মানুষের জীবনে ধর্ম শুধু কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; বরং এটি তার বিশ্বাস, ভালোবাসা, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। একজন মুসলমানের কাছে আল্লাহ তাআলা, রাসুলুল্লাহ (সা.), কোরআনুল কারিম এবং ইসলামের বিধানসমূহ পৃথিবীর যেকোনো কিছুর চেয়ে অধিক প্রিয়। তাই এসব বিষয় নিয়ে বিদ্রূপ, কটাক্ষ কিংবা অবমাননাকর আচরণ শুধু একজন ব্যক্তির অনুভূতিতেই আঘাত করে না; বরং তা সমাজে বিভেদ, বিদ্বেষ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ইসলাম তাই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের উপাস্যদের গালি দিও না, যাদের তারা আল্লাহ ছাড়া ডাকে। অন্যথায় তারা অজ্ঞতাবশত শত্রুতা করে আল্লাহকে গালি দেবে।’ -[সুরা আনআম : ১০৮]
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের এমনকি মুশরিকদের দেব-দেবীকেও গালি দিতে নিষেধ করেছেন। কারণ এর ফলে তারা প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আল্লাহ তাআলাকে অবমাননা করতে পারে। এ থেকে বোঝা যায়, ইসলাম পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা যেমন অন্যায়, তেমনি নিজের ধর্মের পবিত্র বিষয়গুলোকে অবমাননা করাও ভয়াবহ অপরাধ।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেনÑ ‘তুমি যদি তাদের জিজ্ঞাসা কর, তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো শুধু হাসি-ঠাট্টা ও কৌতুক করছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা কোনো ওজর পেশ করো না। তোমরা ঈমান আনার পর আবার কুফরি করেছ।’ -[সুরা তাওবা : ৬৫-৬৬]
এ আয়াতের পটভূমি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিছু লোক ধর্মীয় বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেছিল। পরে তারা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইলেও আল্লাহ তাআলা তাদের এ অজুহাত গ্রহণ করেননি। বরং স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও রাসুলকে নিয়ে বিদ্রূপ করা ঈমানের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর বিষয়। তাই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত কখনোই নিছক রসিকতা বা বাক-স্বাধীনতার বিষয় হতে পারে না।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, মুনাফিকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিদ্রূপ করা। তারা বাহ্যিকভাবে মুসলমানের পরিচয় দিত, কিন্তু অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করত এবং সুযোগ পেলেই ইসলামের বিধান নিয়ে কটাক্ষ করত। কোরানে তাদের সম্পর্কে ঘোষণা করেছেÑ ‘নিশ্চয় যারা অপরাধী ছিল, তারা মুমিনদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত।’ -[সুরা মুতাফফিফীন : ২৯]
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঈমানদারদের দ্বীনি জীবন, পোশাক-পরিচ্ছদ, ইবাদত-বন্দেগি কিংবা ইসলামের বিধান নিয়ে উপহাস করা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। কেউ হিজাব বা বোরকা নিয়ে বিদ্রূপ করে, কেউ দাড়ি-টুপি নিয়ে কটাক্ষ করে, কেউ আবার ধর্মীয় বিধান কিংবা শরিয়তের আইন নিয়ে তামাশা করে। অনেকে মনে করে, এগুলো ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের অধিকার। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এমন আচরণ অত্যন্ত গর্হিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ -[সুরা আহযাব : ৫৭]
এ আয়াতে ‘কষ্ট দেওয়া’ বলতে শুধু শারীরিক কষ্ট বোঝানো হয়নি; বরং বিদ্রূপ, অপমান, কটূক্তি এবং ধর্মীয় বিষয় নিয়ে অবজ্ঞাসূচক মন্তব্যও এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা এমন লোকদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশাপ ও অপমানজনক শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও মানুষের সম্মান ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’
অর্থাৎ একজন প্রকৃত মুসলমান তার কথা বা আচরণের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করে না। আর যদি কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়, তবে তা তার হৃদয়ে গভীর ক্ষতি সৃষ্টি করে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, কথা বলার আগে চিন্তা করা এবং এমন কোনো মন্তব্য না করা, যা অন্যের বিশ্বাস ও অনুভূতিকে আহত করে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সামাজিক ক্ষতিও অনেক। এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট করে, সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে এবং কখনো কখনো সংঘাত ও সহিংসতার জন্ম দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষ ও উপহাস বহু সময় বড় বড় অস্থিরতার কারণ হয়েছে। তাই সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অপরিহার্য।
তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন মুসলমান নিজেও যেন সীমালঙ্ঘন না করে। ইসলাম প্রতিশোধপরায়ণতা বা অশালীন আচরণের শিক্ষা দেয় না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তুমি প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর এবং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক কর।’ -[সুরা নাহল : ১২৫]
অতএব, কেউ যদি ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে, তাহলে তার জবাব হতে হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে। অশ্লীল ভাষা, গালাগালি কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা শুধু একটি সামাজিক অপরাধ নয়; বরং এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবক্ষয়েরও পরিচায়ক। একজন মুসলমানের কাছে তার দ্বীন, আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলামের বিধান সর্বাধিক সম্মানিত। তাই এসব বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল থাকা, অন্যদেরও সম্মান করতে শেখা এবং সমাজে পারস্পরিক সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। যে সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানুষের বিশ্বাসকে সম্মান করা হয়, সে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যে সমাজে ধর্ম নিয়ে বিদ্রূপ ও অবমাননার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেখানে বিভেদ, অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে পড়ে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র; সবার উচিত ধর্মীয় অনুভূতির মর্যাদা রক্ষা করা এবং পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার ভিত্তিতে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

