Logo

ধর্ম

আত্মীয়ের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ইসলামের আহ্বান

Icon

আমীনুর রহমান নড়াইলী

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৯

আত্মীয়ের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ইসলামের আহ্বান

মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। এসব সম্পর্কের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক একটি বিশেষ নিয়ামত। ইসলামে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনে সহযোগিতা করা এবং সম্পর্ক ছিন্ন না করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়টি এত বেশি গুরুত্ব পেয়েছে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা বা সিলাতুর রাহিম-কে ঈমানদারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান যুগে আত্মীয়তার সম্পর্ক নানা কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে। সম্পদ নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা, অহংকার এবং যোগাযোগের অভাবের কারণে অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো—আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা শুধু সামাজিক ভদ্রতা নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম।

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার নির্দেশ: 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 'আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে প্রার্থনা কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সর্বদা পর্যবেক্ষক।' (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচার এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।' (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯০) এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং তাদের প্রতি সদাচরণ করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।

সিলাতুর রাহিমের গুরুত্ব:

রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭) এই হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে ঈমানের দাবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন প্রকৃত মুমিন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকবেন।

রিজিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘ জীবনের সুসংবাদ:

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার অন্যতম ফজিলত হলো রিজিকে বরকত এবং হায়াত বৃদ্ধি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া পছন্দ করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭)

এখানে আয়ু বৃদ্ধি বলতে অনেক আলেম বরকতময় জীবন বোঝিয়েছেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে, আল্লাহ তার জীবন ও জীবিকার মধ্যে বিশেষ বরকত দান করেন।

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয়াবহতা:

যেখানে ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে, সেখানে এ সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণীও দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 'তোমরা কি এমন নও যে, ক্ষমতা পেলে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এদের ওপরই আল্লাহর লানত।' (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২২-২৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৬) এ হাদিস আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয়াবহ পরিণতির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

প্রকৃত সিলাতুর রাহিম কী: 

অনেকেই মনে করেন, আত্মীয়রা ভালো আচরণ করলে আমরাও ভালো আচরণ করব। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা আরও উচ্চতর।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে নয়, যে বিনিময়ে সম্পর্ক রাখে; বরং প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে, যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলেও সে সম্পর্ক বজায় রাখে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯১)

অর্থাৎ আত্মীয়রা অবহেলা করলেও, কষ্ট দিলেও বা যোগাযোগ না রাখলেও একজন মুমিন যথাসম্ভব সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবেন।

আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব

১. খোঁজখবর নেওয়া

আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, তাদের সুখ-দুঃখে অংশগ্রহণ করা এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখা সিলাতুর রাহিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমান যুগে ফোন, বার্তা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে খুব সহজেই এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।

২. প্রয়োজনে সহযোগিতা করা

আত্মীয়দের মধ্যে কেউ আর্থিক সংকটে পড়লে বা কোনো বিপদে আক্রান্ত হলে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা ইসলামের নির্দেশ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'গরিব আত্মীয়কে দান করলে তা দুটি সওয়াবের কারণ হয়—একটি দানের সওয়াব এবং অন্যটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াব।' (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৫৮; সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ২৫৮২)

৩. অসুস্থতার সময় পাশে থাকা

আত্মীয় অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনে সেবা করা এবং তার জন্য দোয়া করা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অংশ।

৪. পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ

বিয়ে, আকিকা, জানাজা, দাওয়াত বা অন্য পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ আত্মীয়তার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।

৫. ক্ষমাশীল হওয়া

আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ক্ষমাশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটখাটো ভুল বা মতভেদকে বড় করে না দেখে সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে উদারতা প্রদর্শন করা উচিত। নিয়মিত আত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া।

তাই ঈদ ও বিশেষ দিনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। অসুস্থতা বা বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো। পারিবারিক বিরোধ দ্রুত মীমাংসার চেষ্টা করা। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই আত্মীয়তার গুরুত্ব শেখানো। সম্পদ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে সম্পর্ক নষ্ট না করা। আত্মীয়দের জন্য দোয়া করা—আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

মনে রাখতে হবে, আত্মীয়তার সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি সমাজের স্থিতিশীলতারও অন্যতম ভিত্তি। পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন শক্তিশালী হলে সমাজে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নিরাপত্তাবোধ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে আত্মীয়তার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব ও পারিবারিক সংকট বেড়ে যায়।

বর্তমান সমাজে বৃদ্ধ পিতা-মাতার অবহেলা, ভাই-ভাইয়ের বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা এবং আত্মীয়দের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব সমস্যার সমাধানে ইসলামের সিলাতুর রাহিমের শিক্ষা অত্যন্ত কার্যকর।

আজ যখন আত্মীয়তার সম্পর্ক নানা কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন আমাদের উচিত ইসলামের এই মহান শিক্ষাকে নতুন করে হৃদয়ে ধারণ করা। আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, তাদের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, ভুলত্রুটি ক্ষমা করা এবং সম্পর্ক অটুট রাখার চেষ্টা করা একজন মুমিনের কর্তব্য।

আসুন, আমরা আত্মীয়তার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করি, সিলাতুর রাহিমকে জীবনের অংশ বানাই এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এগিয়ে যাই। কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা শুধু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখে না; বরং বান্দার সঙ্গে তার রবের সম্পর্ককেও আরও মজবুত করে তোলে।

লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুত দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন