—মানবসভ্যতা যেন প্রতিদিন নতুন বিস্ময়ের জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতেও একটি মৌলিক সত্য অপরিবর্তিত রয়েছে—মানুষের প্রতিদিনের আহার।
পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিও একটি ধানের শিষ কিংবা একটি গমের দানা সৃষ্টি করতে পারে না। সেই দায়িত্ব আজও পালন করেন একজন কৃষক, যার হাত মাটিতে বীজ বোনে, আর যার শ্রমের ওপর নির্ভর করে সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্ব।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় বারো হাজার বছর আগে কৃষির সূচনার মধ্য দিয়েই মানবজীবনের সবচেয়ে বড় সামাজিক পরিবর্তনগুলোর একটি সংঘটিত হয়েছিল। মানুষ তখন শিকার ও খাদ্য সংগ্রহনির্ভর অনিশ্চিত জীবন ছেড়ে পরিকল্পিতভাবে শস্য উৎপাদন শুরু করে। সেই এক সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পৃথিবীর ইতিহাস।
যাযাবর জীবন রূপ নেয় স্থায়ী বসতিতে, গড়ে ওঠে পরিবার, গ্রাম, নগর, বাজার, রাষ্ট্র এবং পরবর্তীতে একের পর এক সমৃদ্ধ সভ্যতা।
এ কারণেই কৃষিকে শুধু একটি পেশা বললে তার গুরুত্ব খাটো করা হয়। কৃষিই ছিল মানবজাতির প্রথম অর্থনীতি, প্রথম পরিকল্পিত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সামাজিক সংগঠনের প্রথম ভিত্তি। মানুষ যখন নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন করতে শিখল, তখনই জন্ম নিল বাণিজ্য।
বাণিজ্যের হাত ধরেই গড়ে উঠল নগর, বিকশিত হলো শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতি। অর্থাৎ সভ্যতার যে অট্টালিকা আমরা আজ দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল একটি কৃষিজমিতেই।
ইতিহাসের প্রায় সব মহান সভ্যতার দিকে তাকালেই এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নীল নদের তীরে মিসরীয় সভ্যতা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেসোপটেমিয়া, সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা এবং হোয়াংহো নদীর তীরে প্রাচীন চীনা সভ্যতা—প্রতিটির প্রাণ ছিল কৃষি। নদী তাদের শুধু পানি দেয়নি; দিয়েছে উর্বর মাটি, খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিবেশ।
কৃষি উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করেছে, আর সেই উদ্বৃত্ত থেকেই জন্ম নিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আইন, জ্ঞানচর্চা, শিল্পকলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য।
এই কারণেই একজন কৃষক কেবল খাদ্য উৎপাদনকারী নন; তিনি সভ্যতার নীরব স্থপতি। তাঁর হাতে লাঙল থাকলেও, প্রকৃত অর্থে তিনি ভবিষ্যতের বীজ বপন করেন। তিনি এমন এক কাজ করেন, যার ওপর নির্ভর করে শিশুর প্রথম আহার, শিক্ষার্থীর পাঠ, শ্রমিকের কর্মশক্তি, চিকিৎসকের সেবা, সৈনিকের দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রের অর্থনীতি। কৃষকের ঘামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির টিকে থাকার ইতিহাস।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক সমাজে আমরা অনেক সময় কৃষির এই মৌলিক গুরুত্বকে ভুলে যাই। উন্নয়নের আলোচনায় শিল্প, প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামোর কথা যতটা আসে, কৃষি ততটা গুরুত্ব পায় না। অথচ যে অর্থনীতি খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তিকে দুর্বল করে, সেই অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে কখনোই টেকসই হতে পারে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বহু শক্তিশালী সভ্যতার পতনের পেছনে যুদ্ধের পাশাপাশি খাদ্যসংকট এবং কৃষির অবক্ষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাই কৃষিকে শুধু গ্রামবাংলার একটি পেশা হিসেবে নয়, মানবসভ্যতার ধারক ও বাহক হিসেবে নতুন করে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। কারণ মানুষ যত দূরেই এগিয়ে যাক, যত প্রযুক্তিই আবিষ্কার করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তার জীবন ফিরে আসে সেই মাটির কাছেই, যেখানে একজন কৃষক নীরবে আগামী দিনের জন্য বীজ বপন করে চলেন।
এই মাটির প্রতি, এই কৃষির প্রতি এবং এই কৃষকের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষা ইসলামও অত্যন্ত গভীরভাবে দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে কৃষি, বৃক্ষরোপণ, খাদ্য উৎপাদন এবং জমির সঠিক ব্যবহারের যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে, তা শুধু ধর্মীয় নির্দেশনা নয়; বরং মানবসভ্যতার টেকসই ভবিষ্যতেরও এক অনন্য দর্শন।
মানুষের ইতিহাস যেমন মাটির ইতিহাস, তেমনি কৃষির ইতিহাসও আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহের ইতিহাস। মানুষের পরিশ্রম আর প্রকৃতির দানের এক অপূর্ব সমন্বয়ের নাম কৃষি।
একটি ক্ষুদ্র বীজের ভেতর যে বিশাল সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তা মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না; মানুষ কেবল সেই সম্ভাবনাকে লালন করার চেষ্টা করে। বীজে প্রাণের সঞ্চার, আকাশ থেকে বৃষ্টি, সূর্যের আলো, মাটির উর্বরতা—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত মহান স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণে।
এ কারণেই পবিত্র কোরআনে কৃষি, বৃষ্টি, শস্য, ফলমূল ও সবুজ পৃথিবীর কথা বারবার এসেছে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে তাঁর চারপাশের প্রকৃতির দিকে তাকাতে বলেছেন, যাতে সে উপলব্ধি করতে পারে—জীবনের প্রতিটি আহার আসলে তাঁরই দান।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্য শস্য, জলপাই, খেজুর, আঙুর এবং সব ধরনের ফল উৎপন্ন করেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আন-নাহল: ১০–১১)
অন্যত্র তিনি বলেন, “তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো মৃত ভূমি, যাকে আমি জীবিত করি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করি, যা থেকে তারা আহার করে।” (সূরা ইয়াসিন: ৩৩)
এই আয়াতগুলো শুধু ধর্মীয় বাণী নয়; এগুলো মানবসভ্যতার মৌলিক সত্যেরও ঘোষণা। মানুষ যত উন্নতই হোক, তার প্রতিদিনের জীবন নির্ভর করে একটি শস্যদানা, একটি ফল কিংবা একমুঠো খাদ্যের ওপর। আর সেই খাদ্যের উৎস হলো কৃষি।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কৃষিকাজকে শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে মানবকল্যাণের এক অব্যাহত সেবায় রূপ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ রোপণ করে বা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি কিংবা প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।” (সহিহ মুসলিম: ১৫৫৩)
এই হাদিস ইসলামের সৌন্দর্যকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। একজন কৃষক হয়তো জানেন না, তাঁর লাগানো গাছের ফল কে খেয়েছে, কিংবা তাঁর ক্ষেতের শস্য থেকে কোন পাখি আহার করেছে।
কিন্তু আল্লাহর কাছে সেই প্রতিটি উপকার সংরক্ষিত থাকে নেক আমল হিসেবে। অর্থাৎ কৃষি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি মানবসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আখিরাতের পাথেয়ও।এই আদর্শ শুধু তত্ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসেও তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়।
মুসলিম শাসকেরা কৃষিকে রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, অনাবাদি জমি আবাদে উৎসাহ, কৃষকদের সহায়তা এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ তারা উপলব্ধি করেছিলেন, শক্তিশালী কৃষি ছাড়া শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
আজকের বিশ্বও সেই একই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ যতই বাড়ুক, খাদ্যের বিকল্প তৈরি হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে—যে জাতি তার কৃষিকে রক্ষা করতে পারবে, ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত সেই জাতির হাতেই নিরাপদ থাকবে। (চলবে....)
লেখক: আলেম, কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষক

