Logo

ধর্ম

যেসব পন্থায় উপার্জিত অর্থ ইসলামে হারাম

Icon

ধর্ম ডেস্ক:

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ২০:০৭

যেসব পন্থায় উপার্জিত অর্থ ইসলামে হারাম

ইসলামে হালাল উপার্জনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষের জীবিকা যেন সৎ ও বৈধ পথে অর্জিত হয়, সে বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। একইভাবে অন্যায়, প্রতারণা, জুলুম কিংবা নিষিদ্ধ কোনো পন্থায় অর্জিত সম্পদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।

সমাজে প্রচলিত ‘হারাম টাকা’ বলতে মূলত এমন অর্থকে বোঝানো হয়, যা মহান আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো পন্থায় উপার্জন করা হয়েছে।

নিচে এমন কয়েকটি উপার্জনের পদ্ধতি তুলে ধরা হলো, যেগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ-

১. আত্মসাৎ করা অর্থ

অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। কারও আমানত, দায়িত্বে থাকা অর্থ কিংবা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে অর্জিত অর্থ হালাল নয়।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে খিয়ানত করবে, কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে তা নিয়ে, যা সে খিয়ানত করেছে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে পুরোপুরি দেওয়া হবে যা সে উপার্জন করেছে এবং তাদের জুলুম করা হবে না।’- সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৬১

২. অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ হস্তগত করা

আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কিংবা প্রতারণা ও কৌশলের আশ্রয় নিয়ে অন্যের সম্পদ হাতিয়ে নেওয়াও ইসলামে নিষিদ্ধ। বৈধ অধিকার ছাড়া অন্যের সম্পদ ভোগ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পরস্পরের অর্থ-সম্পদ অন্যায় অবৈধভাবে ভক্ষণ কোরো না। আর জেনে-বুঝে অপরাধমূলক পন্থায় অপরের সম্পদের কিছু অংশ ভক্ষণ করার উদ্দেশ্যে তা শাসকদের কাছে উপস্থাপন কোরো না।’- সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৮

৩. ঘুষের অর্থ

ঘুষের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। কোনো কাজ অন্যায়ভাবে করিয়ে নেওয়া, নিজের স্বার্থ হাসিল করা কিংবা বৈধ অধিকার আদায়ের পথে অর্থ লেনদেন করা- এসব ক্ষেত্রে ঘুষের বিষয়টি গুরুতর গুনাহ হিসেবে বিবেচিত।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে অভিসম্পাত করেছেন।- আবু দাউদ, হাদিস ৩৫৮০

৪. সুদের অর্থ

সুদের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনকে মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য বৈধ হলেও সুদভিত্তিক লেনদেন ইসলামে নিষিদ্ধ।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’- সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫

৫. চুরি-ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ

চুরি, ডাকাতি কিংবা অন্য কোনো উপায়ে জোরপূর্বক মানুষের সম্পদ দখল করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ধরনের অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হালাল হতে পারে না।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘চোর পুরুষ ও চোর নারী- উভয়ের হাত কেটে দাও...।’- সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩৮

৬. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ

এতিমের সম্পদের ব্যাপারে ইসলামে বিশেষ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। কোনো অভিভাবক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করলে তা গুরুতর অপরাধ।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা অন্যায়ভাবে এতিমের অর্থ-সম্পদ ভক্ষণ করে তারা মূলত নিজেদের পেটে আগুন ভর্তি করে। অচিরেই তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।’- সুরা আন-নিসা, আয়াত ১০

৭. ওজনে কারচুপি করে বাড়তি অর্থ নেওয়া

ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজন ও পরিমাপে কম দেওয়া কিংবা ক্রেতাকে ঠকিয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। সাময়িকভাবে এতে লাভ হলেও এ ধরনের প্রতারণা মানুষের অধিকার নষ্ট করে এবং গুনাহের কারণ হয়।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস সেই ঠকবাজদের জন্য, যারা অন্য লোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে; কিন্তু তাদের ওজন বা পরিমাপ করে দেওয়ার সময় কম দিয়ে থাকে।’- সুরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত ১–৩

৮. সমাজবিধ্বংসী পণ্য বা সেবা থেকে অর্জিত অর্থ

যেসব পণ্য, সেবা বা কার্যক্রম মানুষকে হারাম কাজে উৎসাহিত করে কিংবা সমাজে অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটায়, সেসবের সঙ্গে যুক্ত উপার্জনও ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা চায়, ঈমানদার লোকদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার ঘটুক, তাদের জন্য পৃথিবীর জীবনে এবং পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছে।’- সুরা আন-নুর, আয়াত ১৯

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, তাদেরই জন্য আছে অবমাননাকর শাস্তি।’- সুরা লুকমান, আয়াত ৬

এ ছাড়া মাদক ও জুয়ার মতো সমাজবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা, মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য নির্ধারক তীর ঘৃণ্য শয়তানি কাজ। তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’- সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৯০

হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

ইসলামে শুধু বেশি অর্থ উপার্জনের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়নি; বরং সেই অর্থের উৎস বৈধ কি না, তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষের জীবিকা যদি অন্যের অধিকার হরণ, প্রতারণা, সুদ, ঘুষ, চুরি কিংবা সমাজের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই সম্পদ বাহ্যিকভাবে যতই বেশি হোক, ইসলামের দৃষ্টিতে তা কল্যাণকর নয়।

তাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে হালাল ও বৈধ পথ বেছে নেওয়া এবং হারাম উপার্জনের সব পথ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। বৈধ উপায়ে অর্জিত অল্প সম্পদও মানুষের জন্য শান্তি ও বরকতের কারণ হতে পারে- আর এটাই ইসলামের অর্থনৈতিক নৈতিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

বাংলাদেশেরখবর/আরকে

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন