মিরপুর টেস্ট
শান্ত-মুমিনুলদের ব্যাটে প্রথম দিনটা বাংলাদেশের
মশিউর রহমান
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ২১:১৬
সবুজ উইকেট, পেসারদের দাপট আর বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ—পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্ট শুরুর আগে মিরপুরের আকাশজুড়ে ছিল শঙ্কার মেঘ। বিশেষ করে টস হেরে আগে ব্যাটিং করতে নেমে মাত্র ৩১ রানে ২ উইকেট হারানোর পর সেই শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়। তবে সব প্রতিকূলতা উড়িয়ে দিয়ে মিরপুরের প্রথম দিনটি নিজের করে নিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
অধিনায়কের রেকর্ডগড়া সেঞ্চুরি, মুমিনুল
হকের ‘নার্ভাস নাইনটিজ’-এর
আক্ষেপ আর অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমের দৃঢ়তায় প্রথম দিনশেষে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে স্বাগতিক
বাংলাদেশ। দিনশেষে ৮৫ ওভার খেলা হওয়ার পর বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ৩০১ রান। আলোকস্বল্পতার
কারণে দিনের ৫ ওভার বাকি থাকতেই আম্পায়াররা খেলা শেষ ঘোষণা করেন। মুশফিকুর রহিম ৪৮
রান ও লিটন কুমার দাস ৮ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু করবেন।
শুক্রবার সকালে মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয়
ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস ভাগ্য সহায় হয়নি বাংলাদেশের। মেঘলা আকাশ আর উইকেটের ঘাস দেখে
পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদ কোনো দ্বিধা ছাড়াই বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠান। পাকিস্তান
এই ম্যাচে বড় ধাক্কা খায় তাদের সেরা ব্যাটার বাবর আজমের অনুপস্থিতিতে; হাঁটুর চোটের
কারণে তিনি ছিটকে যাওয়ায় আজান আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফজলের অভিষেক হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ৩ জন বিশেষজ্ঞ পেসার—তাসকিন
আহমেদ, এবাদত হোসেন ও নাহিদ রানাকে নিয়ে একাদশ সাজিয়ে আক্রমণাত্মক মেজাজে নামে। তবে
ইনিংসের শুরুতেই হোঁচট খায় টাইগাররা। শাহিন শাহ আফ্রিদির করা ইনিংসের সপ্তম ওভারেই
সাজঘরে ফেরেন ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়। ব্যক্তিগত ৪ রানে জীবন পেয়েও তিনি তা কাজে
লাগাতে পারেননি, ৮ রানে মোহাম্মদ রিজওয়ানের গ্লাভসে ধরা পড়েন তিনি।
এই উইকেটের মাধ্যমেই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে
প্রথম পাকিস্তানি বোলার হিসেবে ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন আফ্রিদি। জয়ের বিদায়ের
কিছুক্ষণ পর অভিজ্ঞ পেসার হাসান আলীর শিকার হন আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম (১৩)। দলীয়
মাত্র ৩১ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন চরম বিপর্যয়ে।
শুরুর এই ধাক্কা সামাল দিতে ঢাল হয়ে দাঁড়ান
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এবং দেশের অন্যতম সেরা টেস্ট ব্যাটার মুমিনুল হক। পাকিস্তানি
পেসারদের আক্রমণ রুখে দিয়ে তারা উইকেটে থিতু হতে থাকেন। মধ্যাহ্নভোজের বিরতি থেকে ফিরে
শান্ত খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসেন। মাত্র ৭১ বলে ফিফটি পূর্ণ করার পর তিনি আরও আক্রমণাত্মক
হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে, মুমিনুল হক খেলছিলেন চিরায়ত টেস্ট মেজাজে।
এই দুই বাঁহাতির ব্যাটিং দৃঢ়তায় তৃতীয়
উইকেটে ১৭০ রানের এক বিশাল জুটি গড়ে ওঠে। শান্ত সুযোগ পেলেই হাত খুলে খেলছিলেন, যা
পাকিস্তানের বোলারদের ক্লান্ত করে দেয়। ১২ চার ও ২ ছক্কায় সাজানো তার ১৩০ বলের ইনিংসটি
বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের ভিত্তি গড়ে দেয়।
ব্যক্তিগত ৯৯ রানে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ আব্বাসকে
কভার দিয়ে চার মেরে ক্যারিয়ারের নবম টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন শান্ত। এই সেঞ্চুরির
মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অধিনায়ক হিসেবে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন।
এটি অধিনায়ক হিসেবে শান্তর ৫ম টেস্ট সেঞ্চুরি, যা তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে মুশফিকুর রহিমের
(৪টি) রেকর্ডকে।
মাত্র ১৭ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে ৫টি সেঞ্চুরি
করে শান্ত এখন বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়ক সেঞ্চুরিয়ান। উল্লেখ্য, শেষ ৮টি টেস্ট ইনিংসের
৪টিতেই তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করেছেন এই লড়াকু ব্যাটার। তবে সেঞ্চুরির উদযাপনের
রেশ কাটতে না কাটতেই এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন শান্ত। আব্বাসের বলে আম্পায়ার প্রথমে আউট
না দিলেও পাকিস্তান রিভিউ নিলে সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। ১০১ রানে থামে শান্তর রেকর্ডগড়া
ইনিংস।
শান্তর বিদায়ের পর অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমকে
নিয়ে ইনিংস মেরামতের কাজ চালিয়ে যান মুমিনুল হক। কানপুরে ভারতের বিপক্ষে শেষ সেঞ্চুরির
পর ২০ মাস পর আবারও সেঞ্চুরির খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ব্যক্তিগত ৯১
রানে স্পিনার নোমান আলীর একটি নিচু হয়ে যাওয়া ডেলিভারি তার প্যাডে লাগলে আম্পায়ার আউটের
সংকেত দেন। রিভিউ নিয়েও লাভ হয়নি। ১৯৯ বলে ১০ বাউন্ডারিতে সাজানো মুমিনুলের এই ইনিংসটি
ছিল ধৈর্যের এক অনুপম উদাহরণ। ৯ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করার আক্ষেপ নিয়ে যখন তিনি
মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন গ্যালারিজুড়ে ছিল নিস্তব্ধতা।
মুমিনুলের বিদায়ের পর দলের হাল ধরেন অভিজ্ঞ
মুশফিকুর রহিম এবং লিটন কুমার দাস। মুশফিক বরাবরের মতোই দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেছেন।
১০৪ বলে ৬টি চারের সাহায্যে ৪৮ রান করে তিনি অপরাজিত আছেন। দিনের শেষভাগে মোহাম্মদ
আব্বাসকে থার্ড ম্যান দিয়ে বাউন্ডারি মেরে দলীয় স্কোর তিনশ পার করেন তিনি। লিটন দাস
৩৫ বলে ৮ রান করে তাকে যোগ্য সঙ্গ দিচ্ছেন।
পাকিস্তানের বোলারদের মধ্যে শাহিন শাহ
আফ্রিদি, হাসান আলী, মোহাম্মদ আব্বাস এবং নোমান আলী প্রত্যেকেই একটি করে উইকেট শিকার
করেছেন। পেসারদের জন্য উইকেটে সুবিধা থাকলেও শান্ত-মুমিনুলের জুটির সামনে তারা অনেকটা
অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। তবে শান্ত ও মুমিনুলের উইকেট তুলে নিয়ে দিনশেষে লড়াইয়ে ফেরার কিছুটা
ইঙ্গিত দিয়েছে সফরকারীরা।
প্রথম দিনশেষে ৩১১ রান করার মাধ্যমে বাংলাদেশ
৪০০ প্লাস রানের লক্ষ্যে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। আজ সকালে মুশফিক তার ফিফটি পূর্ণ করার
পাশাপাশি লিটন দাসকে নিয়ে বড় জুটির দিকে তাকিয়ে থাকবেন। মিরপুরের উইকেটে দ্বিতীয় দিন
থেকে স্পিনাররা সুবিধা পেতে শুরু করলে এই ৩০১ রানই পাকিস্তানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে
দাঁড়াতে পারে।
অধিনায়ক শান্তর দেওয়া লক্ষ্য ছিল প্রথম
ইনিংসে অন্তত ৪০০ রান করা। হাতে ৬ উইকেট থাকায় সেই মাইলফলক স্পর্শ করা এখন সময়ের ব্যাপার
মাত্র। ভক্তদের চোখ এখন মুশফিক-লিটন জুটির ওপর, যারা কি না কাল সকালে বড় কোনো ইনিংস
খেলে পাকিস্তানকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর (প্রথম দিন শেষে):
বাংলাদেশ: ৩০১/৪ (৮৫ ওভার); শান্ত ১০১,
মুমিনুল ৯১, মুশফিক ৪৮*, লিটন ৮*, সাদমান ১৩, জয় ৮।
পাকিস্তান বোলিং: আব্বাস ১/২২, হাসান আলী
১/৫৪, শাহিন আফ্রিদি ১/৬৭, নোমান আলী ১/৮০।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

