মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই সুখ, শান্তি ও কল্যাণের সন্ধান করে আসছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ নানা মতবাদ, আইন ও দর্শনের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু মানব রচিত আইন ও মতবাদ সময়ে সময়েই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ মানুষের জ্ঞান সীমিত, দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ এবং স্বার্থের প্রভাব থেকে সে মুক্ত নয়। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ তাআলা সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও সর্বপ্রজ্ঞাময়। তিনি মানুষের স্রষ্টা, তাই মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কোথায় নিহিত, তা তিনি সবচেয়ে ভালো জানেন। এজন্যই আল্লাহ তাআলার প্রণীত সকল বিধান মানুষের কল্যাণ, সুখ ও মুক্তির জন্যই নির্ধারিত হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
‘যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।’ -[সুরা মুলক : ১৪] এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই মানুষের জন্য সর্বোত্তম জীবনব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন। তাই আল্লাহর কোনো বিধানই মানুষের ওপর জুলুম নয়; বরং সবই কল্যাণকর।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।’ -[সুরা বাকারা : ১৮৫] এ আয়াত প্রমাণ করে, ইসলামের বিধান মানুষের জন্য কষ্টকর নয়; বরং তা সহজ, ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণমুখী। নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত-সব ইবাদতেই মানুষের সামর্থ্য ও সক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অসুস্থ ব্যক্তির জন্য বসে নামাজ পড়ার অনুমতি রয়েছে, মুসাফিরের জন্য রোজা ভাঙার সুযোগ রয়েছে, আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে হজ ফরজ হয় না। এটি আল্লাহর রহমত ও মানুষের প্রতি তাঁর কল্যাণকামিতারই প্রমাণ।
আল্লাহর বিধানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- তা মানুষের পাঁচটি মৌলিক বিষয় সংরক্ষণ করে। ইসলামি শরিয়তের উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’ অনুযায়ী শরিয়ত মানুষের ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদ রক্ষা করে।
প্রথমত, ইসলাম মানুষের ধর্ম রক্ষা করে। ঈমান ও আকিদার বিশুদ্ধতা মানুষের আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস মানুষকে হতাশা, অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে।
দ্বিতীয়ত, ইসলাম মানুষের জীবন রক্ষা করে। কোরআনে বলা হয়েছে,
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ -[সুরা নিসা : ২৯]
অন্যত্র বলা হয়েছে,
وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ
‘কিসাসের মধ্যেই তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে।’ -[সুরা বাকারা : ১৭৯]
দেখা যায়, ইসলামে হত্যার শাস্তি কঠোর করা হয়েছে প্রতিশোধের জন্য নয়; বরং সমাজে জীবন রক্ষার স্বার্থে। অপরাধী শাস্তির ভয় করলে হত্যা কমে যায় এবং মানুষের জীবন নিরাপদ হয়।
তৃতীয়ত, ইসলাম মানুষের বুদ্ধি ও বিবেক রক্ষা করে। এজন্য মদ, মাদক ও নেশাজাতীয় সবকিছু হারাম করা হয়েছে। কারণ এসব বস্তু মানুষের বিবেক ধ্বংস করে, পরিবার ভেঙে দেয় এবং সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি করে। আজকের পৃথিবীতে মাদকাসক্তি যে ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে, তা ইসলামের এ বিধানের কল্যাণকর দিককে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
চতুর্থত, ইসলাম মানুষের বংশধারা ও পারিবারিক জীবন রক্ষা করে। এজন্য ব্যভিচার, অশ্লীলতা ও অবাধ যৌনাচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছেÑ
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।’ -[সুরা বনি ইসরাইল : ৩২]
আধুনিক বিশ্বে অবাধ যৌনাচারের ফলে পরিবার ভাঙন, অবৈধ সন্তান, যৌনরোগ ও সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। ইসলাম বহু আগে থেকেই এসব অনিষ্ট থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য শালীনতা, পর্দা ও বৈধ বিবাহব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছে।
পঞ্চমত, ইসলাম মানুষের সম্পদ রক্ষা করে। এজন্য চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, সুদ ও প্রতারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছেন,
فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ
‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ -[সুরা বাকারা : ২৭৯]
সুদের মাধ্যমে অল্পসংখ্যক লোক সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে, আর দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়ে পড়ে। তাই ইসলামে জাকাত, সদকা ও সুদমুক্ত অর্থনীতির মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের জন্য রহমতস্বরূপ। তিনি বলেছেন,
إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ
‘নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ।’ -[সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৯]
তিনি আরও বলেছেন,
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
‘নিজের ক্ষতি করা যাবে না এবং অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না।’ -[সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৪০]
এই হাদিস ইসলামি আইনের একটি মৌলিক নীতি। ইসলামের প্রতিটি বিধানের লক্ষ্য হলো মানুষের ক্ষতি দূর করা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা।
দুঃখজনকভাবে অনেক মানুষ আল্লাহর বিধানকে কঠোর বা সেকেলে মনে করে। অথচ বাস্তবতা হলো, মানুষ যখন আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে যায়, তখন সমাজে অশান্তি, অপরাধ, নৈতিক অবক্ষয় ও পারিবারিক সংকট বৃদ্ধি পায়। আর যখন মানুষ আল্লাহর বিধান মেনে চলে, তখন ব্যক্তি জীবনে প্রশান্তি, পরিবারে সুখ, সমাজে ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজকের বিশ্বে প্রযুক্তিগত উন্নতি হলেও মানুষের মানসিক অশান্তি, আত্মহত্যা, পারিবারিক ভাঙন ও অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হলো মানুষ স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা থেকে দূরে সরে গেছে। তাই প্রকৃত শান্তি ও কল্যাণ পেতে হলে আল্লাহর বিধানের ছায়াতলে ফিরে আসতে হবে।
আল্লাহ তাআলার কোনো বিধানই মানুষের বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রতিটি বিধান মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের জন্য প্রণীত। যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই মানুষের সুখ-দুখ, প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই তাঁর বিধানই সর্বোত্তম, সর্বাধিক ন্যায়সঙ্গত এবং সর্বাধিক কল্যাণকর। একজন মুমিনের কর্তব্য হলোÑআল্লাহর প্রতিটি আদেশকে কল্যাণকর মনে করে আন্তরিকভাবে তা মেনে নেওয়া এবং নিজের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। তবেই ব্যক্তি ও সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ ইহকাল ও পরকালে সফলতা লাভ করবে।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

