ইমাম ও কওমি শিক্ষা
দাননির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরতার পথে
প্রথম পর্ব
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০৫
একটি জাতির শক্তি শুধু তার জ্ঞান, সংস্কৃতি কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নয়; সেই জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তিও তার মর্যাদা নির্ধারণ করে। আর অর্থনৈতিক ভিত্তি যত বেশি ন্যায়, সততা ও উৎপাদনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজ তত বেশি স্থিতিশীল ও আত্মমর্যাদাশীল হয়ে ওঠে।
আমাদের সমাজে বহুদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—মসজিদ ও কওমি মাদরাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলেমরা কেন নিজেদের জীবিকার জন্য আরও বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন না? কেন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো দান, সদকা, যাকাত কিংবা কুরবানির চামড়ার ওপর নির্ভরশীল? যদি তাঁরা ব্যবসা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অন্যান্য সেবামূলক পেশায় যুক্ত হতেন, তবে কি এই নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো না?
প্রশ্নটি নতুন নয়। আবার এর উত্তরও একরৈখিক নয়। কারণ কওমি মাদরাসা ও মসজিদ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোও বদলেছে। আজ বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে আহ্বান জানায়—দ্বীনি দায়িত্ব অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী হওয়া যায়।
ইসলাম কখনো হালাল উপার্জনকে ইবাদতের বাইরে রাখেনি। বরং হালাল জীবিকা অর্জনকে মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ইতিহাসে আমরা দেখি, নবী-রাসূলদের অনেকেই শ্রম, কৃষি, পশুপালন কিংবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহানবী ﷺ নবুওয়াত লাভের আগে একজন বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী হিসেবে সমাজে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর সততা ও আমানতদারিতার জন্য মানুষ তাঁকে "আল-আমীন" উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যেও হজরত আবু বকর (রা.), হজরত উসমান (রা.) এবং হজরত আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা.)-এর মতো অসংখ্য সফল ব্যবসায়ীর দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাঁরা সম্পদ অর্জন করেছেন, কিন্তু সম্পদের দাস হননি; বরং সেই সম্পদকে মানুষের কল্যাণ ও ইসলামের সেবায় ব্যয় করেছেন।
এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলাম দারিদ্র্যকে আদর্শ বানায়নি; আদর্শ বানিয়েছে হালাল উপার্জন, ন্যায়ভিত্তিক লেনদেন এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহারকে।
আজকের বাংলাদেশে কওমি মাদরাসাগুলো লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে দ্বীনি শিক্ষা দিচ্ছে। হাজারো ইমাম প্রতিদিন মানুষের ঈমান, নৈতিকতা ও পারিবারিক জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো অনুদাননির্ভর। এতে শুধু আর্থিক সীমাবদ্ধতাই তৈরি হয় না; অনেক সময় স্বাধীনভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আত্মনির্ভরতার প্রশ্নটি কেবল অর্থের নয়; এটি মর্যাদা, স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনারও প্রশ্ন।
অন্যদিকে আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্রও গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। নিরাপদ খাদ্যের সংকট, ভেজাল পণ্য, অসাধু ব্যবসা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, বেকারত্ব এবং আস্থার সংকট—এসব সমস্যা প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। এমন সময়ে যদি আলেম সমাজ শুধু মসজিদের মিম্বারে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেন, তাহলে তাঁরা নৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনেরও অগ্রদূত হতে পারেন।
এই উপলব্ধি আমার নিজের জীবনেও ধীরে ধীরে এসেছে।
কওমি মাদরাসায় অধ্যয়নের সময় থেকেই নতুন কিছু শেখার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল প্রবল। রাজশাহীতে জামিয়া সিদ্দিকীয় কওমি মাদরাসা (চন্ডিপুর) পড়াশোনার সময় প্রায়ই একটি পরিচিত ফার্মেসিতে যাওয়ার সুযোগ হতো। সেখানেই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরিচয় হয়। একদিন আলাপের সময় তিনি জানতে চাইলেন, আমি কী করি। আমি বললাম, আমি কওমি মাদরাসার ছাত্র।
আমার উত্তর শুনে তিনি আনন্দ প্রকাশ করলেন। পরে জানালেন, এর আগে আরও কয়েকজন মাদরাসার শিক্ষার্থীকে একই প্রশ্ন করেছিলেন। কেউ বলেছিল, "কিছু করি না", কেউ বলেছিল, "শুধু পড়াশোনা করি।"
আমি তখন বলেছিলাম, "আস-সু'আলু নিসফুল ইলম"—সঠিক প্রশ্ন জ্ঞানের অর্ধেক। কথাটি তাঁর ভালো লেগেছিল। তিনি আমাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে তাঁর তত্ত্বাবধানে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষত পরিচর্যা, ব্যান্ডেজ, রোগীর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, ল্যাবরেটরির কিছু প্রাথমিক কাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ হয়। পরে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পেও সহায়তামূলক কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করি। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—দ্বীনি পরিচয় কোনো দক্ষতা অর্জনের প্রতিবন্ধক নয়; বরং মানুষের কল্যাণে নতুন নতুন দক্ষতা অর্জনও এক ধরনের সামাজিক দায়িত্ব।
আমার জন্মস্থান নাটোর সদর উপজেলার চন্দ্রকলা এলাকাতেও এর একটি অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ রয়েছে। আমাদের এলাকার জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মামুন সাহেব প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবামূলক সহায়তা প্রদান করেন। ছোটখাটো আঘাতের পরিচর্যা, ব্যান্ডেজ এবং জরুরি প্রাথমিক পরামর্শের মাধ্যমে তিনি এলাকার মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। গ্রামীণ বাস্তবতায় এমন উদ্যোগ শুধু সেবাই নয়; মানুষের দুর্ভোগও অনেকাংশে লাঘব করে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে বারবার একটি সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে—একজন আলেমের সবচেয়ে বড় মূলধন তাঁর প্রতি মানুষের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের সঙ্গে যদি দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা এবং সেবার মানসিকতা যুক্ত হয়, তাহলে তিনি শুধু একজন ইমাম বা শিক্ষক নন; সমাজের একজন কার্যকর উন্নয়ন-সহযোগী হয়ে উঠতে পারেন।
তাই আমি মনে করি, আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো—ইমাম ও কওমি মাদরাসাকে শুধু অনুদাননির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে সমাজের উৎপাদনশীল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া। এর অর্থ এই নয় যে সবাই ব্যবসায়ী হবেন; বরং যার যে দক্ষতা, সে সেই দক্ষতাকে হালাল উপার্জন ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাবেন। কেউ স্বাস্থ্যসেবায়, কেউ কৃষিতে, কেউ শিক্ষা উদ্যোক্তা হিসেবে, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউ আবার ন্যায়ভিত্তিক ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
কারণ ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরে সীমাবদ্ধ কোনো জীবনব্যবস্থা নয়; মানুষের প্রতিটি বৈধ, কল্যাণকর ও উৎপাদনশীল কর্মকে ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করার শিক্ষা দেয়।
(চলবে...) পরবর্তী পর্বে: ফার্মেসি, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, "কতকিছুর হাট"-এর বাস্তব অভিজ্ঞতা, শিরকাহ, মুযারাবা এবং আলেমদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ইসলামী উদ্যোক্তা মডেল নিয়ে আলোচনা করা হবে।
লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

