Logo

ধর্ম

মুত্তাকী ও নেককার স্ত্রী

ইহকাল-পরকালের প্রকৃত বন্ধু

Icon

ডা. মুহাম্মামাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৫১

ইহকাল-পরকালের প্রকৃত বন্ধু

মানবজীবনে বন্ধু, সহচর ও সঙ্গীর গুরুত্ব অপরিসীম। একজন প্রকৃত বন্ধু মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকেন, ভুল সংশোধন করেন, সৎপথে চলতে উৎসাহিত করেন এবং বিপদের সময় সাহস যোগান। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের সম্পর্ক হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। এই সম্পর্ক কেবল পার্থিব জীবনের জন্য নয়; বরং জান্নাত পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তাই ইসলাম একজন মুত্তাকী ও নেককার স্ত্রীকে শুধু গৃহিণী বা সংসার পরিচালনাকারী হিসেবে নয়, বরং স্বামীর ঈমানের সহযাত্রী, দুঃসময়ের সান্ত্বনাদাত্রী, সন্তানদের প্রথম শিক্ষক এবং ইহকাল ও পরকালের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।

বর্তমান যুগে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি, বিচ্ছেদ ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের অন্যতম কারণ হলো ইসলামী মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়া। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করলে দাম্পত্য জীবন শান্তি, রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বৈবাহিক জীবন আল্লাহর এক মহান নিদর্শন

আল্লাহ তাআলা বলেন—আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" (সূরা আর-রূম:২১) এই আয়াত দাম্পত্য জীবনের মূল দর্শন তুলে ধরেছে।

এখানে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—

প্রথমত: সাকীনাহ—অর্থাৎ মানসিক প্রশান্তি। একজন নেককার স্ত্রী স্বামীর ক্লান্ত হৃদয়ের আশ্রয়স্থল।

দ্বিতীয়ত: মাওয়াদ্দাহ—পারস্পরিক গভীর ভালোবাসা।

তৃতীয়ত: রহমাহ—একে অপরের প্রতি দয়া, ক্ষমাশীলতা ও সহানুভূতি।

যে সংসারে এই তিনটি গুণ বিদ্যমান, সে সংসারই প্রকৃত ইসলামী পরিবার।

নেককার স্ত্রী—দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—দুনিয়া ভোগের বস্তু, আর দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী।"

(সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭)এ হাদিসের মাধ্যমে রাসূল (সা.) ঘোষণা করেছেন যে, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ধন-সম্পদ, ব্যবসা বা প্রাসাদ নয়; বরং একজন নেককার স্ত্রী। কারণ তিনি কেবল সংসারকে সুন্দর করেন না, বরং স্বামীকে আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করেন।

একজন নেককার স্ত্রী স্বামীকে হারাম থেকে রক্ষা করেন, ইবাদতে উৎসাহ দেন, সন্তানের উত্তম লালন-পালন করেন এবং পারিবারিক জীবনে বরকত নিয়ে আসেন।

সর্বোত্তম স্ত্রী কে

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো—সর্বোত্তম স্ত্রী কে?

তিনি বললেন—যার দিকে স্বামী তাকালে সে তাকে আনন্দ দেয়, নির্দেশ দিলে তা পালন করে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতীত্ব ও স্বামীর সম্পদের হেফাজত করে।" (মুসনাদ আহমদ: ৭৪২১) এই হাদিসে আদর্শ স্ত্রীর তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে—

* উত্তম চরিত্র ও হাসিমুখ। * শরিয়তসম্মত বিষয়ে স্বামীর সহযোগিতা। * সতীত্ব, আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততা।

নেককার স্ত্রী ঈমান ও আখিরাতের সহযাত্রী

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের শিক্ষা দিয়েছেন—হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।" (সূরা আল-ফুরকান:৭৪) একজন মুমিন কখনো কেবল সৌন্দর্য, সম্পদ বা বংশের জন্য জীবনসঙ্গী কামনা করেন না; বরং এমন স্ত্রী কামনা করেন, যিনি আল্লাহর পথে চলার অনুপ্রেরণা হবেন।

জান্নাতের সুসংবাদ

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন—যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমজানের রোজা পালন করে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর (শরিয়তসম্মত) আনুগত্য করে, তাকে বলা হবে—জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করো।" (মুসনাদ আহমদ: ১৬৬১) এটি একজন নেককার নারীর জন্য মহান সুসংবাদ। এতে বোঝা যায়, দাম্পত্য জীবনে আল্লাহর বিধান মেনে চলা জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

নেককার স্ত্রী দ্বীনের অর্ধেক পূরণে সহায়ক

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন—যাকে আল্লাহ নেককার স্ত্রী দান করেছেন, তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করতে সাহায্য করেছেন। অতএব, অবশিষ্ট অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।"(তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত; হাদিসটি হাসান অর্থে বহু আলেম উল্লেখ করেছেন)অর্থাৎ, একজন নেককার স্ত্রী মানুষের চরিত্র, লজ্জাশীলতা ও ঈমান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

নবীজির পরিবার—আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ

হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও সহচর। হেরা গুহা থেকে ভীত অবস্থায় ফিরে আসার পর তিনিই সর্বপ্রথম রাসূল (সা.)-কে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, "আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমান করবেন না।" তিনি তাঁর সম্পদ, সময় ও জীবন ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।

হযরত আয়িশা (রা.) ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও তাকওয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি দুই হাজারেরও বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য জ্ঞানের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছেন।

নেককার স্ত্রীর বাস্তব গুণাবলি

একজন নেককার স্ত্রী—* আল্লাহভীরু ও তাকওয়াবান। * পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও অন্যান্য ফরজ ইবাদতে যত্নশীল। * স্বামীকে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও নেক আমলে উৎসাহিত করেন। * সন্তানের ইসলামী চরিত্র গঠনে সচেষ্ট থাকেন। * স্বামীর সম্পদ, সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করেন। * অহংকার, অপচয় ও বিলাসিতা থেকে দূরে থাকেন। * অল্পে সন্তুষ্ট থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। 

* আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে সহযোগিতা করেন। * সুখে কৃতজ্ঞতা ও দুঃখে ধৈর্যের পরিচয় দেন। * পরিবারের জন্য নিয়মিত দোয়া করেন।

এমন স্ত্রী একটি পরিবারকে ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলেন এবং সমাজের জন্য আদর্শ প্রজন্ম তৈরি করেন।

স্বামীর প্রতিও ইসলামের নির্দেশনা

ইসলাম কখনো একতরফাভাবে স্ত্রীর কর্তব্যের কথা বলেনি; বরং স্বামীর ওপরও সমান দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন—তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।"(সুনান তিরমিজি: ৩৮৯৫)

আরও বলেছেন—নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।"(সহিহ বুখারি: ৩৩৩১; সহিহ মুসলিম: ১৪৬৮) সুতরাং একজন আদর্শ স্বামী স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, ন্যায়বিচার, সহানুভূতি ও দয়ার আচরণ করবেন। কারণ স্ত্রী শুধু সংসারের সদস্য নন; তিনি জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

পরিশেষে বলা যায়:-একজন মুত্তাকী ও নেককার স্ত্রী আল্লাহর পক্ষ থেকে অমূল্য উপহার। তিনি স্বামীর হৃদয়ের প্রশান্তি, ঈমানের শক্তি, সন্তানের উত্তম শিক্ষিকা এবং জান্নাতের পথে সহযাত্রী। তিনি দুনিয়ার জীবনে শান্তি, বরকত ও সুখের কারণ হন এবং আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়তা করেন।

তেমনি একজন আদর্শ স্বামীও স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ, সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শনের মাধ্যমে এই বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করেন। যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানান, তখন তাদের দাম্পত্য জীবন কেবল পার্থিব সুখেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা জান্নাত পর্যন্ত বিস্তৃত এক চিরস্থায়ী বন্ধনে পরিণত হয়।আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে এমন মুত্তাকী ও নেককার জীবনসঙ্গী দান করুন, যারা ইহকালে শান্তি, ঈমান ও ভালোবাসার উৎস হবে এবং পরকালে জান্নাতের পথে একে অপরের সর্বোত্তম বন্ধু ও সহযাত্রী হবে। আমীন।

লেখক: কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার।

ইমেইল :drmazed96@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন