• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮

রাজনীতি

গতিশীল হচ্ছে বিএনপি!

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

পনেরো বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ২০২৩ সালের নির্বাচন সামনে রেখে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে দ্বাদশ নির্বাচন নিয়ে দলের কর্মকৌশল নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের নেতাদের মতামত নেওয়া প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারবিরোধী জোরালো আন্দোলনের প্ল্যাটফরম তৈরির পরিকল্পনাও করছে দলটি। আর সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও জামায়াতকে সঙ্গে রাখার পক্ষে হাইকমান্ড। ফলে জামায়াতকে নিয়েই আগামীতে সরকারবিরোধী জোরালো আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।

এদিকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মকৌশল ঠিক করার লক্ষ্যে নেতাদের মতামত জানতে গত মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার ধারাবাহিক বৈঠক করেছে বিএনপি। এই তিন দিনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিল, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদকমণ্ডলী এবং শেষ দিন দলের অঙ্গ-সংগঠনের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। আজ শনিবারে দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠক রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির লাগাতার বৈঠকের কারণে সার্বিকভাবে বিএনপির কার্যক্রমে কিছুটা গতিশীলতা ফিরেছে। স্থায়ী কমিটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, আগামী দিনে বিএনপি কীভাবে চলবে এবং কর্মকৌশল কী হবে তার রোডম্যাপ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করছে দলটির স্থায়ী কমিটি। বিশেষ করে সরকারকে পুরো পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণ করতে দেওয়া হবে কি না এবং আন্দোলন কখন থেকে শুরু হবে, দলটির নেতারা এ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। পাশাপাশি রোডম্যাপ বাস্তবায়নে ২০১৭ সালের ১০ মে খালেদা জিয়ার উপস্থাপিত বিএনপির ‘ভিশন ২০৩০’ রূপকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে। গণতন্ত্র, জাতি গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ দল ও সরকার পরিচালনায় ওই রূপকল্পে মোট ২৫৬ দফা প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেছিলেন খালেদা জিয়া।  

গত তিন দিনের বিএনপি’র শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের বৈঠকে প্রধান সিদ্ধান্ত হয়, আগামীতে আন্দোলন ও নির্বাচন প্রশ্নে সমমনাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে দলটি। বিএনপির নির্বাহী কমিটি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শেষে আজ শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হবে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে পরামর্শসভা করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিকাল ৪টায় এ বৈঠক শুরু হয়। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সভায় সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান। বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন। অঙ্গসংগঠনের মধ্যে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, তাঁতী দল, ওলামা দল, মৎস্যজীবী দলের সভাপতি ও সম্পাদকসহ ৯২ জন অংশ নেন। সেখানে নেতারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্দোলন, নির্বাচন, দল পুনর্গঠন, চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, জোটের রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে নিজেদের মতো তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য শুনে তারেক রহমান নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মঙ্গলবার দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে বুধবার সম্পাদকমণ্ডলীর সঙ্গে এবং বৃহস্পতিবার দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সভা করেছি। এর পরে আমরা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও রাজনৈতিক বিষয়ে ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করব। দলের নির্বাহী কমিটির যারা সদস্য আছেন তাদের সঙ্গেও বৈঠক হতে পারে। তবে এটা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর আগে গত মঙ্গলবার দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে এবং বুধবার দলটির সম্পাদকমণ্ডলীর সঙ্গে বৈঠক হয়।

এ ছাড়া সভায় নেতারা মূলত তিনটি বিষয়কে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রথমত, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়া। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলনে যাওয়া এবং দলের অঙ্গসংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা।

বিএনপির দুই ভাইস চেয়ারম্যান জানান, বৈঠকে প্রায় সবাই এক বিষয়ে একমত হয়েছেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে আগামী সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনেই হতে হবে। সেজন্য যা করা দরকার সেটাই করতে হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা তুলে ধরে ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে কয়েকজন ও উপদেষ্টা পরিষদের ৩ জন নেতা বক্তব্য রাখেন। তারা সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণায় আগাম নির্বাচনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সকল বিরোধী দলকে অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে আগাম নির্বাচন দেওয়া হতে পারে।

নেতারা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো আবারও একতরফা নির্বাচন করার কৌশল নিচ্ছে। এ অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে একদিকে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে, অন্যদিকে সরকার পতনের আন্দোলনে যেতে হবে। বৈঠকে চেয়ারপারসনের মুক্তি, দল পুনর্গঠন, জোটের রাজনীতি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গেও বৈঠকের সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির। সবার মতামতের পর চূড়ান্ত করা হবে আন্দোলনের কৌশল। বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের বেশিরভাগই আন্দোলনে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অনেক নেতা বিএনপির অতীত কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নতুনভাবে পথচলার পরামর্শ দিয়েছেন। 

এ সময় নতুন নির্বাচন কমিশনের বিষয়েও কথা বলেন বেশ কয়েকজন নেতা। তারা বলেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে গতানুগতিক প্রস্তাব দেওয়া থেকে বিরত থাকার চিন্তা করতে হবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন থাকলে যে কাউকে দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করলে সে কমিশন নিরপেক্ষ হবে না, তাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবি আদায় করতে পারলে তাদের প্রত্যাশিত নির্বাচন কমিশন গঠন সম্ভব।

বৈঠকে বিএনপির বেশিরভাগ নেতা আন্দোলনে যাওয়ার যৌক্তিকতার পাশাপাশি দল ও সংগঠনের নানা অসংগতি তুলে ধরেন। বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠন বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, সারাদেশে সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি গঠন প্রক্রিয়াও ধীরগতিতে চলছে। এভাবে দলকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয় বলে নেতারা জানান। অনেক নেতা কমিটি গঠনে অনৈতিক কার্যকলাপের বিষয়েও অভিযোগ করেন। জামায়াত নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতা। তবে এর বিরোধিতাও করেছেন কয়েকজন। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গেও ঐক্য করে। তাতে তাদের দলে কোনো নেতিবাচক শব্দ উচ্চারিত হয় না। বিএনপি কাকে নিয়ে চলবে, তা একমাত্র হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। প্রসঙ্গত ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পরে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এটি তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ঘিরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর বিএনপির পুরোনো মিত্র ২০ দলীয় জোট এবং দলের উল্লেখযোগ্য অংশের বিরোধিতায় মুখ থুবড়ে পড়ে ওই জোট। কিন্তু এবার সেই বিষয়টি খেয়াল রেখে সরকারবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ভিন্ন কৌশলে একটি জাতীয় ঐক্যের প্ল্যাটফরম তৈরিতে কাজ করছে বিএনপি। জাতীয় বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ বিরোধীদের অভিন্ন দাবিগুলো সমন্বয় করে এ প্ল্যাটফরম গঠন করা হবে। ‘জাতীয় ঐক্যের দাবি ও লক্ষ্য’ শিরোনামে প্ল্যাটফরমের কাজ এগিয়ে চলছে। ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অনেকটাই অকার্যকর প্ল্যাটফরমে পরিণত হয়েছে। দলের দায়িত্বশীল নেতারা এ ব্যাপারে খসড়াও প্রস্তুত করেছেন। সম্ভাব্য জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব চূড়ান্ত করা হবে এবং পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করা হবে।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০১৮ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি। সেই বৈঠক করার কয়েকদিন পরই দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে গিয়েছিলেন দুর্নীতির মামলায়। এরপর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন তারেক রহমান। প্রায় সাড়ে তিন বছরে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়নি। এখন লন্ডনে নির্বাসনে থাকা তারেক রহমান মঙ্গলবার থেকে তাদের দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাদের সাথে ধারাবাাহিকভাবে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন। বৈঠকে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যদের নয়, কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা নেতাদের ডাকা হয়। এই বৈঠকের আগে সোমবার দলটির সিনিয়র নেতারা বৈঠক করেছেন।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে তাদের দল কী কৌশল নিতে পারে, তা নিয়েই তারা আলোচনা করছেন। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি-এসব নিয়ে বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মতামত আমরা নিচ্ছি। তারা তাদের দাবি নিয়ে একটা জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করতে চায় বিএনপি। 

তিনি বলেন, বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের সাথে ধারাবাহিক বৈঠকে বিশ দলীয় জোট এবং ঐক্য ফ্রন্ট-দুটি জোটের ব্যাপারেই আলোচনা হয়েছে। সবাইকে নিয়ে ঐক্য কীভাবে করা যায়, কার কার সাথে ঐক্য করা যায়, কারা থাকবে জোটে-এগুলোই আমরা এখন আলোচনা করছি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads