• রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
ফুটবলের স্বপ্ন ফেরাতে হবে

প্রতীকী ছবি

ফুটবল

ফুটবলের স্বপ্ন ফেরাতে হবে

  • তারিক আল বান্না
  • প্রকাশিত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

একটি শিশু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করে। একেবারে ছোটবেলায় সে পেশাগত জীবনকে খুব কঠিন মনে করে। তবে বিষয়ে তার মন পড়ে থাকে পুরোপুরিভাবে। পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন খেলার প্রতি সে আকৃষ্ট থাকে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। বাংলাদেশের শিশুরা ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে খুব পছন্দ করে; কিন্তু ভালো ফুটবল খেলোয়াড় হয়ে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের স্বপ্ন দেখে না। অন্তত বাংলাদেশে সে অবস্থা নেই। বাংলাদেশের ফুটবলে উন্নতি করার জন্য সবার আগে খেলাটিকে নিয়ে শিশুদের স্বপ্ন দেখানোর অভ্যাস করতে হবে।

ফুটবল একটি সর্বজনীন খেলা। বিশ্বে এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে শিশুরা বুঝতে শেখার পর ফুটবলে লাথি দেয়নি। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম হয় না। আজকের ক্রিকেট তারকা মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মোস্তাফিজ, মাহমুদউল্লাহদের কাছে জিজ্ঞেস করলেই এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে। আজকের আর্চারি তারকা রোমান সানা, দিয়া সিদ্দিকীকেও জিজ্ঞেস করলে ফুটবলে তাদের ছোটবেলার আগ্রহের কথা জানা যাবে। ভারতের বিরাট কোহলি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাকগ্রা, ডেভিড ওয়ার্নার অথবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইলের কাছে সরাসরি জানতে চাইলেও ফুটবলের প্রতি তাদের ছোটবেলার ভালোবাসার কথা বলে দেবেন। আসলে ছোটবেলায় যতই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থাকুক না কেন, বড় হয়ে সবাই কিন্তু ফুটবলার হয় না। মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে, মদরিচ, সালাহ, পগবারা হয়েছেন বলে সবাই কিন্তু ফুটবলার হননি। কেউ হয়েছেন জোকোভিচ, কেউ ফেদেরার,  কেউ আবার সেরেনা। কেই উসাইন বোল্ট, কেউ মাইকেল ফেলপস্ হয়েছেন। আবার কেউ খেলাধুলার বাইরে অন্য পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, হয়েছেন রাজনীতিবিদ, বৈজ্ঞানিক, কবি কিংবা চিকিৎসক। তবে সবারই কিন্তু ছোটবেলায় প্রথম পছন্দ ছিল ফুটবল। এই নেশাটা অনেকেই ধরে রাখতে পেরেছেন। বাংলাদেশে ফুটবলের প্রতি এই ভালোবাসাটাকে ধরে রাখার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) অনেক দায়িত্ব রয়েছে খেলাটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু বাফুফে এখন অনেকটাই বোতল সংগঠনে পরিণত হয়েছে। কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো চেষ্টা নেই, কোনো পদক্ষেপ নেই, আগ্রহ নেই তাদের। কর্মকর্তাদের আছে শুধু একই ধান্দা। লবিং, গ্রুপিং, তোষামোদি করে নিজের পজিশন পাকাপোক্ত করা আর আনুষ্ঠানিকতায় গা ভাসিয়ে দেওয়া। যেই আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে ফুটবল উন্নতির কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ফুটবলে কেন এত এগিয়ে, এটা কী কারো নজরে পড়ে না? দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কেন বাংলাদেশের তুলনায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে কী আমাদের কর্মকর্তারা কখনো মাথা ঘামিয়েছেন? ভারতের ফুটবলের মান একসময় বাংলাদেশের মতোই ছিল। কখনো বাংলাদেশ বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ওপরে ছিল, কখনো বাংলাদেশকে টপকে যেত ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলো তো বাংলাদেশের কাছে পাত্তাই পেত না। আর আজ ভারত বিশ্বের ১০৭ নম্বর,  যেখানে বাংলাদেশের অবস্থ এখন ১৮৯ নম্বরে। মালদ্বীপ (১৫৮), নেপাল (১৬৮) ও ভুটানের (১৮৭) মতো দেশও বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। জানা গেছে, ভারত, মালদ্বীপ ও নেপালে ফুটবলের প্রতি গভীর নজর দেওয়া হয়। আজ বাংলাদেশের খেলাপ্রিয় শিশু যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তখন সে সাকিব কিংবা মাশরাফি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আর একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের শিশুরা সালাউদ্দিন, টুটুল, চুন্নু, আসলাম, সালাম মোর্শেদী, মহসিন, হাফিজউদ্দিন, ওয়াসিম, শান্টু, গফফার, নান্নু, মঞ্জু, আশীষ ভদ্র, হওয়ার স্বপ্ন দেখতো। অথচ, এখনকার শিশুরা বাংলাদেশের ফুটবল তারকাদের নামই বলতে পারবে না। যদিও তারা মেসি, রোনালদো, নেইমার, জেসুস, এমবাপ্পে, সালাহ, পগবা, বেনজেমা, লুকাকু, মদরিচ, হ্যারি কেন, গ্রিজমান, কোতিনহোর নাম সহজেই বলে দিতে পারবে।

কিছুদিন আগে, ঠিকানা বাসে সিটি কলেজের এক ছাত্রের কাছে বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়কের নাম জানতে চাইলে সে অনেক সময় নিয়েও বলতে পারছিল না। তখন তাকে বলা হলো, অধিনায়কের নামের দ্বিতীয় শব্দটা ভূঁইয়া। এতটুকু বলার পর, সে জামাল ভূঁইয়ার নাম বলতে সক্ষম হয়। বিষয়টি পরিষ্কার, আমাদের নিজেদের ফুটবল স্বপ্ন নষ্ট হয়ে গেছে। এটাকে জাগাতে হবে। স্বপ্ন তৈরি হলে ফুটবলের মান বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাফুফেকে কিছু কাজ করতে হবে। সারা দেশে কার্যকরভাবে প্রতিভা খুঁজে বের করতে কিশোর ফুটবল শিবিরের আয়োজন করতে হবে। ‘কার্যকর’ শব্দটা এ জন্যই বলা, আমাদের অনেক প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির আয়োজনে শুধুই লোকদেখানো বিষয়ই পরিলক্ষিত হয়, সঙ্গে টাকার অপচয়। এটা তো গেল একটি পদক্ষেপ। আরেকটি পদক্ষেপ হলো, প্রতিভা অন্বেষণ শেষে বাছাইকৃত খেলোয়াড় নিয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। কোনোমতে প্রশিক্ষণ শেষ করে একটা গ্রুপ ছবি ফেসবুকে ছেড়ে দিয়ে লাইকের সংখ্যা গুনলেই ফুটবলের মান বা জনপ্রিয়তা বাড়বে না। প্রশিক্ষণের জন্য ভালো কোচের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। আমাদের দেশে কিশোর ফুটবলারদের জন্য যে সব কোচকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তারা তো নিজেরাই কিছু জানেন না। শেখাবেন কী? আরো একটি বড় বিষয় হলো, টিভিতে লাইভ ফুটবলের ব্যবস্থা করা, যেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ থাকবে। টি-স্পোর্টস টিভি চ্যানেল বাংলাদেশ ফুটবল লিগের ম্যাচগুলো সরাসরি দেখাচ্ছে, এটা ভালো পদক্ষেপ। তবে সেইসঙ্গে, কিরগিস্তানে তিনজাতির ফুটবল আসরের ম্যাচগুলো সরাসরি দেখানোর ব্যবস্থা করতেই পারতো বাফুফে। তাহলে, দেশের ক্রীড়ামোদীরা কিরগিস্তান, ফিলিস্তিনের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো দেখতে পারতো। ভারত ফুটবল কর্তৃপক্ষ কিন্তু এ ধরনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখানোর সুযোগ করে দেয়, বিশেষ করে যেখানে তাদের জাতীয় দল সম্পৃক্ত। শিশু-কিশোরদের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা, খেলাটিকে নিয়ে স্বপ্ন জাগ্রত করার জন্য এসব করা দরকার।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads