Logo

ধর্ম

ইসলামি স্বর্ণযুগ ও আধুনিক ব্যাংকিং

ইতিহাসে অর্থনৈতিক উদ্ভাবনের অনন্য উত্তরাধিকার

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১৬:৩৪

ইতিহাসে অর্থনৈতিক উদ্ভাবনের অনন্য উত্তরাধিকার

মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও স্থাপত্যকলার বিস্ময়কর সাফল্যের চিত্র। কিন্তু এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার এক নীরব অথচ যুগান্তকারী বিপ্লব।

​এটি কেবল সোনা-রুপার লেনদেন বা বাণিজ্যের ইতিহাস নয়; বরং বিশ্বাস, লিখিত দলিল, নৈতিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক অনন্য অর্থনৈতিক সভ্যতার ইতিহাস। খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর প্রতিষ্ঠিত 'বায়তুল মাল' থেকে শুরু করে আব্বাসীয় যুগের সাররাফদের উদ্ভাবিত ‘সাক’ (Sakk) ও ‘সুফতাজা’ (Suftaja)—এসব ব্যবস্থাই পরবর্তী সময়ে আধুনিক চেক, ব্যাংকিং, অর্থ স্থানান্তর এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে।

​আজ আমরা মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং কিংবা ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে অর্থ লেনদেন করি। হাতে নগদ অর্থ ছাড়াই শুধু তথ্য, হিসাব এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই ধারণার কার্যকর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল শত শত বছর আগে বাগদাদ, দামেস্ক ও কায়রোর প্রাণচঞ্চল বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে।

​ইসলামি ব্যাংকিং গবেষক আবদুল কাদের শাচি তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ইউরোপে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিকশিত হওয়ার বহু আগেই মুসলিম বিশ্বে ব্যাংকিংয়ের অধিকাংশ মৌলিক উপাদান চালু ছিল। ইতিহাসের এই বিস্ময়কর অধ্যায় আজও আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।

বায়তুল মাল: ইসলামি অর্থব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি

​ইসলামি অর্থব্যবস্থার সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে। ইসলামি রাষ্ট্রের বিস্তৃতির ফলে জাকাত, উশর, খারাজ, জিজিয়া ও গণিমাহসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতে থাকে। এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বায়তুল মাল’। একে আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। মদিনায় কেন্দ্রীয় কোষাগারের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় আবদুল্লাহ ইবন আরকাম (রা.)-এর ওপর।

​হযরত উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত মালিকানা নয়, বরং জনগণের আমানত হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি নিজেকে সেই সম্পদের মালিক নয়, বরং একজন বিশ্বস্ত তত্ত্বাবধায়ক মনে করতেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাঁর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সতর্কতা আজও প্রশাসনিক ইতিহাসে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। গবেষক মো. হাবিবুর রহমান তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, বায়তুল মাল কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগারই ছিল না; বরং এটি সম্পদের পুনর্বণ্টন, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল।

আব্বাসীয় যুগে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকাশ

​আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে বাগদাদ পৃথিবীর অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নগরীতে পরিণত হয়। এ সময় ‘সাররাফ’ এবং ‘জাহবাধ’ নামে পরিচিত পেশাদার অর্থব্যবস্থাপক ও ব্যাংকারদের উত্থান ঘটে। আবদুল কাদের শাচির গবেষণা অনুযায়ী, তারা আধুনিক ব্যাংকের মতো আমানত গ্রহণ, মুদ্রা বিনিময়, অর্থায়ন, দূরবর্তী অর্থ স্থানান্তর এবং ডকুমেন্টারি ক্রেডিট পরিচালনা করতেন। তাদের কার্যক্রম ছিল শরিয়াহভিত্তিক এবং সুদমুক্ত অর্থনৈতিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ সময় ‘মুদারাবা’ ও ‘মুশারাকা’ ভিত্তিক অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসায়িক মডেল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। এসব ব্যবস্থায় ঝুঁকি ভাগাভাগির পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অর্থের প্রত্যক্ষ সংযোগ নিশ্চিত করা হতো। ঐতিহাসিক ওয়াল্টার জে. ফিশেলও তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিম সভ্যতায় ব্যাংকিংয়ের বিকাশ ছিল সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং অত্যন্ত উন্নত।

সাক ও সুফতাজা: আধুনিক ব্যাংকিংয়ের অগ্রদূত

​মুসলিম অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে যুগান্তকারী উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে ছিল ‘সাক’ এবং ‘সুফতাজা’।

​সাক: এটি ছিল লিখিত অর্থপ্রদানের একটি দলিল, যা আধুনিক চেকের প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন বণিক এক শহরে অর্থ জমা দিয়ে অন্য শহরে সেই অর্থ উত্তোলন করতে পারতেন। ফলে দীর্ঘ ভ্রমণে নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত। অনেক ভাষাবিদের মতে, ইংরেজি ‘Cheque’ শব্দটির শিকড় আরবি ‘সাক’ শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত।

​সুফতাজা: এটি ছিল আধুনিক ‘Bill of Exchange’ বা ‘Letter of Credit’-এর প্রাথমিক রূপ। এর মাধ্যমে বণিকরা নিরাপদে দূরবর্তী অঞ্চলে অর্থ স্থানান্তর করতে পারতেন।

​অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ আব্রাহাম এল. উদোভিচ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, সাক ও সুফতাজা মধ্যযুগীয় ইসলামি অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আরও নিরাপদ, গতিশীল এবং কার্যকর করে তুলেছিল।

ইউরোপীয় ব্যাংকিংয়ে মুসলিম বিশ্বের প্রভাব

​একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় বণিক ও অর্থব্যবস্থাপকরা মুসলিম বিশ্বের উন্নত আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তীতে ভেনিস, জেনোয়া ও ফ্লোরেন্সের ব্যবসায়ীরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন আর্থিক পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজেদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। আবদুল কাদের শাচির গবেষণা অনুযায়ী, ইউরোপে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকাশে মুসলিম বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ডিজিটাল যুগে ইসলামি উত্তরাধিকার

​বর্তমান বিশ্বের ডিজিটাল ব্যাংকিং, অনলাইন ট্রান্সফার, ফিনটেক কিংবা ব্লকচেইন—সবকিছুর মূল দর্শনই বিশ্বাসভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ, হাতে নগদ অর্থ ছাড়াই যাচাইকৃত তথ্য ও নির্ভরযোগ্য রেকর্ডের ভিত্তিতে অর্থের মূল্য স্থানান্তর করা সম্ভব। মুসলিম স্বর্ণযুগে সাক ও সুফতাজার মাধ্যমে এই ধারণার কার্যকর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই বাস্তবায়িত হয়েছিল।

​বর্তমানে ইসলামি ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ এম. উমর চাপরা, মুনাওয়ার ইকবাল এবং ফিলিপ মলিনিউক্সের গবেষণায় দেখা যায়, ইসলামি অর্থব্যবস্থা কেবল মুনাফাকেন্দ্রিক নয়; বরং নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অর্থের সংযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

​ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—মুসলিম সভ্যতা যখন জ্ঞান, নৈতিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক উদ্ভাবনকে একসূত্রে গেঁথেছিল, তখনই তার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটেছিল। আজ আমরা যদি বায়তুল মালের স্বচ্ছতা, সাররাফদের পেশাদারিত্ব এবং সাকের উদ্ভাবনী চেতনাকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বিত করতে পারি, তবে একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; ইতিহাস ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও পথনকশা। আর সেই পথনকশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নৈতিকতা, জবাবদিহিতা, উদ্ভাবন ও বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে শক্তিশালী ও টেকসই।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা। ই-মেইল: minhajattar10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন