Logo

ধর্ম

খলিফাদের কৃষিনীতি ও আমাদের করণীয়

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ১৩:৫৩

খলিফাদের কৃষিনীতি ও আমাদের করণীয়

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কৃষি শুধু জীবিকার একটি মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। ইসলামও কৃষিকে এই দৃষ্টিতেই মূল্যায়ন করেছে। তাই যুগে যুগে মুসলিম খলিফাগণ কৃষিকে কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখেননি; বরং আল্লাহর দেওয়া জমিনের সর্বোত্তম ব্যবহার, মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করা এবং সমাজের কল্যাণ সাধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

খিলাফতের স্বর্ণযুগে কৃষি উন্নয়ন ছিল রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার। কৃষকের উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে এবং চাষাবাদে উৎসাহ দিতে রাষ্ট্র বিভিন্ন বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ করত। কৃষকদের অনেক সময় ফসল ঘরে ওঠার আগেই প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো, যাতে তারা বীজ, কৃষি উপকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে সময়মতো চাষাবাদ শুরু করতে পারেন। এটি ছিল শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; কৃষকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ, আস্থা ও সম্মানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ইসলামের কৃষিবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি যুদ্ধকালেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মুসলিম সেনাপতিদের নির্দেশ দেওয়া হতো, কোনো অবস্থাতেই ফসলি জমি ধ্বংস করা যাবে না, ক্ষেতে আগুন দেওয়া যাবে না এবং কৃষকদের ওপর আক্রমণ করা যাবে না—তারা যে ধর্মেরই অনুসারী হোন না কেন। ইতিহাসবিদ ইয়াকুত আল-হামাবীর মুজামুল বুলদান গ্রন্থে এই নির্দেশনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি শুধু একটি সামরিক নীতিমালা নয়; বরং প্রকৃতি, খাদ্যব্যবস্থা এবং মানুষের জীবিকার প্রতি ইসলামের গভীর দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আজকের বাস্তবতায় এসে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছি?

দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক সমাজে কৃষিকে অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ মর্যাদায় দেখা হয় না। অনেক তরুণ কৃষিকে সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং শেষ বিকল্প হিসেবে ভাবেন। শহরমুখী জীবন, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং কৃত্রিম আধুনিকতার মোহ আমাদের ধীরে ধীরে মাটি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অথচ এই মাটিই আমাদের খাদ্যের উৎস, জীবনের ভিত্তি এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।

কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, আমাদের কৃষকেরা পরিশ্রমে কখনো পিছিয়ে থাকেন না। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, ন্যায্য মূল্য, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সমাজের সম্মান। যখন একজন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান, তখন তার চোখে যে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক দেখা যায়, সেটিই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আশা।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উৎপাদনশীল কাজ, বৃক্ষরোপণ এবং কৃষিকে উৎসাহিত করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে জমিকে অনাবাদি ফেলে রাখা নয়; বরং তা আবাদ করা, মানুষের উপকারে লাগানো এবং জীবনের কল্যাণে ব্যবহার করাই প্রশংসনীয়। একটি গাছ, একটি ফসল কিংবা একটি ফল শুধু মানুষেরই উপকার করে না; পাখি, প্রাণী এবং পরিবেশও এর সুফল ভোগ করে। আর এই উপকার আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য সদকার সওয়াব হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন।

আজ যখন খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষিজমি সংকুচিত হওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে, তখন ইসলামের এই শিক্ষা নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। কৃষিকে শুধু একটি পেশা হিসেবে নয়; বরং জাতীয় দায়িত্ব, অর্থনৈতিক শক্তি এবং ইবাদতের অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

আমাদের সবার পক্ষে বড় কৃষক হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মাটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, বারান্দা কিংবা সামান্য খালি জায়গাতেও ফল, সবজি বা ঔষধি গাছ লাগানো যায়। একই সঙ্গে যারা প্রতিদিন আমাদের খাদ্যের জোগান দেন, সেই কৃষকদের প্রতি সম্মান, সহযোগিতা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

ইসলামের ইতিহাস আমাদের শেখায়—যে রাষ্ট্র কৃষিকে গুরুত্ব দেয়, কৃষককে মর্যাদা দেয় এবং খাদ্য উৎপাদনকে উৎসাহিত করে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি অর্জন করে। আজকের বাংলাদেশেও সেই চেতনা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। কৃষকের কল্যাণ নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়া এবং কৃষিকে লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনো পুরোনো হয় না। সভ্যতার অগ্রগতি যতই হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষকে ফিরে আসতে হয় সেই মাটির কাছেই, যে মাটি তাকে খাদ্য দেয়, জীবন দেয় এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয়। তাই কৃষিকে ভালোবাসা, কৃষককে সম্মান করা এবং উৎপাদনের সংস্কৃতিকে লালন করাই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন