চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন লিওনেল মেসি। তবে এই কান্না পরাজয়ের আশঙ্কার নয়, এটি ছিল এক পরম স্বস্তির।
টুর্নামেন্টের শুরুতে বাবার অসুস্থতার
খবর শুনে একবার কেঁদেছিলেন; আর দ্বিতীয়বার কাঁদলেন ইজিপ্টের বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিস
করার পর সতীর্থদের কল্যাণে দল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠায়। ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকরের
কাঁধে এখন আবেগ, চাপ, পরিবার আর কোটি ভক্তের প্রত্যাশার পাহাড়। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও
মেসি এখন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুখী সময় পার করছেন।
কারণ, কোচ লিওনেল স্কালোনি তার জন্য এমন
এক দল গড়েছেন, যা পুরোপুরি মেসির মাপে তৈরি—যেখানে প্রত্যেকে লড়ছেন সবার জন্য, আর সবাই
লড়ছেন কেবল একজনের জন্য!
কোচ স্কালোনি সুইজারল্যান্ড ম্যাচের আগে
বলেছিলেন, আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হলো দলের সবার একসাথে উদযাপন করা। আমি ৪-৩-৩
ফর্মেশনের ভক্ত বলে কোচিং করাই না; আমি আমার খেলোয়াড় ও বন্ধুদের সাথে ‘মাতে’ (দক্ষিণ আমেরিকান ঐতিহ্যবাহী চা)
খেতে, বার্বিকিউ পার্টি করতে আর তাস খেলতে ভালোবাসি। কোচের এই দর্শনের কারণেই মেসি
তার ক্যারিয়ারকে এতদূর টেনে আনতে পেরেছেন। শৈশবের শহর রোজারিও ছেড়ে আসা সেই কিশোরের
মতোই মেসি এখন ড্রেসিংরুমে নিজের চেনা পরিবেশ ফিরে পেয়েছেন।
বার্সেলোনায় একসময় পিন্টো কিংবা লুইস সুয়ারেজ
যেভাবে মেসির সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন, আর্জেন্টিনা দলে সেই জায়গাটি নিয়েছেন রদ্রিগো
ডি পল। এই মিডফিল্ডারের সাথে মেসির বন্ধুত্বের শুরুটা হয়েছিল এক বিকেলে, যখন তিনি দেখেন
অনুশীলন শেষে মেসি একা ও বিষণ্ণ মুখে বসে আছেন। ডি পল তখন গিয়ে নক করেন মেসির দরজায়—
এক কাপ মাতে চা আর এক হাত তাস খেলা যাক?
সেই থেকে শুরু। এখন আর্জেন্টিনা দলে প্রতিদিন
সকালে ডি পলের রুমে মাতে চা খাওয়ার একটি কঠোর নিয়ম বা ‘রুটিন’ তৈরি হয়েছে, যেখানে সবার আগে প্রবেশাধিকার
কেবল লিও মেসির। ডি পল মাঠে ও মাঠের বাইরে মেসিকে কোনো মহীরুহ বা দেবতা নয়, বরং একজন
সাধারণ মানুষ হিসেবে ‘এল পেকেনো’ (ছোট্টটি) বলে ক্ষ্যাপান। মাঠে নামার সময় মেসি থাকেন সবার
আগে, আর ডি পল থাকেন তার ঠিক পাশে—বাকি দলটা পেছনে এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে যেন কোনো এক
গ্যাং বা বাহিনী তাদের লিডারকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! দলের তরুণদের কাছে মেসি কেবল
একজন সতীর্থ নন, তিনি তাদের শৈশবের আদর্শ। আর তাই দলের সবাই খেলেন মেসির বিশেষ এডিশনের
বুট পরে এবং জুনে মেসির জন্মদিনে সবাই তার সাথে কাটানো পুরোনো ছবির টি-শার্ট পরে কেক
কাটেন।
মেসির বয়স ৩৯ হলেও মাঠের পারফরম্যান্সে
তার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। এর পেছনে রয়েছে ডি পলের সাথে মাসের পর মাস ডাবল শিফটে কঠোর
অনুশীলন এবং পুষ্টিবিদদের দেওয়া বিশেষ ডায়েট। দলের পুষ্টিবিদদের মতে, কাতার বিশ্বকাপের
চেয়েও বর্তমান মেসির টপ স্পিড বা সর্বোচ্চ গতি প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে! যদিও ম্যাচের
৪৭ শতাংশ সময় মেসি কেবল হেঁটে পার করেন, কিন্তু যখনই বল তার পায়ে আসে, তখনই তিনি অপ্রতিরোধ্য।
কাতার বিশ্বকাপের পর এই বিশ্বকাপেও ১০টির বেশি গোলে সরাসরি অবদান (গোল ও অ্যাসিস্ট)
রেখে কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে ইতিহাস গড়েছেন মেসি।
মাঠে মেসিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন
স্কালোনি। ইজিপ্টের বিরুদ্ধে ম্যাচ চলাকালীন মেসি নিজেই আক্রমণভাগের ডান প্রান্তে চলে
যান, আবার সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩৮ মিনিটের মাথায় চলে আসেন মাঠের মাঝে। স্কালোনি
বলেন, আমি তাকে পজিশন বদলাতে বলি না, কিন্তু সে যখন নিজের বুদ্ধিমত্তায় জায়গা বদলায়,
দলের বাকিদের তখন সেই অনুযায়ী সাড়া দিতে হয়। মেসি যখন সেন্ট্রাল পজিশনে চলে আসেন, ডি
পল তখন মেসির ছেড়ে দেওয়া খালি জায়গা ডমিনেন্ট করেন।
আর্জেন্টাইনদের কাছে ফুটবল কেবল একটি খেলা
নয়, এটি এক ধরনের ধর্ম। ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির হাত ধরে দেশটির ফুটবল গৌরব
এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা একটি জাতিকে বিশ্বের দরবারে
বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। আর তাই প্রতিটি ম্যাচ জয়ের পর ড্রেসিংরুমে ডি পলের
নেতৃত্বে পুরো দল গেয়ে ওঠে এই বিশ্বকাপের নতুন থিম সং— লা কুয়ার্তা এস্ত্রেয়া (চতুর্থ
তারকা)।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার কাছ
থেকে ‘ছিনিয়ে নেওয়া’
ট্রফির প্রতিশোধ নিতে এবং মেসির শেষ আসরে জার্সিতে চতুর্থ স্টার বসানোর পণ নিয়ে তৈরি
এই গান। ফুটবল ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো জীবন্ত কিংবদন্তিকে দলের বর্তমান সতীর্থরা
এভাবে গান গেয়ে সম্মান জানায়নি। মিডফিল্ডার লিয়েন্দ্রো প্যারেডেস বলেন, আমরা যখনই লিওর
চোখে জল দেখি, আমরা তাকে জড়িয়ে ধরি। আমরা তাকে মনে করিয়ে দিই যে আমরা তার পাশে আছি
এবং তার শেষ ম্যাচটি যাতে সহজে না আসে, সেজন্য আমরা মাঠে নিজেদের জীবন বাজি রাখতেও
প্রস্তুত!
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

