• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮
পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতি

সংগৃহীত ছবি

ভ্রমণ

পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতি

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। এ দেশের নদনদী, সবুজ-শ্যামল মাঠ, ফসলের ক্ষেত, ছায়াঢাকা গ্রাম, শানবাঁধানো পুকুর, গ্রামবাংলার মানুষের সরল জীবন বিশ্বের যে-কোনো মানুষের হূদয় আকৃষ্ট করে। তাই বিজ্ঞ পর্যটকদের অভিমত, যথাযথ বিকাশের মাধ্যমে শুধু পর্যটনশিল্প থেকেই বছরে হাজারো কোটি টাকা আয় করতে পারে বাংলাদেশ। অফুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বাংলাদেশে পর্যটনশিল্প খুবই সম্ভাবনাময়। পৃথিবীর যে-কোনো পর্যটককে আকৃষ্ট করার মতো সকল পর্যটন আকর্ষণীয় উপাদান বাংলাদেশে বিদ্যমান। অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরা গেলে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে উঠবে। সুপরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বমানের পর্যটন পণ্য ও সেবা নিশ্চিতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশের মতো ষড়ঋতুর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমাদের আছে মনোরম পাহাড়, আছে নদী, আছে দিগন্ত বিস্তৃত ভাটি-বাংলার হাওর, সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ তো আছেই। আছে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, ময়নামতি বিহার, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মনোমুগ্ধকর পাহাড়ের চা-বাগান আর আদিবাসীদের বিচিত্র জীবনধারা। এ ছাড়া আছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, মাধবকুণ্ডের ঝরনা ধারা, ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প, রেশমশিল্প, খাদিশিল্প, জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁত, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগান, বাংলার বিচিত্র পেশা, ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-ভাস্কর্য ও স্থাপনা, চিরসুন্দর গ্রামীণ জনগদ, হাটবাজার, মেলা-কৃষ্টি-কালচার, কৃষক-কৃষানির সংগ্রামী জীবন, ঋতুবরণ ঐতিহ্য, বাংলা নববর্ষের উৎসব এসব কিছুই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের হাকালুকি হাওর এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। এ ছাড়া আছে-টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, ডিঙ্গাপুতা হাওরসহ দিগন্ত বিস্তৃত হাওরের সমাহার। বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আরো আছে— তিন পার্বত্য জেলা, নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া, সোনাদিয়া, পতেঙ্গা, মৌলভীবাজার, মহেশখালী, চট্টগ্রামের ফয়’স লেক, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ অনেক স্থান, পাহাড়পুর বিহার, শালবন বিহার, মহাস্থানগড়, রানী ভবানীর কীর্তি, বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, গীর্জা। আরো আছে ময়নামতি, রামসাগর, সোনারগাঁও, নাটোর, রাজবাড়ি, দীঘাপাতিয়া জমিদার বাড়ি, তাজহাট জমিদার বাড়ি, কক্সাজারের বৌদ্ধ মন্দির, ঢাকার লালবাগ দুর্গ, আহসান মঞ্জিল, গৌড় লক্ষণাবতী শহর, বাগেরহাটের অযোধ্যা মঠ ইত্যাদি। এসব স্থান ভ্রমণপিপাসু বিশ্ববাসীর কাছে আকর্ষণীয় এবং তাদের অবকাশ কাটাবার উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে। ৬৪টি জেলার প্রতিটিই আকর্ষণীয়। সমুদ্রসৈকতের কক্সাজার; এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করে বিদেশি পর্যটক আনাসহ অনুকূল সুবিধা সৃষ্টি করতে পারলেই সমুদ্র সৈকত দুনিয়ার দ্বিতীয় দীর্ঘতম কক্সাজার থেকে বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি সুন্দরবন; সিলেটের দীর্ঘতম চা বাগান; পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই হ্রদ; সিলেটের জাফলং; মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, শেরপুরের প্রত্নসম্পদ। নওগাঁর পালযুগের গৌরব পাহাড়পুর, কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধবিহার, পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি আর খাগড়াছড়ির গাছপালা-পাহাড়-জঙ্গল-ঝরনা আর মেঘের ভেলা, রাঙামাটির কাসালং, সাজেক, বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, লংগদু, নানিয়ারচর, রাজস’লী, চন্দ্রঘোনা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় শ্যামল বাংলার রূপাবণ্য, নদীর দেশ চাঁদপুর, বরিশাল, পিরোজপুর আর ঝালকাঠিতে দর্শনীয় স্থানের পাশাপাশি অঅছে নদী ভ্রমণের অপূর্ব সুযোগ।

পর্যটনে তরুণদের আগ্রহ ইতিবাচক

আশার খবর হচ্ছে, দেশ ঘুরে দেখার আগ্রহ বাড়ছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। পড়াশোনা ও কাজের ফাঁকে এখন গ্রুপভিত্তিক তরুণ-তরুণীরা দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, পর্যটনে বাড়ছে নারীদের আগ্রহ। বাংলাদেশে নারীরা এখন একাই বেরিয়ে পড়ছে। আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, বিগত ১০ বছরে ঈদকে কেন্দ্র করে নাগরিকদের মধ্যে ভ্রমণ প্রবণতা নতুন আশাবাদ জাগাচ্ছে। ঈদ পর্যটনে বাংলাদেশের সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলেছে। কারণ ব্যস্ত কর্মজীবনে ঈদের ছুটিকে মানুষ এখন গ্রামের বাড়ি বেড়ানোর পাশাপাশি নিজ এলাকা ও অন্যান্য স্থানেও ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। বিশ্বের বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ঈদ পর্যটনকে কেন্দ্র করে। তাই আমাদের দেশেও ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পর্যটনশিল্পও জড়িত হতে পারে। পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রতি ঈদে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করে কক্সাজার, যেখানে সারা বছর কক্সাজার ভ্রমণে যায় ১৫ থেকে ২০ লাখ পর্যটক। ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষ পর্যটন স্থানগুলো ছাড়াও জেলা পর্যায়ে ভ্রমণে বিশেষ প্যাকেজ থাকলে ঈদ পর্যটনের আয় ও জনপ্রিয়তা আরো বাড়বে।

বিলাসী ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ছে

পর্যটনশিল্প বিকাশের অবারিত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। আশার খবর হচ্ছে, এখন ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ ঘুরতে যায়। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩০ লাখ। ২০০০ সালের দিকে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ থেকে ৫ লাখ। বিদেশি পর্যটক নির্ভরতা ছাড়াও দেশীয় পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ সুবিধা, আকর্ষণীয় অফার এবং পর্যটন ব্যয় সীমার মধ্যে থাকলে দেশের মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। আর দেশের মানুষকে দেশ দেখানো স্লোগানে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে পর্যটনশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এক হিসেবে বলা হয়, ১৬ কোটির বেশি মানুষের বাংলাদেশ গড়ে প্রতিবছরে ১০ ভাগও যদি দেশ ঘুরে দেখে তাহলে বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক তৎপরতা সৃষ্টি হবে। মনে রাখা দরকার পর্যটন বিকাশে অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং জিনিসপত্রের মান ও দামের সামঞ্জস্যতা এই তিনটি বিষয়ের খুব গুরুত্ব পূর্ণ। পর্যটনশিল্পের বিকাশে সরকার সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অধিদপ্তর ও বেসরকারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি নীতিমালা গ্রহণ করলে খুব দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। কারণ দেশের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সৌখিনতা ও ভ্রমণবিলাসের প্রবণতা বাড়ছে। এটি খুবই ইতিবাচক একটি দিক। কারণ এখন দেশের মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নবিত্তরাও সময়-সুযোগ পেলেই পরিবার পরিজন নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে পর্যটনের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ক্ষেত্রে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক মাধ্যমগুলো বিরাট ভূমিকা রাখছে। বিশেষত ফেসবুকের কল্যাণে ভ্রমণপিপাসু মানুষের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর ছবি ও ভিডিও ক্লিপগুলো সর্বসাধারণকে ভ্রমণে উৎসাহী করে তুলছে। এছাড়া পর্যটন নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখালেখি হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে নতুন নতুন পর্যটন কেন্দ্রের আবিষ্কার এবং ভ্রমণে এসব স্থান ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পর্যটনশিল্পের বিকাশে মনযোগ প্রয়োজন স্কুল ট্যরিজম, নৌ পর্যটন, হাওরাঞ্চলের পর্যটন, মেডিক্যাল ট্যুরিজম, কমিউনিটি ট্যুরিজম, স্পোর্টস ট্যুরিজম, ইসলামিক পর্যটন কিভাবে কাজে লাগানো যায়। এজন্য পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে যারা কাজ করছেন, গবেষণা করছেন তাদের মতামতের আলোকে সম্ভাবনাময় নতুন পর্যটন ক্ষেত্রসমূহকে কাজে লাগাবার পথনকশা তৈরি করা খুব জরুরি।

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে নতুন জাগরণ

দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন ঘটছে পর্যটনশিল্প বিকাশের ফলে। বর্তমানে এ শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। কারণ একজন পর্যটক এলে ৪ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। সেই হিসাবে যদি আমাদের দেশে ১ লাখ পর্যটক আসে তাহলে ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।  বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা কমবেশি ১০০ কোটি। যা ২০২০ সালে ১৬০ কোটিতে উন্নীত হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। আশার ব্যাপারটি হলো, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের মূল গন্তব্য হবে এশিয়ার দেশগুলো। কাজেই এই বিশাল বাজার ধরতে পারলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশ অর্থনীতির চেহারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে,  দেশের কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৪১ শতাংশ বা প্রায় সাড়ে ৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটন খাতে। এই শিল্পের মাধ্যমে দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ বা মূল্য সংযোজন হচ্ছে ১৬ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। বিভিন্ন পরিসংখ্যানের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা গেছে, পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হোটেল ব্যবসা, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পরিবহনসহ বিনোদন খাত থেকে এ আয় হচ্ছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে ২০২০ সাল নাগাদ পর্যটন থেকে প্রতিবছর ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হবে। বিশ্বের যেসব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তাদের মধ্যে ফ্রান্স, মিনর, গ্রিস, লেবানন, ইসরাইল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি, থাইল্যান্ড, মৌরিতাস, বাহামা, ফিজি, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, সিসিলি অন্যতম। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেক পর্যটক যাচ্ছে ইউরোপে। তবে ২০৫০ সাল নাগাদ ৫১টি দেশের পর্যটক আমাদের দেশে আসবে। তখন পর্যটন খাতের অবস্থা কী হবে, এ বিষয়ে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার কোনো দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নেই।

ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনা

আমাদের দেশে দিনে দিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ইকো-ট্যুরিজম। ইকো-ট্যুরিজমের উপাদানের মধ্যে রয়েছে-পাহাড়-পর্বত, নদীনালা, সাগরসৈকত, জীববৈচিত্র্য, বৃক্ষ-বনানী, প্রাণিকুল, সংস্কৃতি-সভ্যতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, জনগণের আয়-রোজগার ও জীবনধারণ পদ্ধতি। যার সবকিছুই রয়েছে বাংলাদেশের। পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলা সম্ভব। এটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে পৃথিবীব্যাপী সুপরিচিত। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত সেন্টমার্টিন বা অনুরূপ দ্বীপকেও ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এর ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ইকো-ট্যুরিজমের অনুকূল। দ্বীপে উন্নত মানের কোরাল, বিরল প্রজাতির কচ্ছপ, উপকূলের শান্ত ও নীল জলরাশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সিলেটের চা-বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কক্সাজার, কুয়াকাটার মতো অনন্য প্রাকৃতিক স্থানসমূহ ইকো-ট্যুরিজম এর উৎকৃষ্ট কেন্দ্র হতে পারে। দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাসস্থানকে ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। পর্যটনের এই নতুন ধারণায় পর্যটকগণ পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য স্থানীয় পরিবেশ ও মানব সম্প্রদায়ের সাথে দায়িত্বশীল আচরণ করেন। সেইসঙ্গে এখানে সুযোগ থাকে প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গিয়ে নতুন কিছু জানার ও উপলব্ধি করার। ইকো-ট্যুরিজম হলো একান্ত নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে ভ্রমণের মাধ্যমে জ্ঞানার্জন বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের উদ্দেশ্যে বন ও বন্যপ্রাণীর সৌন্দর্য অবলোকন। এটা একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতা যার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা প্রকৃতির আকর্ষণগুলোকে উপলব্ধি করতে পারেন। ইকো-ট্যুরিজম বলতে পরিবেশগত ও সংস্কৃতিগতভাবে টেকসই পর্যটন উন্নয়নকে বোঝায়, যা সমাজের বৃহত্তর অংশ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের আর্থিক ও সামাজিকভাবে লাভবান হবার বিষয়টি নিশ্চিত করে। পর্যটন এলাকার স্থানীয় জনগণের জন্য ইকো-ট্যুরিজম পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের একটি দীর্ঘস্থায়ী সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এই খাতে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হলে থাকতে হবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপাদান আর তার সঠিক উপস্থাপনা।

বর্তমান সময়ে ইকো-ট্যুরিজমের গুরুত্ব অনুধাবন করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ইকো-ট্যুরিজমের বিকাশে মনোনিবেশ করেছে। যেমনু আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান এবং এশিয়ার কিছু শিল্প উন্নত দেশে ইকো-ট্যুরিজমের যথেষ্ট বিকাশ সাধন ঘটেছে। বাংলাদেশে ইকো-ট্যুরিজম নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও এর পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর হার আগামীতে আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প ‘ইকো-ট্যুরিজম’ বাংলাদেশে সফল ও বিকশিত করা সম্ভব। আর এটি করতে পারলে দেশের জিডিপিতে অবদান রাখার পাশাপাশি বিশ্বের বুকে ইকো-ট্যুরিজমের নতুন মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে দেশের প্রধান প্রধান দর্শনীয় স্থানে পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট গড়ে তোলা জরুরি।

করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াক পর্যটনশিল্প

গত বছর মার্চে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর থেকে অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই স্থবিরতা দেখা যায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পর্যটন খাত। করোনাভাইরাসের কারণে পর্যটন খাতে ধস নেমে এসেছিল। ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসা ও কর্মসংস্থান।  ২০২০ সালের হিসেবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। সার্বিকভাবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বেশি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪০ লাখ জনবল বেকার হয়ে পড়ায় তাদের ওপর নির্ভরশীল কমপক্ষে দেড় কোটি পারিবারিক সদস্য অর্থনৈতিকভাবে বিপদেও সম্মুখীন হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এই হিসাব আরো বেশিই হবার কথা। বিভিন্ন বিশ্লেষণ বলছে জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৭০% জনবল। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর চলতি বছরের শুরুতে খুলে দেওয়া হয় পর্যটন খাত। করোনার প্রভাব কাটাতে পর্যটন কেন্দ্রগুলো আকর্ষণীয়, নিরাপত্তা জোরদার, শিল্পের বিকাশ, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে ট্যুরিজম বোর্ড। করোনা পরবর্তীসময়ে দেশের অর্থনীতিতে পর্যটন খাত বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য পর্যটন খাতের সব ধরনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশেষ করে জেলাভিত্তিক পর্যটন এলাকাগুলোকে আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ এবং বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে ট্যুরিজম বোর্ড। পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধি, পর্যটন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যটকদের সারা দেশে মানসম্মত পর্যটন সুবিধাদি সৃষ্টি, দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় স্থানে পর্যটন সুবিধাদি সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পর্যটন এলাকগুলোতে কিভাবে স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গড়ে তোলা যায়, সে প্রচেষ্টা নেওয়া হচ্ছে।

ইসলামী পর্যটন

মানবতার ধর্ম ইসলামেও পর্যটনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। রয়েছে ইসলামে ভ্রমণের নির্দেশনা। ইসলাম মনে করে, ভ্রমণ হতে পারে ইবাদত, বিনোদন বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশে ধর্মীয় ঐতিহ্যপূর্ণ প্রায় দেড় হাজার স্থান থাকলেও তার অনেকই এখনো বিশ্ববাসীর অজানা। বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিশ্বজুড়ে মুসলিম পর্যটকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাই ধর্মীয় স্থানগুলোতে পর্যটন শুরু হলে আগামী পাঁচ বছরে এই খাতে বছরে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা আয় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্মীয় ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানের পর্যটন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হয়ে উঠতে পারে দেশের আয়ের অন্যতম খাত। কারণ দেশে ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার অভাব নেই। সুলতানি আমল থেকে শুরু করে মোগল আমলের অনেক মুসলিম ধর্মীয় স্থাপত্যকীর্তি রয়েছে এখানে। এ ছাড়া বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান, যেমন-পাহাড়পুর বিহার, ময়নামতি বিহার, বান্দরবানের স্বর্ণমন্দিরসহ আরো ছোট ছোট স্থাপনা এখন পর্যটনের নতুন আকর্ষণ। অলি আউলিয়ার দেশ বাংলাদেশ। বারো আউলিয়ার চট্টগ্রাম ও পুণ্যভূমি সিলেট ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য মুসলিম স্থাপত্য, পীর-মাশায়েখের দরগা-মাজার। এ দেশের ৯২ শতাংশ মানুষের ধর্ম ইসলাম। তবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করে আসছে।

দশম ইসলামিক কনফারেন্স অব ট্যুরিজম মিনিস্টার্সের সভায় ২০১৯ সালে ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন নগরী ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকাকে ওআইসি’র পর্যটন নগরী ঘোষণা করা এবং ১৩০ কোটি টাকার সহযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোর সংস্কার ও সজ্জিতকরণ সম্ভব হবে। এতে ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন ঘটবে। ঢাকার পর্যটনগত ধর্মীয় গুরুত্ব বাড়বে, বাড়বে ঢাকা ভ্রমণের আগ্রহ। এর আগে ওআইসি’র অঙ্গ সংগঠন ইসলামিক এডুকেশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন ২০১২ সালের জন্য ঢাকাকে ইসলামী সংস্কৃতির এশীয় অঞ্চলের রাজধানী ঘোষণা করে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ও ঢাকার মর্যাদা তৈরি করেছে। এরই অংশ হিসেবে ধর্মীয় স্থানকেন্দ্রিক ‘হালাল’ পর্যটন জোরদারে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক ও ইরান। সউদী আরবও ধর্মীয় পর্যটন বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে পর্যটক আকর্ষণে ব্যর্থ হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, ভুটান ও নেপাল অনেকটা এগিয়ে। তাই ওআইসি’র সহযোগিতা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যতে পারলে বাংলাদেশের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোও বিশ্বের অন্যতম পর্যটন গন্তব্য হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

বাংলাদেশের অপূর্ব সুন্দর শিল্প অনুপম স্থাপত্যের নিদর্শন, যা দেশ-বিদেশের বহু পর্যটককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। ধর্মীয় উৎসব এ দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে, যা বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করে অধিক পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রতি বছর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমা টঙ্গির তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত হয়। এ বিশ্ব ইজতেমায় দেশের লাখো মুসল্লির সঙ্গে পৃথিবীর শতাধিক দেশের বিদেশি মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে রয়েছে-ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, রমজান মাস, শবেবরাত, শবেকদর ও আশুরাসহ বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল। এসব ধর্মীয় উৎসবই যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে আনন্দ উদ্দীপনার সঙ্গে পালন করা হয়, যা পর্যটকদের এদেশের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তোলে। ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পর্যটনের যাবতীয় প্রচারাভিযানে ঐতিহ্যমণ্ডিত ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকেও গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করতে হবে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর প্রচার করতে হবে।

গ্রামীণ পর্যটন

বাংলাদেশের গ্রামগুলো হতে পারে পর্যটন আকর্ষণের অপার সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ১৯৯০ সালে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান ডেস্টিনেশন’ নামে প্রচারাভিযান করেছিল। সেই প্রচারাভিযানের আলোকে ‘একটি গ্রাম একটি পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে আমরা বিদেশি পর্যটকদের কাছে আমাদের গ্রামগুলোকে উপস্থাপন করতে পারি। বাংলাদেশের ৮৬ হাজার গ্রামবাংলা ৮৬ হাজার পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র, কারণ একটি গ্রাম থেকে আরেকটি গ্রাম আলাদা। কোনো কোনো গ্রাম নদীকেন্দ্রিক, পাহাড়কেন্দ্রিক, হাওরকেন্দ্রিক, বিলকেন্দ্রিক। একটি গ্রাম থেকে আরেকটি গ্রামের মানুষের আচার-ব্যবহার, সংস্কৃতি, শিক্ষাদীক্ষা, প্রথা, নীতি, জীবনযাত্রা, বিবাহ-অনুষ্ঠান আলাদা। কৃষকের ধানের চারা রোপণের দৃশ্য আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয়। এ দৃশ্য পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা পাওয়া বিরল। মাঠের পর মাঠ সবুজ শস্যক্ষেতগুলো দেখে মনে হয় যেন সবুজ রাজ্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে। গ্রামীণ মানুষের অতিথিপরায়ণতা যে-কোনো পর্যটককে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবে গ্রামে। যদি গ্রামীণ পর্যটনের দিকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রামীণ পর্যটনকে বিকশিত করতে পারি তাহলে গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, গ্রামীণ শিক্ষিত বেকারদের কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা যাবে। গ্রামীণ পর্যটনের জন্য আমাদের বেশি কিছু করতে হবে না, কারণ বিদেশি পর্যটকরা গ্রামীণ পরিবেশ বেশি উপভোগ করেন। তাদের জন্য নতুন করে ইটের ঘরবাড়ি বানানোর দরকার নেই। এ ক্ষেত্রে আমরা হোম-স্টে ব্যবস্থা করতে পারি, যেখানে পর্যটকদের পরিবারের সদস্য হিসেবে আপ্যায়ন করা হবে। বিদেশি পর্যটকরা গ্রামে যায় গ্রামীণ সৌন্দর্য অবলোকন করতে, সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস সম্বন্ধে জানতে। তারা আমাদের সঙ্গে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবার খাবে, কৃষকদের ফসল রোপণ করা দেখবে, পুকুর থেকে মাছ ধরবে, পাকা ফল গাছ থেকে পেড়ে খাবে এবং যেসব এলাকায় মাটির ঘরবাড়ি সেখানে মাটির ঘরবাড়িতে তারা রাতে ঘুমাবে। এগুলো হবে তাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। কারণ পর্যটকরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে এবং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যায় অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে।

নৌপর্যটনে সম্ভাবনাময়

ঐতিহ্য অনুযায়ী বলা হয়ে থাকে-বাংলাদেশ ষড়ঋতুর এবং নদীমাতৃক দেশ। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের নদীগুলোর অবস্থা সকরুণ হলেও পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন নদীবিধৌত ভূখণ্ড নেই। জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদনদী, খাল-বিল, হ্রদ, হাওর-বাঁওড় আর জলাভূমি। আর তাই আরামদায়ক  ও পরিবেশ-প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন হিসেবে রিভার ট্যুরিজম বা নৌপর্যটনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো কথা ভাবা দরকার। আমাদের দেশের রাঙামাটি, কাপ্তাই, বান্দরবান, খুলনা, বাগেরহাট সুনামগঞ্জ অঞ্চলে নৌপর্যটন জনপ্রিয়তা পাবার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। পরিকল্পিত উপায়ে অগ্রসর হলে নৌট্যুরিজম আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে। আমরা জানি শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো সুগম করা এবং পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টির লক্ষ্যে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যুক্ত করার জন্য খাল কেটে নদী এবং সাগরের পানি শহরের ভেতর আনা হয়েছে। এসব কারণে ভারতের কেরালা, জম্মু কাশ্মির কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মারিশাস  দেশগুলোতে নৌপর্যটন জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

হাওরাঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা

হাওরের সৌন্দর্যে বিখ্যাত চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত পর্যটকরা বিমোহিত হয়েছেন। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখে হাওরকে ‘উড়াল পঙ্খির দেশ’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। আশার খবর হচ্ছে, হাওরাঞ্চলের আকর্ষণীয় স্থানগুলোর প্রতি ভ্রমণপিপাসুদের আগ্রহ দিন দিনই বাড়ছে। শীতে কুয়াচ্ছন্ন হাওরে থাকে অতিথি পাখির অবাদ বিচরণ। বর্ষায় হাওরের ছোট ছোট দ্বীপের মতো বাড়িঘর। শেষ বিকেলে সূর্যাস্তের মায়াবতী দৃশ্য কিংবা বিকেলের স্নিগ্ধতায় দূর পাহাড়ের হূদয়কাড়া সৌন্দর্য সবকিছুকে বিধাতা যেন অঢেল অকৃপণ হাতে সাজিয়েছেন বাংলার হাওর। চাঁদনি রাতে নৌকায় হাওরে বেড়ানো আর ছোট ছোট ঢেউয়ের দোল খাওয়ার স্মৃতি কখনো ভুলবার নয়। আমাদের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতেও হাওরের রয়েছে অনন্য অবদান। হাছন রাজা, উকিল মুন্সী, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের হাত ধরে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে হাওরাঞ্চলের সংগীতভান্ডার। হাওরাঞ্চলের হিজল-তমাল বন আকৃষ্ট করে সৌন্দর্যপিপাসুদের।  দেশের সাতটি জেলার ৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে ৪২৩টি হাওর নিয়ে গঠিত হাওরাঞ্চলে শীত-বর্ষার হাওরের স্বতন্ত্র রূপ প্রকৃতিপ্রেমীদের দুর্নিবার আকর্ষণে টেনে নিয়ে যায় পর্যটকদের। হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে প্রতিদিন ভিড় করেন ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থী এবং পর্যটকরা। বিশাল এই হাওর বাংলাকে কেন্দ্র করে আমাদের পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ হতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সমাগমে। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা গেলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের এ হাওরগুলো দেশের অন্যতম পর্যটন ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। হাওর ট্যুরিজমকে জনপ্রিয়করণে ব্যাপক প্রচার ও প্রকাশনা দরকার। পর্যটনকেন্দ্র গড়ে না ওঠায় হাওরে ঘুরতে আসা পর্যটকদের পড়তে হয় নানামুখী বিড়ম্বনায়। হাওরের পর্যটন খাতকে সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে দুই ঋতুতেই (বৃহদার্থে) বিরাট অর্থকরী ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে হাওরাঞ্চল। খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ, তেঁতুলিয়া, কিশোরগঞ্জ, নিকলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, তাহেরপুর, মধ্যনগর, ভোলাগঞ্জ, টেকেরহাট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, জামালগঞ্জ এসব জায়গায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মাধ্যমে পর্যটকদের থাকা, খাওয়া আর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার। হাওর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করা খুবই জরুরি। হাওরাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য রাস্তা নির্মাণ, ডুবু সড়কসহ হাওরের অমসৃণ রাস্তায় চলাচলের উপযোগী মোটর সাইকেলের মতো তিন চাকার বিশেষ বাইক তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে চালকসহ তিন-চারজন যাত্রী বহন করা যায়। নিরাপদ যানবাহন হলে শুকনো মৌসুমে পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যে যাওয়া আসা করতে পারবে।

স্পোর্টস ট্যুরিজম

বাংলাদেশের স্পোর্টস ট্যুরিজম বিষয়ে এফবিসিসিআই স্ট্যান্ডিং কমিটি অন স্পোর্টস ট্যুরিজম আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বলা হয়, বাংলাদেশের স্পোর্টসকে যদি সত্যিকার অর্থে পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় তবে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ হবে। এশিয়ান জার্নাল অন স্পোর্টস অ্যান্ড ইকোনমির একটি আর্টিকেল থেকে জানা যায়, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ক্রীড়া পর্যটনে এশিয়ায় এগিয়ে থাকা দেশগুলো হলো- ভারত ১১%, চীন ১০%, থাইল্যান্ড ৯%, কোরিয়া ৮%, মালয়েশিয়া ৭%, শ্রীলঙ্কা ৫%, নেপাল ৪%। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ অংশীদারিত্ব ২ ভাগেরও নিচে। আমরা গ্রামীণ খেলা যেমন নৌকাবাইচ, হা-ডু-ডু, লাঠি খেলা, বলী খেলাগুলো বিশ্বে প্রচার করতে পারি তাহলে বাংলাদেশকে Truely Sports Loving Country হিসেবে বহির্বিশ্বে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটসহ ক্রীড়াক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়েছে। আমাদের আছে নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, কাবাডিসহ রয়েছে দেশীয় গ্রামীণ খেলাধুলার বড় ঐতিহ্য। ক্রীড়াক্ষেত্রে সমৃদ্ধ অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। গোলটেবিল আলোচনা ও প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়, নৌকাবাইচ বা লাঠিখেলা ২টি গ্রামীণ খেলাকে আমরা বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করতে পারি। প্রেজেন্টেশনে যেমন দেখানো হয়েছে স্পোর্টস ট্যুরিজমের বড় দুটি উপাদান- বিচ স্পোর্টস ও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।

শিল্পে অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে করণীয়

বিশ্বের অনেক দেশে পর্যটন খাত অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তন্মধ্যে ফ্রান্স, মিসর, গ্রিস, লেবানন, ইসরাইল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি, থাইল্যান্ড অন্যতম। এ ছাড়া দ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে খ্যাত মৌরিতাস, বাহামা, ফিজি, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, সিসিলিতেও পর্যটনশিল্প ব্যাপক বিকাশ লাভ করেছে। পর্যটনের মাধ্যমে ব্যাপক পরিমাণের অর্থ মালামাল পরিবহন এবং সেবা খাতে ব্যয়িত হয় যা বিশ্বের মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৫%। অর্থনীতির সহায়ক সেবা খাত হিসেবে পর্যটনের সাথে জড়িত রয়েছে ব্যাপকসংখ্যক লোক। এর ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণা ও উদ্যোগ। সেসাথে পর্যটনকে একটি বিশেষ শিল্প খাত হিসেবে গুরুত্বারোপ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পর্যটনের জন্য প্রয়োজন দর্শনীয় স্থানের পাশাপাশি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ ও অবকাঠামোগত পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। নৈসর্গিক সৌন্দর্যও শুধু প্রকৃতির দানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। পরিকল্পনামত মানুষের সৃজনশীলতায় সৃষ্ট স্থাপনা ও অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে হবে। বাংলাদেশের সামগ্রিক পর্যটন অবকাঠামোও আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে পৌঁছতে এখনো অনেক পথ বাকি। সুতরাং সরকারকে এই সম্ভাবনাময় শিল্প ব্যবস্থাপনার কথা গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অধিক সুবিধা দিয়ে এই শিল্পে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দেশের প্রতিষ্ঠান বেশি হলে আমাদের লাভ বেশি হবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে রয়েছে সম্ভাবনাময় আরো বহু পর্যটন স্পট। সময়োপযোগী ও পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে এসব পর্যটন স্পট যদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে নবদিগন্তের সূচনা হবে। পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের প্রয়োজন—

-পর্যটনকে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সুযোগ-সুবিধা দিলে পর্যটকরা অধিক হারে আকৃষ্ট হতে পারে।

দেশের আনাচে-কানাচে অরক্ষিত ঐতিহ্যমণ্ডিত দর্শনীয় স্থানগুলোকে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিয়ে স্থানীয়ভাবে বহু লোকের নতুন নতুন কর্মসংস্থান ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।

শুধু বিদেশি পর্যটকদের নির্ভরতায় না থেকে  ‘দেশকে চিনুন, দেশকে জানুন’; ‘ঘুরে দেখুন বাংলাদেশ-ভালোবাসুন বাংলাদেশ’ এরকম দেশাত্মক স্লোগানে দেশের মানুষকে দেশ দেশ দেখানোর লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার।

-মালয়েশিয়ার আদলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বছরে একবার শিক্ষা সফরের আয়োজন বাধ্যতামূলক করা দরকার । শিক্ষা সফর বাধ্যতামূলক করা হলে-প্রজন্মের সন্তানরা দেশনে চিনবে, জানবে, ভালোবাসবে। পাশাপাশি আয় হরে শতকোটি টাকা।  স্কুল ক্যাম্পেইন এবং তরুণ প্রজন্মদের ভ্রমণে আগ্রহী করে তোলা দরকার।

-পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। ট্যুরিস্ট পুলিশ ব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার।

-নৌ ভ্রমণ হতে পারে পর্যটনের আরেক পদক্ষেপ। নতুন প্রজন্মরা দেশের নদীগুলোকে চিনবে এবং ইতিহাস জানবে।

-বর্ষায় এবং শুকনো মৌসুমে দুই বিপরীত রূপের হাওর দর্শন হতে পারে পর্যটনের নতুন আকর্ষণ।

-শহরে জন্ম ও শহরে বেড়ে উঠা প্রজন্মকে গ্রামের সাথে পরিচিত করে তোলাটাও হতে পারে পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র। কৃষি, কৃষক এবং গ্রামের মানুষের সরল জীবন দর্শন হতে পারে অভ্যন্তরীন পর্যটনের উৎস।

-পর্যটনসমৃদ্ধ অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন; পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা; পর্যটন এলাকায় পর্যটন পুলিশ স্টেশন স্থাপন; পর্যটকদের জন্য বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা; ওয়েবসাইটে প্রচারণা বা ক্যাম্পেইন।

পর্যটন দ্রুত বিকাশমান শিল্প। বিশ্বের কয়েকটি দেশ একমাত্র পর্যটনকে অবলম্ব্বন করেই সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল। ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই বাংলাদেশে। আমাদের দেশে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঠিকমতো ও পরিকল্পিতভাবে করতে পারলে সুইজারল্যান্ড, পাতোয়া, ব্যাংকক-এর মতো ট্যুরিজম এখানেও গড়ে উঠতে পারে।

 কলাম লেখক ও উন্নয়ন গবেষক, writetomukul36@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads