ক্রয়-বিক্রয় বিষয়টা মানবজীবনের আদিকাল থেকেই পরিচিত। ক্রয়-বিক্রয় বলতে সাধারণত কোনো জিনিস বা বস্তুকে তার সমপরিমাণ বা সমমূল্য বা অন্য কোনো বস্তুর দ্বারা বিনিময় করা অথবা তার মালিকানা পরিবর্তন করাকে বোঝায়। আর এই ক্রয়-বিক্রয় যেভাবেই হোক করে ফেললেই হয়ে যাবে— বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম বিশেষ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে, যা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে মেনে চলতে হয়।
নিম্নে ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও তদসম্পর্কিত হাদীস বর্ণনা করা হলো—
কেনা-বেচার ক্ষেত্রে নম্রতা ও শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ করতে হবে
*হাদীস-১: হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “মহান আল্লাহ এমন সহনশীল ব্যক্তির প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, যে ক্রয়-বিক্রয় ও নিজের অধিকার আদায়ের সময় নম্রতা ও সহনশীলতা বজায় রাখে।” (সহীহ বুখারী)
ক্রয়-বিক্রয়ের সময় নম্রতা ও পরিশীলিত আচরণ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমানে আমরা অনেক দোকানদার ও ক্রেতা উভয়কেই খুব উগ্র ও কঠোর রূপে দেখতে পাই, যা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। ব্যবসার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালো ব্যবহার। আমাদের কারও মাঝে যদি এমন উগ্র স্বভাব থাকে, তবে তা অচিরেই পরিত্যাগ করা উচিত।
অসচ্ছল ও অভাবগ্রস্তদের অবকাশ দেওয়া উচিত
*হাদীস-২: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, “একজন ব্যবসায়ী লোকদেরকে কর্জ (ঋণ) প্রদান করত। কিন্তু সে তার ঋণগ্রহীতাদের কাউকে অসচ্ছল ও দারিদ্র্যপীড়িত দেখলে তার কর্মচারীদের বলত, তাকে ক্ষমা করে দাও (বা সময় দাও)। হতে পারে এজন্য মহান আল্লাহ আমাদেরকেও ক্ষমা করে দেবেন। সুতরাং মহান আল্লাহ সত্যই তাকে ক্ষমা করে দিলেন।” (সহীহ বুখারী)
সুবহানাল্লাহ! কি সুন্দর মানবিক দিকনির্দেশনা। দয়ার নবী (সা.) ছিলেন মানবতার মূর্ত প্রতীক। তিনি যা বলেছেন এবং যা করেছেন, সবই মানবজাতির কল্যাণে। বর্তমান সময়ে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে মানুষের মাঝে বেশ অনীহা দেখা যায়; সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে পাওনা পরিশোধ করতে চান না। আবার অন্যদিকে, অনেক পাওনাদারও গ্রহীতার প্রকৃত বিপদ বা অসচ্ছলতার অজুহাত একেবারেই মানতে চান না। উভয় পক্ষের জন্যই এই হাদিসটিতে অত্যন্ত চমৎকার শিক্ষা রয়েছে।
পণ্যের মালিক মূল্য বলার অধিক হকদার
*হাদীস-৩: হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেন— “হে বনী নাজ্জার! (বাগানের মালিক বনী নাজ্জার গোত্রকে লক্ষ্য করে) তোমরাই তোমাদের বাগানের দাম বলো।” (উল্লেখ্য, সেই বাগানের অংশবিশেষ অনাবাদী ছিল এবং কিছু অংশে খেজুর গাছ ছিল।) (সহীহ বুখারী)
উক্ত হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, বিক্রেতা বা পণ্যের মালিকই প্রথমে মালের দাম নির্ধারণ করে বলার প্রধান হকদার। কিন্তু অনেক দোকানি আছেন যিনি পণ্যের গায়ে স্পষ্ট মূল্য লেখেন না বা নিজে দাম বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে ক্রেতাকে দাম হাঁকাতে বলেন। এটি বাণিজ্যিক শিষ্টাচারের বিপরীত। বিক্রেতার উচিত পণ্যের ন্যায়সংগত মূল্য নিজেই স্পষ্ট করে প্রকাশ করা।
কেনা-বেচার পরও তা বাতিল করার অধিকারের বিশেষ বিধান (খেয়ার)
*হাদীস-৪: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে বেচাকেনা চূড়ান্ত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা পরস্পর আলাদা হয়ে যায়। তবে খেয়ারের (চুক্তি বাতিলের শর্ত) শর্তে ক্রয়-বিক্রয় হলে, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও সেই অধিকার বহাল থাকবে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
বর্তমান সময়ে এই হাদিসের প্রাসঙ্গিকতা অত্যধিক। ইদানিং কিছু অসাধু বিক্রেতা ক্রেতাকে ঠকানোর উদ্দেশ্যে ত্রুটিপূর্ণ মালামাল গছিয়ে দিয়েই সটকে পড়েন অথবা পরবর্তীতে মালামাল ফেরত নিতে বা পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানান। ইসলাম ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই চুক্তি চূড়ান্ত করা বা পরিস্থিতি বুঝে তা বাতিল করার যৌক্তিক সুযোগ ও অধিকার প্রদান করেছে।
কেনা-বেচায় ধোঁকা দেওয়া যাবে না
*হাদীস-৫: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে দীনার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি ইবনে উমর (রা.)-কে বলতে শুনেছেন— জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলল যে, সে ক্রয়-বিক্রয়ের সময় প্রায়ই ধোঁকায় নিপতিত হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, “তুমি যার সাথে বেচা-কেনা করবে, তাকে বলবে— আমার সাথে কোনো ধোঁকা চলবে না।” তখন থেকে সেই ব্যক্তি বেচা-কেনার সময় বলতেন— “আমার সাথে কোনো ধোঁকা চলবে না।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
বর্তমান অনলাইন কেনাকাটার যুগে ধোঁকাবাজি যেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবিতে এক জিনিস দেখিয়ে বাস্তবে নিম্নমানের জিনিস পাঠানো এখন নিত্যদিনের অভিযোগ অধিকাংশ ক্রেতার। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ধোঁকা দিয়ে সাময়িক লাভবান হওয়া গেলেও ব্যবসার বরকত নষ্ট হয়ে যায়। ব্যবসায়িক লেনদেনে সর্বদা স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখা অপরিহার্য।
কোনো হারাম জিনিস বিক্রি করা যাবে না
*হাদীস-৬: হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের বছর মক্কায় অবস্থানকালে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) মদ, মৃত জন্তু, শূকর ও প্রতিমা/মূর্তি ক্রয়-বিক্রয়কে হারাম ও নিষিদ্ধ করেছেন।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
উক্ত হাদিস থেকে আমরা স্পষ্ট জানতে পারি কোন কোন বস্তুর ব্যবসা বা লেনদেন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। যেসব বস্তু বা সেবা মানুষের নৈতিকতা, স্বাস্থ্য ও ঈমানের জন্য ক্ষতিকর, তার ব্যবসা করে অর্জিত আয় ইসলামে হারাম। অতএব, হালাল পণ্যের পরিচ্ছন্ন ব্যবসাই একজন মুসলিমের কাম্য হওয়া উচিত।
একজনের দরদামের ওপর আরেকজন দরদাম করতে পারবে না
*হাদীস-৭: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, “কোনো লোক যেন তার অপর ভাইয়ের দরদাম করার সময় (মধ্যপথে ঢুকে) দরদাম না করে এবং কেউ যেন তার অপর ভাইয়ের বৈবাহিক প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব না পাঠায়। তবে প্রথম ব্যক্তি তাকে অনুমতি দিলে তা ভিন্ন কথা।” (সহীহ মুসলিম)
একজনের দরদামের ওপর আরেকজনের এসে দাম বাড়ানো বা ব্যাঘাত ঘটানো আমাদের সমাজে একটি অন্যায় চর্চা। বিশেষ করে কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য অসাধু উপায়ে যেসব দালাল বা এজেন্ট নিয়োগ করা হয়, যারা কিনতে না এসেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেশি দাম হাঁকায়— তা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এতে প্রকৃত ক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি হয়।
কোনো বস্তু বিক্রয়ের সময় তার দোষ গোপন করা যাবে না
*হাদীস-৮: হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম (সা.) বলেছেন, “ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি সত্য কথা বলে এবং বিক্রেতা তার পণ্যের দোষ-ত্রুটি ক্রেতার কাছে স্পষ্ট প্রকাশ করে দেয়, তবে তাদের এই ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত দান করা হয়। কিন্তু যদি তারা মিথ্যা বলে এবং দ্রব্যের দোষ গোপন করে, তবে তাদের সে ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়।” (সহীহ বুখারী)
পণ্য বিক্রি করার সময় পণ্যের আসল দোষ-ত্রুটি গোপন করা বর্তমানে অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সবাই নিজ পণ্যকে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত হিসেবে প্রচার করতে চান। অথচ পণ্যের ত্রুটি স্পষ্ট বলে দিলে সাময়িক দাম একটু কম পেলেও সেই উপার্জনে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অপরিসীম বরকত লাভ হয়।
বাকিতে এবং বন্ধক রেখেও ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে
*হাদীস-৯: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নবী কারীম (সা.) এক ইহুদির নিকট থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি লৌহ বর্ম বন্ধক রেখে কিছু খাদ্যদ্রব্য বাকিতে খরিদ করেছিলেন।” (সহীহ বুখারী)
এই হাদিসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, প্রয়োজনে বাকিতে কেনাকাটা করা বা কোনো বস্তু জামানত/বন্ধক রেখে লেনদেন করা সম্পূর্ণ বৈধ। একই সাথে এটিও প্রমাণিত হয় যে, অমুসলিমদের সাথে ন্যায়সংগত ও হালাল ব্যবসায়িক লেনদেন করতেও কোনো বাধা নেই।
খাদ্যদ্রব্য বা পণ্য পরিমাপ নির্ণয়ে সঠিকভাবে ওজন করে দেওয়া
*হাদীস-১০: হযরত মিকদাদ ইবনে মা’দীকারব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের খাদ্যদ্রব্য সঠিক পরিমাপ নির্ণয়ে ওজন করবে; তাহলে তোমাদের জন্য তাতে বরকত ও কল্যাণ দান করা হবে।” (সহীহ বুখারী)
পণ্যে বা ওজনে কম দেওয়া একটি ভয়াবহ সামাজিক ও নৈতিক অপরাধ। বর্তমান ডিজিটাল রূপান্তরের যুগে পরিমাপের নতুন নতুন যন্ত্র এলেও ওজনে কম দেওয়ার নানা কৌশলও আবিষ্কৃত হয়েছে। এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পণ্য সঠিক মাপে দিলে ব্যবসায় বরকত বাড়ে, আর কারচুপি করলে সাময়িক লাভ হলেও প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায় ধ্বস নামে।
মজুদদারি ও অসৎ মুনাফাখোরী নিষিদ্ধ
*হাদীস-১১: হযরত সালেম (রা.) তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “আমি দেখেছি, যেসব লোক আন্দাজ বা অনুমান করে (সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে) খাদ্যদ্রব্য কিনত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায় তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হতো। আর সকলের প্রতি নির্দেশ ছিল, তারা যেন এগুলো নিজেদের বাজারে বা নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়ার পরই বিক্রি করে, অর্থাৎ গুদামজাত না করে।” (সহীহ বুখারী)
পণ্য গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং পরবর্তীতে বেশি দামে বিক্রি করে অন্যায্য মুনাফা লোটা ইসলামে চরমভাবে নিষিদ্ধ। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জনগণকে বিপদে ফেলে অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য এই মজুদদারি করে থাকে। এ হাদিসটি তাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা।
হাদিসের কিতাবসমূহে ক্রয়-বিক্রয়ের নীতিমালা সংক্রান্ত এমন আরও অনেক দিকনির্দেশনা রয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন লেনদেন ও ব্যবসায়িক জীবনে এসব নীতি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। আসুন, আমরা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের হুকুম সম্পূর্ণরূপে মেনে চলি এবং হারাম পরিহার করে কেবল হালাল পন্থায় জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সালনা, গাজীপুর।
jony90siddique@gmail.com

