Logo

ধর্ম

ফুটপাতে ব্যবসা হালাল না হারাম

ইসলামে ব্যবসার স্বাধীনতা, জনস্বার্থ ও রাস্তার অধিকার

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:২২

অ
ইসলামে ব্যবসার স্বাধীনতা, জনস্বার্থ ও রাস্তার অধিকার

মানুষের জীবিকা অর্জন ইসলামে শুধু অর্থ উপার্জনের একটি মাধ্যম নয়; এটি ইবাদতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যদি তা হালাল উপায়ে, সততা, আমানতদারি ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। ইসলাম মানুষের শ্রম, উদ্যোগ এবং বৈধ ব্যবসাকে সম্মানিত করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

তবে ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি কেবল ব্যবসা করার স্বাধীনতাই দেয়নি; একই সঙ্গে মানুষের অধিকার, জনস্বার্থ, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং নাগরিক দায়িত্বকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন কোনো জীবিকা গ্রহণযোগ্য নয়, যা অন্য মানুষের কষ্ট, অধিকারহানি বা জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একজনের রিজিকের পথ যেন অন্যের দুর্ভোগের কারণ না হয়—এ ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই ইসলামী শরিয়তের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

আজ বাংলাদেশের শহরগুলোর ফুটপাত যেন দুটি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকার অবলম্বন, অন্যদিকে লাখো পথচারীর চলাচলের একমাত্র নিরাপদ পথ। পুঁজির অভাবে অনেক মানুষ ফুটপাতে বসে সংসারের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করেন। আবার অনেক স্থানে ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কে চলাচল করেন; বাড়ে দুর্ঘটনা, যানজট এবং জনভোগান্তি।

এমন বাস্তবতায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ফুটপাতে ব্যবসা করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল, নাকি হারাম?

এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। কারণ ইসলামী শরিয়তে কোনো কাজের বিধান কেবল তার নামের ওপর নির্ভর করে না; বরং তার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, পরিবেশ, পরিণতি এবং মানুষের অধিকারের ওপরও নির্ভরশীল। তাই ফুটপাতে ব্যবসার বিষয়টিও আবেগ দিয়ে নয়; বরং কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ফিকহের মৌলিক নীতিমালার আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—ফুটপাতে কাপড়, ফল, সবজি বা অন্য কোনো বৈধ পণ্য বিক্রি করা নিজেই হারাম নয়। যদি পণ্য হালাল হয়, লেনদেনে প্রতারণা না থাকে এবং শরিয়তের বিধান মেনে ব্যবসা পরিচালিত হয়, তবে ব্যবসা মূলত বৈধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও ব্যবসা করেছেন এবং তাঁর অনেক সাহাবি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। ইসলাম কখনো হালাল ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করেনি; বরং বৈধ উপার্জনকে সর্বোত্তম জীবিকার অন্যতম হিসেবে উৎসাহিত করেছে।

কিন্তু ইসলাম শুধু ব্যবসার অধিকারই দেয়নি; মানুষের চলাচলের অধিকারও নিশ্চিত করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "তোমরা রাস্তার ধারে বসা থেকে বিরত থাকো।" সাহাবায়ে কেরাম বললেন, "আমাদের সেখানে বসতেই হয়।" তখন তিনি বললেন, "যদি বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করো।" তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, "রাস্তার হক কী?" তিনি বললেন, "দৃষ্টি অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এই হাদিসে বিশেষভাবে "কাউকে কষ্ট না দেওয়া"কে রাস্তার অন্যতম অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, যদি কোনো ব্যবসা মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, ফুটপাত দখল করে, বৃদ্ধ, শিশু, নারী কিংবা প্রতিবন্ধী মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয় অথবা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, তবে তা ইসলামের শিক্ষা ও ন্যায়নীতির পরিপন্থী।

বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে দেখা যায়, অনেক ফুটপাত সম্পূর্ণভাবে দোকানে ভরে যায়। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, যানজট সৃষ্টি হয় এবং জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। তখন বিষয়টি আর কেবল ব্যবসার থাকে না; এটি হক্কুল ইবাদ—মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামের একটি বিখ্যাত ফিকহি নীতি হলো—"লা দরার ওয়া লা দিরার", অর্থাৎ "ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিদান হিসেবে ক্ষতিও করা যাবে না।" তাই নিজের জীবিকার জন্য অন্য মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করা বা জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন করা ইসলামী ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং পুঁজির সংকটের কারণে ফুটপাতে ব্যবসা শুরু করেন। তাদের অনেকের পক্ষে দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল বা বড় মূলধন জোগাড় করা সম্ভব হয় না। তাই সব ফুটপাত ব্যবসায়ীকে অপরাধী হিসেবে দেখা ন্যায়সঙ্গত নয়। তাদের অনেকেই জীবন-জীবিকার কঠিন সংগ্রামে বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নিয়েছেন।

কিন্তু জীবিকার প্রয়োজন কখনো অন্যের অধিকার নষ্ট করার বৈধতা দেয় না। ইসলাম একই সঙ্গে ব্যবসায়ীর রিজিক এবং পথচারীর অধিকার—উভয়কেই সংরক্ষণ করতে চায়।

তাই সমস্যার সমাধান শুধু উচ্ছেদ অভিযান হতে পারে না। রাষ্ট্রের উচিত পরিকল্পিত হকার জোন, নির্ধারিত অস্থায়ী বাজার, স্বল্প ব্যয়ে ব্যবসার সুযোগ এবং পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও উচিত এমনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা, যাতে মানুষের চলাচল ব্যাহত না হয় এবং রাষ্ট্রের বৈধ নির্দেশনা ও অনুমতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়।

সবশেষে বলা যায়, ইসলাম ব্যবসার ধর্ম যেমন, তেমনি ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং জনকল্যাণেরও ধর্ম। তাই "ফুটপাতে ব্যবসা হালাল না হারাম"—এর উত্তর একরৈখিক নয়। ফুটপাতে ব্যবসা নিজেই হারাম নয়। কিন্তু যদি সেই ব্যবসা মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, রাস্তা দখল করে, জনদুর্ভোগ বাড়ায় কিংবা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তাহলে সেই পদ্ধতি শরিয়তের দৃষ্টিতে গুনাহের কাজ। পক্ষান্তরে, যদি রাষ্ট্রের অনুমোদিত স্থানে, জনস্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এবং অন্যের কোনো ক্ষতি না করে ব্যবসা পরিচালিত হয়, তবে তা বৈধ ব্যবসার অন্তর্ভুক্ত হবে, ইনশাআল্লাহ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—রাস্তা সবার। তাই একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর লক্ষ্য হওয়া উচিত এমনভাবে জীবিকা অর্জন করা, যাতে তার উপার্জন যেমন হালাল হয়, তেমনি মানুষের অধিকারও অক্ষুণ্ন থাকে। এ ভারসাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য, ন্যায়বিচার এবং মানবকল্যাণের প্রকৃত শিক্ষা। 

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; ফাউন্ডার, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন