Logo

ধর্ম

ছুটিতে কওমি শিক্ষার্থীদের করণীয়

Icon

আমীনুর রহমান নড়াইলী

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৭

ছুটিতে কওমি শিক্ষার্থীদের করণীয়

পরীক্ষা শেষ হলেই শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসে। দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, পরীক্ষা ও মানসিক চাপের পর ছুটি যেন এক টুকরো প্রশান্তি। কিন্তু একজন সচেতন শিক্ষার্থীর কাছে ছুটি কখনোই শুধু বিশ্রাম বা বিনোদনের সময় নয়; বরং এটি নিজেকে আরও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার এক মহামূল্যবান সুযোগ। বিশেষ করে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য ছুটি হওয়া উচিত ইলম, আমল, আদব, চরিত্র ও মানবসেবায় সমৃদ্ধ একটি সময়।

​রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "দুটি নেয়ামত সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।" (সহিহ বুখারি) তাই আসুন, জেনে নিই ছুটিতে একজন শিক্ষার্থীর কী কী করণীয় হতে পারে।

নামাজের গুরুত্ব যেন না কমে

​ছুটিতে অনেকের রুটিন এলোমেলো হয়ে যায়। দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, জামাত ছুটে যাওয়া—এসব যেন না হয়। বরং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, বিশেষ করে ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে নামাজ ঠিক রাখতে পারে, সে জীবনের অনেক কিছুই ঠিক রাখতে পারে।

মায়ের খেদমতে জান্নাতের সুবাস খোঁজো

​ছুটির সবচেয়ে সুন্দর সময়টি হোক মায়ের সেবায়। মনে রেখো, যে মা দশ মাস দশ দিন তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, অসংখ্য নির্ঘুম রাত কাটিয়ে তোমাকে বড় করেছেন, নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে তোমার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন—সেই মায়ের সামান্য খেদমতও আল্লাহর কাছে অনেক বড় আমল।

​মায়ের কোনো খেদমতকে ছোট মনে করবে না। এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়া, বাজারের ব্যাগ বহন করা, ঘরের কাজে সহযোগিতা করা, ওষুধ এনে দেওয়া, তাঁর পাশে বসে কথা বলা, তাঁর ক্লান্তি বুঝে নেওয়া—এসব ছোট ছোট কাজই একজন সন্তানের মহৎ চরিত্রের পরিচয় বহন করে।

​ছুটির দিনগুলোতে এমনভাবে মায়ের পাশে দাঁড়াও, যেন তিনি অনুভব করেন—"আমার সন্তান আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।" মনে রেখো, মায়ের একটি আন্তরিক দোয়া এমন অনেক দরজা খুলে দিতে পারে, যা বছরের পর বছর চেষ্টা করেও খোলা যায় না। আর মায়ের কষ্টে অবহেলা করা এমন একটি ক্ষতি, যা পরে হাজার অনুশোচনাতেও পূরণ করা যায় না।

বাবার কাঁধের বোঝা কিছুটা হালকা করো

​বাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নীরবে সারাজীবন সংগ্রাম করে যান। নিজের ক্লান্তি, অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে তিনি পরিবারের সুখ-শান্তির জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেন। ছুটির সময় বাবার পাশে দাঁড়ানো একজন আদর্শ সন্তানের অন্যতম দায়িত্ব। বাজার করা, জমির কাজ, দোকান বা ব্যবসায় সহযোগিতা করা, প্রয়োজনীয় কাজে তাঁর সঙ্গী হওয়া কিংবা শুধু কিছুক্ষণ তাঁর পাশে বসে আন্তরিকভাবে কথা বলাও তাঁর ক্লান্ত হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। মনে রেখো, বাবার কপালের ঘাম মুছে দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আজ তুমি বাবার বোঝা হালকা করবে, ইনশাআল্লাহ একদিন আল্লাহ তোমার জীবনের বোঝাও হালকা করে দেবেন।

আত্মীয়তার বন্ধন আরও দৃঢ় করো

​আজকের ব্যস্ত জীবনে আত্মীয়তার সম্পর্ক দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে ঈমানের অন্যতম পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। ছুটির এই সময়টিকে আত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ বানাও। দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি, মামা-মামি, খালা-খালু, ফুফু-ফুফাসহ আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করো, ফোনে কথা বলো, তাদের জন্য দোয়া করো এবং প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দাও। মনে রেখো, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখলে শুধু পারিবারিক বন্ধনই শক্তিশালী হয় না, আল্লাহ তাআলা জীবন ও রিজিকে বরকতও দান করেন।

প্রতিবেশীর হাসিই হোক তোমার আনন্দ

​একজন উত্তম মুসলমানের পরিচয় শুধু তার ইবাদতে নয়, বরং তার প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণেও প্রকাশ পায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতি এতটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে সাহাবায়ে কেরাম মনে করেছিলেন, হয়তো প্রতিবেশীকেও উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হবে। ছুটিতে অসুস্থ প্রতিবেশীকে দেখতে যাও, বৃদ্ধদের খোঁজ নাও, দরিদ্র প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়াও এবং ছোটদের প্রতি স্নেহশীল হও। তোমার একটি হাসিমুখ, একটি সালাম বা সামান্য সহযোগিতাও কারও জীবনে আনন্দের কারণ হতে পারে। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোও এক ধরনের সদকা।

যা শিখেছ, তা অন্যকে শেখাও

​ইলম যত ভাগ করা যায়, ততই বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তোমাকে কুরআন পড়তে শিখিয়েছেন, নামাজ শিখিয়েছেন, দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান দিয়েছেন—এগুলো শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখো না। আশপাশে এমন অনেক শিশু বা মানুষ আছে, যারা এখনও কুরআন পড়তে পারে না কিংবা নামাজের নিয়ম জানে না। তাদের সময় দাও, ভালোবাসা দিয়ে শেখাও। মনে রেখো, তোমার শেখানো প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি দোয়া এবং প্রতিটি সঠিক আমলের সওয়াব তোমার আমলনামায়ও যোগ হতে থাকবে।

মহল্লায় দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দাও

​একজন মাদরাসা শিক্ষার্থী শুধু নিজের জন্য পড়াশোনা করে না; সে সমাজের জন্যও একটি আশার প্রদীপ। ছুটিতে মহল্লার ছোটদের নিয়ে কুরআন শিক্ষা, মসজিদমুখী করার উদ্যোগ, ইসলামী গল্পের আসর, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সুন্দর চরিত্র গঠনের ছোট ছোট কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। হয়তো তোমার একটি ছোট উদ্যোগ কারও জীবনকে বদলে দিতে পারে। মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা নবীদের উত্তরাধিকার বহন করারই একটি অংশ।

প্রতিদিন একটি ভালো বইয়ের সঙ্গী হও

​ছুটি মানেই বই থেকে দূরে থাকা নয়; বরং ভালো বইয়ের আরও কাছে আসা। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নবী-রাসুলদের জীবনী, সাহাবায়ে কেরামের ত্যাগ, সালাফদের ইলমপ্রেম, মুসলিম মনীষীদের জীবনী, আত্মশুদ্ধি ও আদব-আখলাক বিষয়ক বই পড়ো। একটি ভালো বই মানুষের চিন্তাকে বদলে দেয়, লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে এবং জীবনকে নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। যে শিক্ষার্থী বইকে বন্ধু বানায়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে একা থাকে না।

নতুন একটি দক্ষতা অর্জনের সংকল্প করো

​ছুটির সময়টাকে শুধু বিশ্রামে নয়, দক্ষতা অর্জনেও কাজে লাগাও। আরবি ভাষা চর্চা, সুন্দর হাতের লেখা, বক্তৃতা, লেখালেখি, কম্পিউটারের মৌলিক ব্যবহার, গবেষণার কৌশল কিংবা জনসংযোগের মতো উপকারী দক্ষতা ভবিষ্যতে তোমাকে অনেক এগিয়ে দেবে। একজন আলেমের শুধু ইলম থাকলেই হয় না; সেই ইলম সুন্দরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতাও থাকতে হয়। তাই প্রতিটি ছুটিতে অন্তত একটি নতুন দক্ষতা শেখার লক্ষ্য নির্ধারণ করো।

সমাজসেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত করো

​ইসলাম শুধু মসজিদের ভেটার শিক্ষা নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও শিক্ষা দেয়। ছুটিতে মসজিদ পরিষ্কার করা, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, অসুস্থ মানুষের সেবা, বন্যা বা দুর্যোগে সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করো। মানুষের উপকারে আসার চেয়ে বড় মর্যাদা খুব কমই আছে। মনে রেখো, আল্লাহর কাছে সেই মানুষই সবচেয়ে প্রিয়, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।

কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করো

​ছুটিতে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক যেন আরও দৃঢ় হয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় তিলাওয়াত, হিফজের সবক ও দাওর, অর্থ ও তাফসির অধ্যয়ন এবং কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গড়ার চেষ্টা করো। কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; এটি জীবন পরিচালনার সংবিধান। যার হৃদয়ে কুরআন থাকে, তার জীবন অন্ধকারে হারিয়ে যায় না।

শরীর সুস্থ রাখো, মন সতেজ রাখো

​ইলম অর্জনের জন্য সুস্থ শরীরও একটি বড় নেয়ামত। তাই ছুটিতে নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, পরিমিত খেলাধুলা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি গুরুত্ব দাও। তবে এমন কোনো বিনোদন বা খেলায় জড়িয়ে পড়ো না, যা ইবাদত, পড়াশোনা বা চরিত্রের ক্ষতি করে। সুস্থ দেহ, সতেজ মন এবং পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন একজন শিক্ষার্থীর সফলতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

মোবাইল ব্যবহারে সতর্ক হও

​আজকের যুগে সবচেয়ে বড় সময়চোর হলো মোবাইল ফোন। অসংখ্য শিক্ষার্থীর মূল্যবান ছুটি নষ্ট হয়ে যায় গেম, শর্ট ভিডিও, অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থেকে। যার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে যায় দীর্ঘদিন। ফলে মাদরাসায় ফিরে এসেও পড়াশোনায় ঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারে না। এভাবেই অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থী বিপথগামী হয়ে পড়ে। মনে রেখো, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করো শেখার জন্য, মানুষের উপকারের জন্য এবং দ্বীনের খেদমতের জন্য। সুতরাং প্রয়োজন হলে এমনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করো, যেন তুমি মোবাইলকে নিয়ন্ত্রণ করো; মোবাইল তোমাকে নয়।

সামনের পড়াশোনার প্রস্তুতি নিতে পারো

​ছুটির শেষ দিকে নতুন ক্লাসের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো। নতুন কিতাবগুলো একবার দেখে নাও, পুরোনো দুর্বলতাগুলো দূর করো এবং একটি বাস্তবসম্মত পড়ার রুটিন তৈরি করো। যে শিক্ষার্থী আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়, নতুন পড়াগুলোয় তার আত্মবিশ্বাসও অনেক বেশি থাকে। সফলতা কখনো হঠাৎ আসে না; নিয়মিত প্রস্তুতির ফল হিসেবেই আসে।

​মনে রেখো—ছুটি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ছুটিতে অর্জিত অভ্যাস দীর্ঘস্থায়ী। কেউ ছুটি কাটায় অলসতায়, আর কেউ ছুটিকে ব্যবহার করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। একজন মাদরাসা শিক্ষার্থীর পরিচয় শুধু পরীক্ষার খাতায় নয়; বরং তার নামাজে, চরিত্রে, পারিবারিক দায়িত্বে, সমাজসেবায় এবং দ্বীনের খেদমতে।

​তাই আসো, আমরা এমনভাবে ছুটি কাটাই, যাতে ছুটি শেষে শুধু একটি নতুন ক্লাসে নয়, বরং ঈমান, ইলম, আমল, আদব ও ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল শিক্ষার্থীকে সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করে দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন