Logo

ধর্ম

খাদ্যের অপচয়

ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও আমাদের জীবন

Icon

মাহদী বিন মুসলিম

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০০

ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও আমাদের জীবন

আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নেয়ামত প্রতিনিয়ত আমরা ভোগ করি। তন্মধ্যে রিযিক আল্লাহর অন্যতম একটি নেয়ামত। প্রতিটি মাখলুকের রিযিকের জিম্মাদারি তিনি নিজে নিয়েছেন। কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেছেন, "যমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর জিম্মায়।" (সূরা আন'আম-৩৮)

​তিনি আমাদের কত রকমের সুস্বাদু রিযিক দান করেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এখন তিনি যদি আমাদের রিযিক দান করা বন্ধ করে দিতে চান, তাহলে আমাদের কিছুই করার থাকবে না। কিন্তু আফসোস! সাধারণ মানুষ তো আছেই, এমনকি দ্বীনদার মুসলিমদেরও বিরাট সংখ্যক লোক রিযিকের কদর করে না।

রিযিকের পরিচয়

​'রিযিক' আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো, 'দেওয়া' বা 'দান করা'। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যা কিছু দান করেন, সবই রিযিকের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সম্পদ, আকল-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য, খাদ্য-পানি, সন্তানাদি, বাগ-বাগিচা, খেত-খামার ইত্যাদি সবই রিযিকের অন্তর্ভুক্ত। এই সব ধরনের রিযিকই আমাদের দ্বারা অবমূল্যায়িত হয় এবং এর কারণেই পরে আমরা রিযিক থেকে বঞ্চিত হই। আজ আমরা বিশেষ এক ধরনের রিযিক নিয়ে আলোচনা করব। সেটা হলো আহার সামগ্রী। কারণ, বর্তমান সময়ে এর আধিক্যের কারণে অবমূল্যায়ন ও অপব্যয় প্রচণ্ড হারে বাড়ছে, যা অত্যন্ত পীড়াদায়ক।

রিযিক অপচয়ের কারণ

​বর্তমানে আমাদের কারণে-অকারণে রিযিক অপচয় করার একটি কারণ হলো লৌকিকতা প্রদর্শন। অর্থাৎ, কোনো বিশেষ মেহমানকে কেন্দ্র করে এই পরিমাণ খাবার প্রস্তুত করা হয়, যা কখনোই তার পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয়। পরিশেষে তা অপচয় হয়।

​কখনো নিজেদের সক্ষমতা প্রকাশ করতে গিয়ে আমরা খাবার অপচয় করি। সক্ষমতা দেখাতে হরেক রকম বাহারি খাবারের আয়োজন করি আমরা। কেউ তো শতাধিক আইটেমের খাবার প্রস্তুত করে, যা অধিকাংশ সময়ই অপচয় হয়।

​অহংকারের কারণেও খাবার অপচয় হয়। দেখা যায়, আমাদের অনেক মানুষ বড় একটা খাবার অর্ডার করে বসে পড়ে, অথচ তার এক-দশমাংশ খাওয়ার সাধ্যও তার নেই। শেষে সামান্য খেয়ে বাকিটা ফেলে রেখে যায়।

​তাড়াহুড়ার প্রবণতাও কখনো খাবার অপচয়ের মাধ্যম হয়। কেউ কেউ হিসাব-নিকাশ ছাড়াই শুরুতে একসঙ্গে অনেক খাবার নিয়ে বসে পড়ে। চিন্তা করে, 'শেষে যদি না পাই!' কিন্তু সে এ চিন্তা করে না যে, 'যদি খেতে না পারি?'

​অসতর্কতাও খাবার অপচয়ের একটি কারণ। খাবার শেষে যদি খাবার অতিরিক্ত হয়, তা যদি আমরা সুনির্ধারিত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করি, তাহলে তো খাবারের অপচয় ও নষ্ট হয় না। কিন্তু দেখা যায়, অনেকেই এক্ষেত্রে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। খাবার যথাযথ নিয়মে সংরক্ষণ করে না। ফলে খাবারের অপচয় হয়।

​রিযিক অপচয়ের সবচেয়ে ব্যাপক কারণ হলো, আল্লাহর দেওয়া রিযিকের অবমূল্যায়ন। আমরা চিন্তা করি, "একটু নষ্ট হলে কী আসে যায়? পরের বার আবার কিনে নেব।" কিন্তু যদি আল্লাহর রিযিকের পূর্ণ মূল্যায়ন অন্তরে থাকে, তাহলে এমন চিন্তা কখনো মাথায় আসার কথা নয়।

​এ জাতীয় নানা কারণে আমরা যে কী পরিমাণ রিযিক অপচয় করি, তা কল্পনাতীত। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উন্নত বিশ্বের বড় বড় শহরে যে খাবার অপচয় হয় তার এক-দশমাংশ খাবার পুরো বিশ্বের খাবার-বঞ্চিত মানুষের দুই বেলা খাবার হিসেবে যথেষ্ট হবে। কিন্তু যারা বিনা কারণে ডাস্টবিনে খাবার ছুড়ে ফেলে, তারা কি এই অসহায়দের খবর রাখে?

​কয়েকটি পরিসংখ্যান তুলে ধরলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমেরিকায় প্রায় ৫০ শতাংশ খাবার নষ্ট হয়। ব্রিটেনে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন খাবার নষ্ট হয়ে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। জাপানেও বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হয়। আর বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান তো অপচয়ের অনুষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। মুসলিম দেশগুলোও এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। সৌদি আরবের পানিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী এক ভাষণে বলেন, বর্তমানে সৌদিতে শতকরা ৩৩ শতাংশেরও বেশি খাবার অপচয় হয়। গোটা দেশে বছরে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন রিয়াল মূল্যের খাবার নষ্ট হয়।

​আমাদের দেশের দিকে তাকালে এই চিত্রটি আরো ভয়াবহ আকারে ধরা দেয়। দরিদ্র দেশ, তবুও কত অপচয়! বিবাহ-শাদিসহ অন্যান্য খাবারের অনুষ্ঠানগুলোর খোঁজ-খবর নিন। জমকালো রেস্তোরাঁগুলোর তথ্য নিন। এমনকি আমাদের বাড়িঘরের অবস্থাও তো তেমন প্রশংসনীয় নয়। অথচ আমাদের সমাজের বহু মানুষ একটু খাবারের জন্য কোথায় না কোথায় দৌড়াচ্ছে। ডাস্টবিনে খাবার খুঁজছে। মানুষ-কুকুরে খাবার নিয়ে টানাটানির দৃশ্যও তো কম হয় না। মানবতা আজ কোথায়?

​আমাদের কোনো অনুভূতি নেই। যে মুহূর্তে আমরা দুই হাত ভরে অপচয়ে লিপ্ত, সেই মুহূর্তে বিশ্বের কত মানুষ খাবারের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে!

​আফ্রিকার ১৫ লাখেরও অধিক মানুষ খাদ্যাভাবে দিন কাটায়। তবুও আমাদের বিবেকের টনক নড়ে না। অপচয় রোধে আমাদের ভাবনা জাগে না।

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে রিযিকের মূল্যায়ন

​আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ রিযিকদাতা এবং তিনি মহাশক্তিধর।" (সূরা যারিয়াত-৫৮) তিনি তাঁর নেয়ামতের শুকর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, "যদি তোমরা (আমার নেয়ামতসমূহের) শুকর আদায় করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের (নেয়ামত) বাড়িয়ে দেব। আর যদি তোমরা অবমূল্যায়ন করো, তবে জেনে রাখো, আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।" (সূরা ইবরাহিম-৭) লক্ষ্য করুন, নেয়ামতের অবমূল্যায়নের কারণে আল্লাহ তাআলা কত বড় ধমকি দিয়েছেন।

​আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের নেয়ামত ভোগ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সীমালঙ্ঘন থেকে বেঁচে থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন, "তোমরা খাও ও পান করো, তবে অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।" (সূরা আ'রাফ: ৩১)

​অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, "তোমরা আমার দেওয়া উত্তম রিযিক ভক্ষণ করো এবং বাড়াবাড়ি করো না। অন্যথায় তোমাদের ওপর আমার ক্রোধ নেমে আসবে। আর যার ওপর আমার ক্রোধ আপতিত হবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে।" (সূরা ত্বহা-৮১)

ইসলামের নির্দেশ মধ্যমপন্থা গ্রহণ করা

​ইসলাম সর্বক্ষেত্রে মধ্যমপন্থার কথা বলে। রিযিকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় অধিক খরচ থেকে ইসলাম বারণ করেছে।

আর আল্লাহ তা'আলার এ বিধান মেনে চলা সম্ভব তাদের পক্ষেই, যাদের কাছে ঈমান ও আল্লাহভীতির গুণ রয়েছে, রয়েছে অল্পেতুষ্ট হওয়ার মতো প্রশংসনীয় গুণ।

নবী জীবনের কিছু উপমা

​হযরত আয়েশা (রাযি.) বর্ণনা করে বলেন, "একবার নবীজি (সা.) আমার ঘরে এসে একটি টুকরো রুটি পড়ে থাকতে দেখলে তিনি তা উঠিয়ে পরিষ্কার করে খেয়ে ফেললেন। এরপর বললেন, "আয়েশা! আল্লাহর যে নিয়ামত তোমাদের হস্তগত হয়, সেগুলোর কদর করো। কারণ, যে নিয়ামত একবার চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না।" (ইবনে মাজাহ-৩৩৫৩)

​হযরত জাবের (রাযি.) নবীজি (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, "প্রতিটি কাজের সময়ই শয়তান তোমাদের কাছে আসে, এমনকি খাবারের সময়ও। অতএব, তোমাদের কারো যখন খাবারের লোকমা পড়ে যায়, তখন সে যেন তা উঠিয়ে পরিষ্কার করে খেয়ে নেয়; শয়তানের জন্য রেখে না দেয়। আর যখন খাবার শেষ করবে, তখন যেন হাতের আঙুল চেটে খায়। কারণ, সে জানে না যে, খাবারের কোন অংশে বরকত রয়েছে।" (মুসলিম শরীফ-২০৩৩)

​অথচ এ ব্যাপারে আমাদের সবচেয়ে বেশি উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। আমরা পড়ে যাওয়া লোকমা উঠিয়ে খাওয়াকে লজ্জার কারণ মনে করি এবং সেটা ফেলে দেওয়াকে আভিজাত্য মনে করি। অথচ আভিজাত্যের প্রতীক নবী (সা.) তা উঠিয়ে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

​তাবাকাত ইবনে সা'দ কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত মাইমুনা (রা.) একদা পথ চলতে গিয়ে একটি আনারের দানা পড়ে থাকতে দেখলেন। তিনি সেটি উঠিয়ে বললেন, "আল্লাহর রিযিকের একটি ক্ষুদ্র দানা নষ্ট হওয়াও আল্লাহর অপছন্দনীয়।"

রিযিকের অবমূল্যায়নের পরিণতি

​রিযিকের অবমূল্যায়নের পরিণতি হিসেবে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা মূসা (আ.)-এর উম্মতের নাশুকরির কথা বহুবার উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা যখন তাদের নিয়মিত আসমান থেকে খাবার দিতেন, তখন একপর্যায়ে তারা বলল, "হে মুসা! আমরা এই এক খাবার আর খেতে পারি না। তুমি তোমার রবের কাছে দোয়া করো, যেন তিনি আমাদের জন্য জমিন থেকে সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, গম ইত্যাদি খাবার হিসেবে উৎপন্ন করেন।" (সূরা বাকারা-৬১)

​মূসা (আ.) তাদেরকে নিষেধ করলেন। তবুও তারা একই কথা বলতে থাকল। শেষে আল্লাহ তাদের ওপর রিযিক নাযিল করা বন্ধ করে দিলেন এবং তাদেরকে চাষাবাদের দিকে ফিরিয়ে দিলেন।

আমাদের করণীয়

​আমাদেরকে আল্লাহর রিযিকের গুরুত্ব বুঝতে হবে। ভাবতে হবে, যদি আল্লাহ রিযিক বন্ধ করে দেন, তাহলে কে দেবে এই রিযিক? সূরা আল-মুলকের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, "যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভে চলে যায়, তবে কে তোমাদের প্রবহমান পানি এনে দেবে?"

​এ ব্যাপারে আমাদের জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্রকেও বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অবশ্যই রিযিকের অবমূল্যায়ন রোধে আমাদের সকলকে একযোগে সচেষ্ট হতে হবে। তাহলেই আমরা এর ভয়ংকর পরিণতি থেকে বাঁচতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন