ফাইনালে গুরু-শিষ্যের লড়াই
মুখোমুখি দে লা ফুয়েন্তে ও স্কালোনি
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ২০:৫৩
ফিফা বিশ্বকাপের মেগা ফাইনাল ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিতে যাচ্ছে এক অবিশ্বাস্য চিত্রনাট্য। একদিকে ইউরোপ সেরার মুকুট পরা স্পেন, অন্যদিকে বিশ্ব ও দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
আগামী ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের এই মহালড়াই কেবল মাঠের যুদ্ধ নয়; এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক আবেগঘন ‘গুরু-শিষ্যের’ দ্বৈরথ। যেখানে ট্রফি জয়ের চূড়ান্ত রণকৌশল সাজাবেন স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি—যাদের সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিল শিক্ষক ও ছাত্র হিসেবে!
৯ বছর আগে, ২০১৭ সালে এই সম্পর্কের সুতো বাঁধা হয়েছিল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের লাস রোজাস কোচিং একাডেমিতে। ২০১৫ সালে খেলোয়াড়ি জীবনকে বিদায় জানানোর মাত্র দুই বছর পর স্কালোনি যখন কোচিংয়ের প্রথম পাঠ নিচ্ছিলেন, তখন তার শিক্ষক বা টিউটরদের অন্যতম প্রধান ছিলেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
তৎকালীন স্পেনের
বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্ব সামলানো দে লা ফুয়েন্তে হয়তো কল্পনাও করেননি, তার ক্লাসরুমে
বসে খাতা-কলমে ফুটবলের কৌশল শেখা এক তরুণ একদিন ডাগআউটে তারই মুখোমুখি দাঁড়াবে ফুটবল
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্রফির লড়াইয়ে।
শিক্ষক দে লা ফুয়েন্তের প্রতি স্কালোনির
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বহু পুরনো। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা ও ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালীন
স্কালোনি তার শিক্ষকের প্রশংসা করে বলেছিলেন, লাস রোজাসে কোচিং কোর্স করার সময় লুইস
আমাদের অবিশ্বাস্য সাহায্য করেছিলেন। আমি তার কাজ ও দল পরিচালনা করার ধরন ভীষণ পছন্দ
করি। খেলোয়াড়রা তার জন্য মাঠে নিজেদের উজাড় করে দেয়। পাল্টা প্রশংসা করতে ভোলেননি
গুরু দে লা ফুয়েন্তেও। সাবেক ছাত্রকে তিনি এখন একজন ‘মাস্টার’ বা শিক্ষক হিসেবেই সম্বোধন করেন,
যিনি আর্জেন্টিনাকে কাতার বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার এই বিশ্বকাপজয়ী কোচের ব্যক্তিগত
জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্পেন। স্কালোনির স্প্যানিশ কানেকশন কেবল কোচিং লাইসেন্স
পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁর পরিবার ও হৃদয়ের একটি অংশ স্পেনে বাঁধা। ২০০৮
সালে স্কালোনির সাথে আলাপ হয় স্প্যানিশ কন্যা এলিসা মন্তেরোর, যিনি এখন তার সহধর্মিণী।
তাদের সন্তানদের জন্ম স্পেনে এবং বর্তমানে স্কালোনি সপরিবারে স্পেনের মায়োর্কাতে স্থায়ীভাবে
বসবাস করেন। ফুটবলার হিসেবেও স্কালোনি স্পেনের ক্লাব দেপোর্তিভো লা করুনা, রেসিং সান্তান্দার
ও মায়োর্কাতে দীর্ঘদিন দাপটের সাথে খেলেছেন। এ কারণেই ২০২৪ ইউরো চলাকালীন স্কালোনি
অকপটে বলেছিলেন, আমার পরিবারের একটি অংশ স্প্যানিশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি স্পেনকে
সমর্থন করি।
ফাইনালে ওঠার পথটা দুই দলের জন্যই ছিল
রোমাঞ্চকর। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে ফাইনাল নিশ্চিত
করে স্পেন। পরদিন আটলান্টায় ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্যভাবে
ঘুরে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারায় আর্জেন্টিনা। ৮৫ মিনিটে বক্সের বাইরে
থেকে এনজো ফার্নান্দেসের চোখধাঁধানো গোল এবং অতিরিক্ত সময়ে লাউতারো মার্টিনেসের জয়সূচক
গোলটিতে সরাসরি অবদান রাখেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
ইংল্যান্ডকে হারানোর পর স্কালোনি হাসিমুখে
তাঁর শিক্ষকের সাথে ফাইনালের লড়াই নিয়ে বলেন, লুইস শুধু আমার কোচিং কোর্সের শিক্ষকই
ছিলেন না, তাঁর সাথে আমার বিশেষ একটি সম্পর্ক রয়েছে। সেমিফাইনালের আগে ভেবেছিলাম ফাইনালে
উঠতে না পারলে ওকে ফোন করব। কিন্তু এখন যখন ফাইনালে আমরাই মুখোমুখি হচ্ছি... না! ফাইনাল
শেষ হওয়ার আগে আর কোনো ফোন কল বা কথা হচ্ছে না। তবে রসিকতা করে স্কালোনি আরও যোগ করেন,
রোববারের ম্যাচের পর তাঁর (দে লা ফুয়েন্তে) জন্য আমার একটু খারাপই লাগবে! দীর্ঘদিন
স্পেনের মাটিতে বার্সেলোনার হয়ে খেলা লিওনেল মেসিকে নিয়েও কথা বলেছেন স্কালোনি। স্পেনের
বর্তমান স্কোয়াডে বার্সার ৮ জন ফুটবলার রয়েছেন।
স্কালোনি মনে করেন, স্প্যানিশ ফুটবলপ্রেমীরাও
মেসিকে গভীরভাবে ভালোবাসে। তিনি বলেন, মেসি এই দেশটিকে (স্পেন) অনেক আনন্দ এনে দিয়েছে।
সে কী জিনিস, এটা তাদের বুঝতে হবে। আশা করি রোববার স্পেনও তাঁর খেলা উপভোগ করবে।
মেগা ফাইনালে বন্ধুত্বকে পাশে সরিয়ে রেখে
ফুটবল অমরত্বের লড়াইয়ে নামবেন শিক্ষক ও তাঁর সাবেক ছাত্র। এই ম্যাচ জিতলে ১৯৬২ সালের
ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়বে স্কালোনির
আর্জেন্টিনা।
অন্যদিকে, ২০১০ সালের পর নিজেদের দ্বিতীয়
বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে মরিয়া দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। এখন দেখার বিষয়, লাস রোজাসের
ক্লাসরুমের শিক্ষা এবার বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে কার পক্ষে রায় দেয়—ছাত্র স্কালোনি
কি শিক্ষককে টেক্কা দেবেন, নাকি অভিজ্ঞ গুরুর নোটবুকই শেষ হাসি হাসবে!
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

