নেইমার জুনিয়র
তিনি ব্রাজিল ফুটবলের সেই ‘পোস্টার বয়’, যাকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ সবসময়ই আকাশচুম্বী। অনেকেই ভেবেছিলেন কারেকা, রোমারিও কিংবা দ্য ফেনোমেনন রোনালদো নাজারিও হয়তো ছুঁতে পারবেন ব্রাজিলের জার্সিতে কিংবদন্তি পেলের মহিমান্বিত ৭৭ গোলের রেকর্ড। কিন্তু ফুটবল বিধাতা এই মহাকাব্যিক কীর্তি গড়ার দায়িত্ব লিখে রেখেছিলেন এমন একজনের পায়ে, যাকে অনেকে গোলদাতার চেয়ে গোল করানোর কারিগর হিসেবেই বেশি দেখতেন। তিনি—নেইমার জুনিয়র।
২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের প্রথম ম্যাচেই
বলিভিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে পেলের রেকর্ড ভেঙে নিজের গোলসংখ্যাকে ৭৯-এ নিয়ে যান
এই সেলেসাও তারকা। তবে এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষে চতুর্থ বাছাই ম্যাচে এসিএল ইনজুরিতে পড়ে
দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিটকে যান তিনি। প্রিয় ক্যানারি-হলুদ জার্সিটি তার আর গায়ে জড়ানো
হয়নি।
তবে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক
নিয়ে হাজির হয়েছেন ব্রাজিলের বর্তমান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এর আগে কখনো নেইমারকে স্কোয়াডে
না ডাকলেও, সোমবার বিশ্বকে চমকে দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে সান্তোসের এই ৩৪
বছর বয়সী সুপারস্টারকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি।
১৯৬২ সালে আদেমির ডি মেনেজেসকে (৩২ গোল)
টপকে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন ফুটবল সম্রাট পেলে। দীর্ঘ ৬০ বছর
ধরে কেউ তার সেই রেকর্ড স্পর্শ করতে পারেনি। অবশেষে ২০২৩ সালে পেলের সেই রাজত্ব ভেঙে
এককভাবে শীর্ষে বসেন নেইমার। মাত্র ১০ বছর বয়সেই নেইমারের জাদুকরি প্রতিভার কথা ছড়িয়ে
পড়েছিল।
ব্রাজিলের দুবারের বিশ্বকাপজয়ী তারকা জিতো
নেইমারের ফুটসাল খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে সান্তোস প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন তাকে এখনই দলে
ভেড়াতে। কিন্তু সান্তোসের তখন ওই বয়সী বাচ্চাদের কোনো দল ছিল না। জিতোর অনুরোধে সান্তোস
কর্তৃপক্ষ বিশেষ দল গঠন করে নেইমারকে চুক্তিবদ্ধ করে।
১৩ বছর বয়সে নেইমার রিয়াল মাদ্রিদে ২০
দিনের ট্রায়াল দিয়েছিলেন। ডেভিড বেকহ্যাম, জিনেদিন জিদান, রোনালদোদের সান্নিধ্য পেলেও
তিনি সান্তোস ছাড়েননি। ২০০৯ সালে ১৭ বছর বয়সে সান্তোসের মূল দলে তার অভিষেক হয়।
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আগে কিংবদন্তি
পেলেসহ পুরো ব্রাজিলবাসী তৎকালীন কোচ দুঙ্গাকে অনুরোধ করেছিলেন ১৮ বছর বয়সী নেইমারকে
দলে নিতে। কিন্তু একগুঁয়ে দুঙ্গা নেইমারকে নেননি এবং সৃজনশীলতার অভাবে কোয়ার্টার ফাইনালে
নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় সেলেসাওরা।
২০১০ বিশ্বকাপের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে
প্রীতি ম্যাচে নেইমারের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় এবং মাত্র ২৮ মিনিটে হেড থেকে নিজের
প্রথম গোল করেন তিনি। নেইমার যখন ব্রাজিলের হয়ে প্রথম গোল করেন, তখন পৃথিবীতে ‘ইনস্টাগ্রাম’-এর কোনো অস্তিত্ব
ছিল না! অথচ আজ সেই ইনস্টাগ্রামে নেইমারের অনুসারী ২৩ কোটিরও বেশি। সে সময় কেবল ‘অ্যাভাটার’ সিনেমাটি বিশ্বের
সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড গড়েছিল এবং অ্যাপল তাদের প্রথম আইপ্যাড বাজারে এনেছিল। এয়ারফ্রায়ার
কিংবা উবারের মতো প্রযুক্তির জন্মও তখন হয়নি।
নেইমারের কিছু জানা-অজানা তথ্য: জাপানের
বিপক্ষে মাত্র ৫ ম্যাচে ৯টি গোল করেছেন নেইমার। এছাড়া পেরুর বিপক্ষে ৬টি, বলিভিয়ার
বিপক্ষে ৫টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৫টি গোল রয়েছে তার। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও
রোমারিওর পর বিশ্বের অন্যতম খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ভিন্ন ক্লাবের (সান্তোস, বার্সেলোনা
এবং পিএসজি) হয়ে ১০০-এর বেশি গোল করার নজির রয়েছে নেইমারের।
২০১৭ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের
বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় একমাত্র ফুটবলার ছিলেন নেইমার। তার প্রোফাইলটি
লিখেছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম। ২০১৩ ফিফা কনফেডারেশন কাপে ৫ ম্যাচে ৪ গোল করে গোল্ডেন বল
জেতেন এবং ফাইনালে স্পেনকে ৩-০ গোলে হারাতে ভূমিকা রাখেন।
এছাড়া ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলের ফুটবল
ইতিহাসে একমাত্র অধরা অনূর্ধ্ব-২৩ অলিম্পিক স্বর্ণপদকটি দেশের মাটিতে নেইমারই এনে দিয়েছিলেন।
ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে জয়সূচক পেনাল্টি শুটআউটটি তিনিই নিয়েছিলেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে নেইমার সৌদি আরব
ছেড়ে পুনরায় তার শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে আসেন মূলত ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার ফিটনেস
ধরে রাখতে। দলে ডাক পাওয়ার পর নেইমার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “এটিই হবে আমার
শেষ মিশন। যেকোনো মূল্যেই হোক, এই বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি আমি নিজের করে পেতে চাই।”
এখন দেখার বিষয়, আনচেলত্তির তুরুপের তাস
হয়ে নেইমার ব্রাজিলকে তাদের হেক্সা (৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ) এনে দিতে পারেন কিনা।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

