Logo

ধর্ম

একটি ছোট্ট অভ্যাস, বদলে দিতে পারে পুরো জীবন

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৬

একটি ছোট্ট অভ্যাস, বদলে দিতে পারে পুরো জীবন

মানুষের জীবনে প্রতিটি ভোর একটি নতুন সূচনা। রাতের অন্ধকার পেরিয়ে যখন প্রথম আলোর রেখা পৃথিবীকে ছুঁয়ে যায়, তখন যেন মহান রব নীরবে আমাদের আরেকটি সুযোগ উপহার দেন। গতকালের ভুল, গাফিলতি ও অপূর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুন করে পথচলা শুরু করার সুযোগ। অথচ দুঃখের বিষয়, নতুন দিনের ব্যস্ততায় ডুবে গিয়ে আমরা অনেকেই সেই সুযোগের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পারি না।

তাই প্রতিটি সকাল শুরু হোক একটি দৃঢ় নিয়ত দিয়ে। নিজের হৃদয়কে বলুন—আজকের দিনটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাটাব। ফরজ ও ওয়াজিব আমলগুলো যথাযথভাবে আদায় করব, সুন্নাহকে জীবনের অলংকার বানানোর চেষ্টা করব। গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখব। কাউকে কষ্ট দেব না, কারও অধিকার নষ্ট করব না। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, অনর্থক ব্যস্ততা ও সময়ের অপচয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখব। জিহ্বাকে সজীব রাখব আল্লাহর জিকিরে, আর প্রতিটি কাজ—তা যত ছোটই হোক বা যত বড়ই হোক—তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই সম্পন্ন করার চেষ্টা করব।

একজন মুমিনের সৌন্দর্য শুধু বেশি বেশি ইবাদতে নয়; বরং নিজের আমলের ব্যাপারে সচেতন থাকার মধ্যেও। সে অন্যের হিসাব নেওয়ার আগে নিজের হিসাব নেয়। অন্যের ত্রুটি খোঁজার আগে নিজের অন্তরকে যাচাই করে। কারণ যে মানুষ প্রতিদিন নিজের ভুলের মুখোমুখি হতে শেখে, আল্লাহ তাকে সত্যের পথে আরও দৃঢ়ভাবে চলার শক্তি দান করেন।

এই কারণেই দিনের শেষে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে অন্তত পাঁচ মিনিট সময় নিজের জন্য রাখুন। পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে একটু দূরে সরে যান। মোবাইল ফোনটি সরিয়ে রাখুন। কিছুক্ষণ নীরবে নিজের হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলুন।

নিজেকে প্রশ্ন করুন—আজকের দিনটি কেমন কাটল? কোন কাজটি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করেছে? কোথায় শয়তানের প্ররোচনায় ভুল করেছি? কোনো ফরজে অবহেলা হয়েছে কি? আমার কথা বা আচরণে কেউ কষ্ট পেয়েছে কি? কারও হক নষ্ট হয়েছে কি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্য কাউকে দিতে হবে না। উত্তর দিতে হবে নিজের বিবেককে। কারণ যে ব্যক্তি দুনিয়াতেই নিজের হিসাব নিতে শেখে, আখিরাতের জবাবদিহির জন্যও সে নিজেকে প্রস্তুত করে।

যদি কোনো ত্রুটি চোখে পড়ে, নিরাশ হবেন না। 

আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। অনুতপ্ত হৃদয়ে বলুন—

“ইয়া আল্লাহ! আজকের দিনের সব ভুল, গাফিলতি ও পাপ আপনি ক্ষমা করে দিন। আমি দুর্বল, আপনি পরম দয়ালু। আগামীকাল যেন আজকের চেয়ে আরও সুন্দরভাবে আপনার আনুগত্য করতে পারি, সেই তাওফীক দান করুন।”

এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো এই দুআটি পড়ুন—

اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে আপনার জিকির করার, আপনার নিয়ামতের শোকর আদায় করার এবং সর্বোত্তমভাবে আপনার ইবাদত করার তাওফীক দান করুন।

জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি সম্পদ হারানো নয়; সময় হারানো। আর সবচেয়ে বড় সফলতা মানুষের প্রশংসা অর্জন নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। তাই প্রতিটি দিন শেষ হওয়ার আগে অন্তরটাকে একবার ঝেড়ে-মুছে নিন। তাওবা ও ইস্তিগফারের অশ্রুতে হৃদয়ের ধুলো ধুয়ে ফেলুন। কারণ কলুষিত হৃদয় নিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না।

মনে রাখবেন, আমরা যতদিন জীবিত আছি, ততদিন ফিরে আসার সুযোগ আছে। তাওবার দরজা এখনো খোলা, সংশোধনের পথ এখনো উন্মুক্ত। কিন্তু মৃত্যু এসে গেলে সেই সুযোগ আর কখনো ফিরে আসবে না। তখন শত অনুশোচনা করেও একটি সিজদা, একটি তাসবিহ কিংবা একটি আন্তরিক তাওবার সুযোগও মিলবে না।

কে জানে, আজকের রাতের পর আগামী সকাল আমার জন্য অপেক্ষা করছে কি না? কে জানে, এই নিঃশ্বাসটিই আমার শেষ নিঃশ্বাস কি না? তাই রাত শেষ হওয়ার আগেই নিজের আমলের হিসাব গুছিয়ে নিই। অতীতের সব গাফিলতির জন্য ক্ষমা চাই। আগামী দিনের জন্য নতুন করে প্রতিজ্ঞা করি—যদি আল্লাহ আমাকে আরেকটি দিন দান করেন, তবে আজকের চেয়ে আরও উত্তম বান্দা হওয়ার চেষ্টা করব।

হে আল্লাহ! আমাদের সকালগুলোকে আপনার স্মরণে আলোকিত করুন, দিনগুলোকে আপনার আনুগত্যে পরিপূর্ণ করুন এবং রাতগুলোকে তাওবা, ইস্তিগফার ও মুহাসাবার সৌন্দর্যে সুশোভিত করুন। আমাদের এমন জীবন দান করুন, যার প্রতিটি দিন আপনার সন্তুষ্টির দিকে এক একটি অগ্রযাত্রা হয়ে ওঠে। আর যখন আমাদের পৃথিবীর সফর শেষ হবে, তখন আপনার ক্ষমা, রহমত ও জান্নাতই যেন হয় আমাদের চূড়ান্ত ঠিকানা।

আসুন, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট নিজের জন্য বরাদ্দ করি। হয়তো এই পাঁচ মিনিটের মুহাসাবাই আমাদের জীবনকে বদলে দেবে, আমলকে শুদ্ধ করবে এবং একদিন আখিরাতের নাজাতের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রতিদিন নিজের আমলের মুহাসাবা করার, আন্তরিক তাওবা করার এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর সন্তুষ্টির পথে অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা: পরিচালক, কতকিছুর হাট

ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন