মানুষের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত—উচ্চশিক্ষাই সম্মান ও সম্পদের প্রধান চাবিকাঠি। অনেকেই মনে করেন, নামের পাশে বড় বড় ডিগ্রি যুক্ত হলেই জীবনের সব দরজা খুলে যাবে; অর্থ, মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা যেন তখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কিন্তু বাস্তব জীবন আমাদের বারবার ভিন্ন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
চারপাশে তাকালেই দেখা যায়, অসংখ্য উচ্চশিক্ষিত মানুষ বছরের পর বছর কর্মসংস্থানের জন্য সংগ্রাম করছেন। আবার এমনও অনেকে আছেন, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি নয়; তবু আল্লাহ তাঁদের হালাল রিজিকে প্রশস্ততা দিয়েছেন এবং সমাজে সম্মানিত অবস্থানও দান করেছেন। এতে শিক্ষার গুরুত্ব কোনোভাবেই কমে যায় না; বরং স্পষ্ট হয়, শিক্ষা মূল্যবান একটি উপায়, কিন্তু শিক্ষা নিজেই রিজিকের মালিক নয়।
একইভাবে অনেকে মনে করেন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, ব্যবসায়িক কৌশল কিংবা দূরদর্শী পরিকল্পনাই সম্পদের মূল রহস্য। আবার কেউ বিশ্বাস করেন, কঠোর পরিশ্রম ও শারীরিক সামর্থ্যই সফলতার একমাত্র ভিত্তি। নিঃসন্দেহে এগুলো সফলতার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়। পৃথিবীতে অসংখ্য মেধাবী, পরিশ্রমী ও বিচক্ষণ মানুষ আছেন, যাঁরা দীর্ঘ সময় অর্থসংকটের সঙ্গে লড়াই করেছেন।
আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁদের সামর্থ্য সীমিত; অথচ আল্লাহ তাঁদের জীবনে এমন বরকত দান করেছেন, যা মানুষের হিসাব-নিকাশকে বিস্মিত করেএই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক সত্য শেখায়—উপায় ও ফল এক বিষয় নয়। মানুষ উপায় অবলম্বন করে, কিন্তু ফলাফলের ফয়সালা করেন আল্লাহ তাআলা।
ইসলামও আমাদের এই ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাই দেয়। ইসলাম কখনো চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে বলেনি; বরং জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি, হালাল উপার্জন এবং সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে শিখিয়েছে, অন্তরের ভরসা যেন উপায়ের ওপর নয়, উপায়ের স্রষ্টার ওপর থাকে। কারণ কোনো উপায় নিজে ফল সৃষ্টি করতে পারে না; ফল দান করেন একমাত্র আল্লাহ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর রয়েছে।” (সূরা হূদ: ৬)
আবার তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” (সূরা আত-তালাক: ২–৩)
এই আয়াতগুলো একজন মুমিনের অন্তরে গভীর প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সে জানে, তার রিজিক কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা বাজারের হাতে বন্দী নয়; সবকিছুর চাবিকাঠি মহান আল্লাহর কাছেই।
অনেকে মনে করেন, একটি ভালো চাকরি পেলেই জীবনের সব সংকট শেষ। কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলে। কত মানুষ আছেন, যাঁদের আয় ভালো; তবু চিকিৎসা, ঋণের বোঝা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদে মাস শেষ হওয়ার আগেই সব অর্থ ফুরিয়ে যায়। বাহ্যিক প্রাচুর্য থাকলেও জীবনে বরকত থাকে না, অন্তরে শান্তিও থাকে না।
আবার কেউ মনে করেন, প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে সম্পর্কই উন্নতির সবচেয়ে বড় সিঁড়ি। অথচ অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস বলে, মানুষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অনেক সময় অপমান, হতাশা ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ পরিবর্তনশীল; আজ যে পাশে আছে, কাল সে-ই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে পরিত্যাগ করেন না।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন। ইসলাম অলসতা কিংবা ভাগ্যনির্ভর নিষ্ক্রিয়তাকে সমর্থন করে না। একজন কৃষক যদি জমিতে বীজই না বোনেন, তাহলে শুধু দোয়া করে ফসলের আশা করতে পারেন না। একজন ব্যবসায়ী যদি সততা, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম ছাড়া শুধু বরকতের অপেক্ষায় থাকেন, সেটিও ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ একজন সাহাবিকে বলেছিলেন, আগে উট বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো। এই একটি হাদিসেই চেষ্টা ও তাওয়াক্কুলের অপূর্ব সমন্বয় ফুটে উঠেছে।
কৃষিপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে রিজিকের এই বাস্তবতা প্রতিদিন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। আমাদের প্রতিষ্ঠান ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক, পাইকার ও ক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি—একই পরিশ্রম, একই ধরনের চাষাবাদ, এমনকি একই ফসল; তবু সবার ফল এক রকম হয় না। একজন কৃষক প্রত্যাশার চেয়েও ভালো দাম পান, আরেকজন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারদরের ওঠানামা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে ক্ষতির মুখে পড়েন।
ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা। অনেক সময় পরিকল্পনা, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। আবার কখনো এমন সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা কোনো ব্যবসায়িক হিসাবেই ছিল না। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—পরিশ্রম করা আমাদের দায়িত্ব, কিন্তু ফলাফলের মালিক একমাত্র আল্লাহ। ব্যবসা আমাকে পরিকল্পনা শিখিয়েছে, আর ঈমান শিখিয়েছে তাওয়াক্কুল।
প্রকৃতপক্ষে সম্পদ, সম্মান এবং সফলতা—সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। কাউকে তিনি প্রাচুর্য দিয়ে পরীক্ষা করেন, কাউকে অভাব দিয়ে। কাউকে মানুষের ভালোবাসা দিয়ে পরীক্ষা করেন, কাউকে উপেক্ষার মধ্যেও ধৈর্যের শিক্ষা দেন। তাই একজন মুমিনের লক্ষ্য শুধু বাহ্যিক সফলতা নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জীবনের বরকত অর্জন।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, আমরা অনেক সময় উপায়কে উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলি। শিক্ষা প্রয়োজন, কিন্তু শিক্ষাকে উপাস্য বানানো নয়। বুদ্ধি প্রয়োজন, কিন্তু বুদ্ধির ওপর অহংকার নয়। পরিশ্রম প্রয়োজন, কিন্তু পরিশ্রমকেই ভাগ্যের স্রষ্টা মনে করা নয়। চাকরি, ব্যবসা, পুঁজি কিংবা পরিচিতি—সবই প্রয়োজনীয় উপায়; কিন্তু এগুলোর কোনোটিই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে স্বাধীন কোনো শক্তি নয়।
তাই আসুন, আমরা শিক্ষা অর্জন করি, দক্ষতা বৃদ্ধি করি, সততার সঙ্গে পরিশ্রম করি, হালাল উপার্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাই এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখি। কিন্তু হৃদয়ের ভরসা রাখি একমাত্র আল্লাহর ওপর। কারণ তিনিই সম্মান দান করেন, তিনিই অপমানিত করেন; তিনিই রিজিক প্রশস্ত করেন, আবার তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী সংকুচিতও করেন। তিনি চাইলে এমন পথ থেকেও রিজিকের দুয়ার খুলে দেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
যে মানুষ এই সত্য হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, তার জীবন থেকে অহংকার দূর হয়, হতাশা মুছে যায়। প্রাচুর্যে সে কৃতজ্ঞ থাকে, সংকটে ধৈর্য ধারণ করে এবং প্রতিটি অবস্থায় নিজের রবের প্রতি আস্থা অটুট রাখে। একজন মুমিনের প্রকৃত সম্পদ এখানেই।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বৈধ উপায় অবলম্বনের পাশাপাশি একমাত্র তাঁর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করার তাওফীক দান করুন। আমাদের রিজিকে বরকত দিন, অন্তরে প্রশান্তি দান করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সম্মান ও সফলতায় ধন্য করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

