Logo

ধর্ম

বোরকা ও হিজাব নিয়ে কটূক্তির ভয়াবহতা

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১৭:০৯

বোরকা ও হিজাব নিয়ে কটূক্তির ভয়াবহতা

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য এতে রয়েছে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা। নারীর মর্যাদা রক্ষা ও সমাজে পবিত্রতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলাম নারীদের জন্য হিজাব ও পর্দার বিধান দিয়েছে। তাই বোরকা ও হিজাব কেবল একটি পোশাক নয়; এটি মুসলিম নারীর ধর্মীয় পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিকতার নামে কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতার অজুহাতে অনেকেই বোরকা ও হিজাব নিয়ে বিদ্রূপ, কটূক্তি ও উপহাস করে থাকে। কেউ সরাসরি হিজাবপরা নারীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ছড়িয়ে দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ভয়াবহ পরিণতির কারণ।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদের হিজাব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন- ‘আর মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে; তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশে টেনে দেয়।’- [সুরা নুর : ৩১]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের সহজে চেনা যাবে এবং তারা উত্যক্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।’- [সুরা আহযাব : ৫৯]

এই আয়াতদ্বয় থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, হিজাব ও পর্দা আল্লাহপ্রদত্ত একটি বিধান। সুতরাং যে ব্যক্তি হিজাব নিয়ে উপহাস করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর একটি বিধানকে তুচ্ছজ্ঞান করার ঝুঁকিতে পড়ে। এটি একজন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর বিষয়।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন- ‘তুমি বলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা কোনো অজুহাত দিও না। তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।’- [সুরা তাওবা : ৬৫-৬৬]

এই আয়াত নাজিল হয়েছিল এমন কিছু লোকের ব্যাপারে, যারা ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের এ আচরণকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন। তাই কেউ যদি ইসলামের কোনো বিধানকে উপহাস করে কিংবা তা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে, তবে তাকে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ, এটি ঈমানের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বর্তমানে দেখা যায়, কেউ কেউ বোরকাপরা নারীকে ‘সেকেলে’, ‘অশিক্ষিত’ বা ‘জঙ্গি মানসিকতার’ বলে আখ্যা দেয়। আবার কেউ বলে, ‘বোরকা পরে নারীরা স্বাধীনতা হারিয়েছে।’ এসব মন্তব্য কেবল সামাজিক অসভ্যতাই নয়, বরং একজন মুসলিম নারীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার শামিল। ইসলাম অন্যের সম্মান রক্ষা করতে এবং কাউকে কটূক্তি না করতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারী যেন অন্য নারীকে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ -[সুরা হুজুরাত : ১১]

এই আয়াতে নারী-পুরুষ উভয়কেই অন্যকে উপহাস করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং বোরকা বা হিজাবের কারণে কাউকে বিদ্রূপ করা এ আয়াতের সরাসরি লঙ্ঘন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না, তাকে অপমান করে না এবং তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে না।’ -[সহিহ মুসলিম]

অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ -[সহিহ বুখারি ও মুসলিম]

এই হাদিসদ্বয় আমাদের শিক্ষা দেয়, একজন মুসলমানের মুখ থেকে এমন কোনো কথা বের হওয়া উচিত নয়, যা অন্যের সম্মানহানি করে বা তাকে কষ্ট দেয়। অথচ বোরকা ও হিজাব নিয়ে কটূক্তি করা সরাসরি একজন নারীর আত্মসম্মানে আঘাত হানে এবং তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দেয়।

বোরকা ও হিজাব নিয়ে বিদ্রূপের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এর মাধ্যমে সমাজে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা হয়। যখন পর্দাশীল নারীদের নিয়ে উপহাস করা হয়, তখন অন্য নারীরা পর্দা পালনে নিরুৎসাহিত হয়। ফলে সমাজে আল্লাহর বিধানের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয় এবং পাপাচার বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়। অথচ ইসলাম সমাজে লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতার পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।’ -[সহিহ বুখারি] অন্য বর্ণনায় এসেছে- ‘প্রত্যেক ধর্মের একটি স্বতন্ত্র চরিত্র রয়েছে, আর ইসলামের স্বতন্ত্র চরিত্র হলো লজ্জাশীলতা।’- [সুনানে ইবনে মাজাহ]

হিজাব ও বোরকা মূলত এই লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতারই বহিঃপ্রকাশ। তাই যারা হিজাবকে তুচ্ছ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের একটি মহান নৈতিক আদর্শকে অবমূল্যায়ন করে।

আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোরকা ও হিজাব নিয়ে বিভিন্ন ট্রল ও ব্যঙ্গচিত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেকেই বিনোদনের নামে এসব শেয়ার করে। অথচ একজন মুসলমানের উচিত, কোনো পাপের কাজে সহযোগিতা না করা। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তোমরা নেককাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো, কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’- [সুরা মায়িদা : ২]

অতএব, হিজাব নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট তৈরি করা, শেয়ার করা কিংবা তাতে উৎসাহ দেওয়া কোনোভাবেই একজন সচেতন মুসলমানের কাজ হতে পারে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, হিজাবপরা একজন নারী সমাজের জন্য বোঝা নয়; বরং তিনি আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করছেন। তাকে উৎসাহ দেওয়া, সম্মান করা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। কেউ যদি হিজাব নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে, তবুও তার উচিত শালীন ভাষায় মত প্রকাশ করা; বিদ্রূপ ও কটূক্তির আশ্রয় নেওয়া নয়।

বোরকা ও হিজাব নিয়ে কটূক্তি শুধু সামাজিক অপরাধ নয়; এটি ধর্মীয় দৃষ্টিতেও অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কারণ, এর মাধ্যমে একজন মুসলিম নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে তুচ্ছ করা হয় এবং সমাজে পাপাচারের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত বোরকা ও হিজাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, কটূক্তি ও উপহাস থেকে বিরত থাকা এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর বিধানের মর্যাদা রক্ষা করার এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন