ইমাম ও কওমি শিক্ষা
দাননির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরতার পথে
দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৩:১৩
বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতায়
একটি সমাজের অর্থনৈতিক শক্তি কেবল বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই সমাজের মানুষের সততা, উৎপাদনশীলতা এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর। যে সমাজে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে, সেখানে ব্যবসা শুধু পুঁজি দিয়ে নয়, চরিত্র দিয়েও পরিচালিত হয়। ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম সৌন্দর্য এখানেই—এটি সম্পদের পাশাপাশি নৈতিকতারও অর্থনীতি।
প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করেছি, কেন ইমাম ও কওমি মাদরাসাগুলোর জন্য আত্মনির্ভরতার চিন্তা সময়ের দাবি। কিন্তু আত্মনির্ভরতা কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষতা অর্জন, উৎপাদন এবং মানুষের আস্থা অর্জনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
আমার বিশ্বাস, আগামী দিনের বাংলাদেশে আলেম সমাজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে সেবাভিত্তিক ও উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কারণ ইসলাম ব্যবসাকে শুধু লাভের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি; বরং মানুষের প্রয়োজন পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ প্রবাহ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখেছে।
মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসাই সবচেয়ে টেকসই
একজন আলেম যদি ব্যবসায় নামেন, তাহলে তাঁর প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—মানুষের কোন সমস্যার সমাধান আমি করতে পারি?
আমাদের দেশে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার খাদ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে ভেজাল, প্রতারণা, কৃত্রিম সংকট এবং অস্বচ্ছ বাণিজ্য। এই বাস্তবতায় একজন আলেমের ব্যবসা শুধু নতুন আরেকটি দোকান খোলা নয়; বরং একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হওয়া উচিত।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি—মানুষ পণ্য কেনে, কিন্তু তারও আগে মানুষ বিশ্বাস কেনে।
এই উপলব্ধি থেকেই "কতকিছুর হাট"-এর পথচলা। শুরু থেকেই আমাদের চেষ্টা ছিল কৃষকের কাছ থেকে যতটা সম্ভব সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করা এবং ন্যায্য উপায়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এতে কৃষক তাঁর উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পান, আবার ভোক্তাও তুলনামূলক নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য পাওয়ার সুযোগ পান।
বাস্তবে দেখেছি, কৃষকের সবচেয়ে বড় চাওয়া সব সময় বেশি দাম নয়; বরং ন্যায্য দাম এবং নিশ্চিত বাজার। অন্যদিকে একজন ভোক্তারও সবচেয়ে বড় চাওয়া কম দাম নয়; বরং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পণ্য। একজন ইসলামী উদ্যোক্তার কাজ এই দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করা।
ফার্মেসি ও স্বাস্থ্যসেবা: একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র
গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখনো অনেক মানুষ ছোটখাটো স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে প্রাথমিক পরামর্শ পাওয়ার জন্য দূরে যেতে বাধ্য হন। অথচ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আইনসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একজন আলেম ফার্মেসি, স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম কিংবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সহায়তার মতো বৈধ ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে যুক্ত হতে পারেন।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে—চিকিৎসকের বিকল্প হওয়া নয়; বরং প্রশিক্ষণ ও আইনের সীমার মধ্যে থেকে মানুষের জন্য সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা।
মসজিদকেন্দ্রিক একটি বৈধ ও সুশৃঙ্খল ফার্মেসি, স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষার মতো মৌলিক সেবা, রোগীকে সময়মতো চিকিৎসকের কাছে পাঠানো—এসব উদ্যোগ মানুষের উপকারের পাশাপাশি একটি স্থায়ী ও হালাল আয়ের পথও হতে পারে।
ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই এই ধরনের সেবামূলক উদ্যোগ শুধু ব্যবসা নয়; এটি সামাজিক দায়িত্বও।
কৃষিভিত্তিক ব্যবসা কেন সবচেয়ে সম্ভাবনাময়
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। কিন্তু উৎপাদনকারী কৃষক এবং ভোক্তার মাঝখানে দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থা, তথ্যের অভাব এবং অস্বচ্ছ লেনদেনের কারণে অনেক সময় উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এখানেই আলেম সমাজের জন্য একটি বড় সুযোগ রয়েছে। যদি তাঁরা কৃষিপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের মতো খাতে সৎ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাহলে একই সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়বে, ভোক্তা নিরাপদ খাদ্য পাবেন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
একজন ইমাম বা আলেম যখন কৃষকের ঘরে যান, মানুষ তাঁকে শুধু একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখেন না; তাঁকে একজন বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবেও দেখেন। এই সামাজিক আস্থাই ইসলামী উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় মূলধন।
শিরকাহ, মুযারাবা ও আত্মনির্ভরতার বাস্তব পথ
প্রশ্ন হলো, একজন ইমাম, আলেম কিংবা কওমি মাদরাসা কীভাবে শরিয়াহসম্মত উপায়ে ব্যবসার মূলধন সংগ্রহ করবেন? প্রচলিত ব্যাংকঋণ বা সুদভিত্তিক অর্থায়ন ইসলামী অর্থনীতির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, হালাল ব্যবসার পথ সংকুচিত। বরং ইসলাম বহু আগেই ন্যায়সঙ্গত ও অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থায়নের কার্যকর কাঠামো উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ্ধতি হলো শিরকাহ (অংশীদারিত্ব) এবং মুযারাবা (লাভের অংশীদারিভিত্তিক বিনিয়োগ)।
শিরকাহর মাধ্যমে কয়েকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি তাঁদের মূলধন একত্র করে একটি ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। অন্যদিকে মুযারাবায় একজন মূলধন প্রদান করেন এবং অন্যজন তাঁর শ্রম, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করেন। পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে লাভ বণ্টিত হয়, আর লোকসানের ক্ষেত্রে শরিয়াহ নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। ইসলামী সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এই দুটি পদ্ধতির ভিত্তিতেই অসংখ্য সফল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়ও এই মডেল অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। কয়েকজন ইমাম, আলেম, শিক্ষিত তরুণ, উদ্যোক্তা এবং সমাজের সচ্ছল মানুষ যদি স্বচ্ছ চুক্তি, লিখিত হিসাব, নিয়মিত নিরীক্ষা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে একত্রিত হন, তাহলে কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, ফার্মেসি, নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুদ্র উৎপাদনশিল্প কিংবা বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও শরিয়াহসম্মত অর্থনৈতিক উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব।
তবে এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলধন অর্থ নয়; আমানতদারিতা। মানুষ তার অর্থ সেখানে বিনিয়োগ করে, যেখানে সে সততা, স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা খুঁজে পায়। তাই একজন ইসলামী উদ্যোক্তার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত একজন বিশ্বস্ত আমানতদার হিসেবে; সফল ব্যবসায়ী হওয়া তার পরের বিষয়।
আমার নিজের উদ্যোক্তা জীবনের অভিজ্ঞতাও এই সত্যকে নতুন করে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। "কতকিছুর হাট" পরিচালনার পথে আমি দেখেছি, ব্যবসার প্রকৃত শক্তি মূলধনে নয়; মানুষের আস্থায়। কৃষকের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ, পণ্যের মানের ক্ষেত্রে আপসহীনতা এবং ভোক্তার প্রতি দায়বদ্ধতা—এই তিনটি নীতিই একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের ভিত্তি। বিজ্ঞাপন একজন ক্রেতাকে একবার নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু সততা ও বিশ্বস্ততাই তাকে বারবার ফিরিয়ে আনে।
আমার বিশ্বাস, আগামী দিনের বাংলাদেশে আলেম সমাজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে সেবাভিত্তিক ও উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তা সংস্কৃতি। এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক, যেখানে কৃষক তাঁর উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবেন, ভোক্তা নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য পাবেন, কর্মচারীরা সম্মানজনক পরিবেশে কাজ করবেন এবং বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছ হিসাব ও জবাবদিহির নিশ্চয়তা পাবেন। তখন ব্যবসা শুধু ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম থাকবে না; এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনকল্যাণের একটি শক্তিশালী উপায়ে পরিণত হবে।
ইসলামের ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি সভ্যতা শুধু মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে নয়; ন্যায়ভিত্তিক বাজারব্যবস্থা, বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী এবং সৎ অর্থনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমেও বিকশিত হয়। তাই আজ আমাদের প্রয়োজন এমন উদ্যোক্তা, যিনি লাভের পাশাপাশি জবাবদিহিতাকেও সমান গুরুত্ব দেন; এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, কর্মচারী, বিনিয়োগকারী ও ভোক্তা—সবার অধিকার সংরক্ষিত থাকে। কারণ হালাল রিজিক কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় নয়; এটি একটি ন্যায়নিষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক সমাজ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।
আমাদের প্রত্যাশা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শত শত ইমাম, আলেম, শিক্ষিত যুবক ও উদ্যোক্তা শরিয়াহভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলবেন। তাঁরা প্রমাণ করবেন—হালাল পথে থেকেও সফল হওয়া যায়, সততা দিয়েও বড় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা যায় এবং ব্যবসাও মানুষের সেবা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। এমন উদ্যোগ শুধু কিছু প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বয়ে আনবে না; বরং একটি আত্মনির্ভর, নৈতিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

