ইসলামে মুহতাসিব ও আধুনিক ভোক্তা অধিকার
(প্রথম পর্ব)
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৪৪
একটি সভ্যতার প্রকৃত শক্তি কেবল তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি কিংবা সামরিক সামর্থ্যে নিহিত নয়; বরং তার বাজারব্যবস্থার ন্যায়বিচার, লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং জনগণের পারস্পরিক আস্থার ওপর নির্ভরশীল। যে সমাজে একজন মানুষ প্রতারণার ভয় ছাড়াই বাজারে যেতে পারেন, উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পান, ব্যবসায়ী আমানতদারিতাকে নিজের পরিচয়ের অংশ মনে করেন এবং ভোক্তার অধিকার রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের কাছেই সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে—সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে একটি কল্যাণরাষ্ট্র।
আধুনিক বিশ্বে Consumer Rights Protection, Food Safety, Quality Control এবং Market Regulation রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বাংলাদেশেও Directorate of National Consumer Rights Protection (DNCRP), Bangladesh Food Safety Authority (BFSA) এবং Bangladesh Standards and Testing Institution (BSTI) নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তার অধিকার এবং পণ্যের মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। কিন্তু অনেকেরই অজানা, আধুনিক এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক দর্শনের সঙ্গে ইসলামের দেড় হাজার বছরের পুরোনো এক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিস্ময়কর মিল রয়েছে। সেই ব্যবস্থার নাম Hisbah, আর এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বলা হতো Muhtasib।
ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে বাজার কখনো কেবল কেনাবেচার স্থান ছিল না; এটি ছিল ন্যায়বিচার, আমানতদারিতা এবং সামাজিক আস্থার প্রতিচ্ছবি। তাই ইসলামী সভ্যতার বিকাশে যেমন মসজিদ, মাদরাসা ও বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব ছিল, তেমনি ছিল একটি সুষ্ঠু ও নৈতিক বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠারও অপরিসীম গুরুত্ব।
Hisbah কী?
Hisbah (الحسبة) শব্দটি আরবি হাসিবা ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ—হিসাব নেওয়া, তদারকি করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সমাজে সৎকাজ প্রতিষ্ঠা ও অসৎকাজ প্রতিরোধ করা (Al-Amr bil Ma'ruf wa An-Nahy 'anil Munkar)।
তবে Hisbah কেবল একটি ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা নয়; এটি ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য ছিল বাজারে প্রতারণা রোধ, ওজন ও পরিমাপের সঠিকতা নিশ্চিত করা, খাদ্যের মান সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য রক্ষা, মূল্যসন্ত্রাস প্রতিরোধ এবং জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইমাম আল-মাওয়ার্দী তাঁর Al-Ahkam as-Sultaniyyah গ্রন্থে Hisbah-কে এমন একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যার মাধ্যমে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায় প্রতিরোধ এবং জনগণের অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হয়। তাঁর মতে, এটি বিচার বিভাগের বিকল্প নয়; বরং আদালতে যাওয়ার আগেই জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধানের একটি কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
Muhtasib কে ছিলেন?
Muhtasib ছিলেন ইসলামী রাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, যার প্রধান দায়িত্ব ছিল বাজার তদারকি এবং জনস্বার্থ রক্ষা।
তিনি নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করতেন, দাঁড়িপাল্লা ও ওজন পরীক্ষা করতেন, ভেজাল খাদ্য অপসারণ করতেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুতদারি প্রতিরোধ করতেন, ব্যবসায়ীদের সতর্ক করতেন এবং প্রয়োজনে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন।
আধুনিক ভাষায় বলতে গেলে, একজন Muhtasib-এর দায়িত্বের মধ্যে Consumer Protection Inspector, Food Safety Officer, Standards Inspector, Market Regulator এবং Public Ethics Commissioner—সবগুলোরই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল।
তবে তাঁর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রশাসনের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তিনি কেবল আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা ছিলেন না; বরং নৈতিকতার শিক্ষকও ছিলেন। তিনি ব্যবসায়ীদের মনে করিয়ে দিতেন—একজন ক্রেতা কেবল লাভের উৎস নন; তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি আমানত।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে Hisbah-এর ভিত্তি
Hisbah-এর মূল ভিত্তি পবিত্র কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। তারাই সফলকাম।" (সূরা আলে ইমরান : ১০৪)
আরও ইরশাদ হয়েছে, "তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।" (সূরা আলে ইমরান : ১১০)
এই আয়াতগুলো ব্যক্তিগত নসিহতের পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতারও ভিত্তি স্থাপন করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে, তবে সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিরোধ করে; যদি তা সম্ভব না হয়, তবে মুখ দ্বারা; আর তাও সম্ভব না হলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। আর এটিই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।" (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস থেকেই ইসলামী সমাজে প্রশাসনিক তদারকি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের নৈতিক ভিত্তি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নববী যুগে বাজার তদারকি
মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই বাজার তদারকি করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি বিখ্যাত ঘটনায় তিনি এক ব্যবসায়ীর খাদ্যের স্তূপে হাত প্রবেশ করিয়ে নিচের অংশ ভেজা দেখতে পান। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করেন,
—"এটি কী?"
ব্যবসায়ী বললেন, বৃষ্টির কারণে এমন হয়েছে।
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "তুমি ভেজা অংশ ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ তা দেখতে পারে? যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।"
এই একটি হাদিসই ইসলামী ভোক্তা অধিকার দর্শনের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। এখানে শুধু ভেজাল নিষিদ্ধ করা হয়নি; তথ্য গোপন করাকেও প্রতারণা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি ওজনে কম দেওয়া, কৃত্রিমভাবে মূল্য বৃদ্ধি, বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য সৃষ্টি এবং মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নেওয়ার বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
খোলাফায়ে রাশেদিনের সময় Hisbah
খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে Hisbah আরও সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। বিশেষ করে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বাজার ব্যবস্থাপনায় অসাধারণ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই নিজে বাজারে গিয়ে ওজন, পরিমাপ, মূল্য এবং ব্যবসায়িক আচরণ পর্যবেক্ষণ করতেন।
ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, তিনি শাফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.)-কে বাজার তদারকির দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। এটি ইসলামী প্রশাসনের ইতিহাসে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
এই সময় বাজার তদারকি কেবল অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছিল না; বরং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি অপরিহার্য অংশ ছিল।
উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানীয় যুগে Hisbah-এর বিকাশ
উমাইয়া শাসনামলে Hisbah একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো লাভ করে। আব্বাসীয় যুগে Muhtasib-এর দায়িত্ব আরও বিস্তৃত হয়। বাজার তদারকির পাশাপাশি তিনি চিকিৎসক, ওষুধ প্রস্তুতকারী, কারিগর, নির্মাণকর্মী, কসাইসহ বিভিন্ন পেশার মান ও জননিরাপত্তাও পর্যবেক্ষণ করতেন।
পরবর্তীকালে উসমানীয় (Ottoman) সাম্রাজ্যে Hisbah পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। খাদ্যের মান, জনস্বাস্থ্য, নগর পরিচ্ছন্নতা, বাজার ব্যবস্থাপনা, রাস্তা-ঘাট এবং ব্যবসায়িক শৃঙ্খলার জন্য বিস্তারিত বিধিমালা প্রণীত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি মধ্যযুগের অন্যতম উন্নত জনস্বার্থভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার উদাহরণ।
Muhtasib-এর দায়িত্ব
একজন Muhtasib-এর দায়িত্ব ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ওজন ও পরিমাপ পরীক্ষা করতেন, ভেজাল পণ্য অপসারণ করতেন, খাদ্যের মান নিশ্চিত করতেন, কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি প্রতিরোধ করতেন, বাজারের পরিচ্ছন্নতা তদারকি করতেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতেন এবং ব্যবসায়ীদের নৈতিক আচরণ নিশ্চিত করতেন। অর্থাৎ তাঁর দায়িত্ব কেবল বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং জনগণের আস্থা ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।
আধুনিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনামূলক পরিচয়
আজ বাংলাদেশে DNCRP ভোক্তার অধিকার রক্ষা করে, BFSA নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করে এবং BSTI পণ্যের মান ও মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে।
অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্রে একজন Muhtasib এই তিন প্রতিষ্ঠানের অনেক দায়িত্বই একসঙ্গে পালন করতেন। তবে এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানত আইন ও বিধিমালার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু Hisbah-এর লক্ষ্য ছিল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক জবাবদিহিতা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে অনিয়ম প্রতিরোধ করা।
Hisbah-এর নৈতিক দর্শনের ভূমিকা
Hisbah-এর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর নৈতিক ভিত্তি। ইসলামে ব্যবসা কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একটি ইবাদত এবং একটি আমানত। একজন ব্যবসায়ী যদি একজন ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা করেন, তবে তিনি শুধু আইনের কাছেই নয়, আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করবেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।" (জামে তিরমিজি)
এই শিক্ষা ব্যবসাকে কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে নয়; বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আজকের পৃথিবীতে আইন মানুষকে শাস্তির ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু বিবেক জাগ্রত করতে পারে না। Hisbah-এর প্রকৃত শক্তি এখানেই—এটি আইনের পাশাপাশি মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, সততা এবং জবাবদিহিতার চেতনা গড়ে তোলে। আর সেই কারণেই ইসলামী বাজারব্যবস্থার ভিত্তি ছিল কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং বিশ্বাস, ন্যায়, আমানতদারিতা এবং মানবকল্যাণ।
(চলবে... পরবর্তী পর্ব: Hisbah ও আধুনিক Consumer Protection-এর মৌলিক পার্থক্য, বাংলাদেশের বর্তমান বাজারব্যবস্থার বাস্তবতা, DNCRP, BFSA ও BSTI-এর কার্যক্রম, ভেজাল, সিন্ডিকেট, অনলাইন প্রতারণা এবং Hisbah-এর আলোকে বাস্তবভিত্তিক করণীয়)
লেখক: আলেম, লেখক ও কৃষি উদ্যোক্তা

