• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮
শালবনবিহারে কমেছে দর্শনার্থী

প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

ভ্রমণ

রাজস্ব আয় কমেছে এক-তৃতীয়াংশ

শালবনবিহারে কমেছে দর্শনার্থী

  • খায়রুল আহসান মানিক, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ০৬ অক্টোবর ২০২১

কুমিল্লার ‘পর্যটন নগরী’ খ্যাত কোটবাড়ি এলাকার ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শালবনবিহার ও ময়নামতি জাদুঘর। সারা বছরই পর্যটকদের পদচারণায় ঐতিহাসিক স্থান দুটি মুখর থাকত। বছরজুড়েই প্রত্নসম্পদে ভরপুর পুরো কোটবাড়ি এলাকাটি নানা বয়সি দর্শনার্থীরা প্রাণচাঞ্চল্যময় করে রাখতেন। এ ছাড়া কোটবাড়ি এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও ভিড় লেগে থাকত ভ্রমণপিপাসুদের।

তবে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস যেন সবকিছুর গতিপথ পাল্টে দিয়েছে। সারা দেশের মতো কুমিল্লার পর্যটন খাতেও লেগেছে করোনার ধাক্কা। করোনার প্রকোপ ঠেকাতে প্রথম দফায় দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস বন্ধ ছিল জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র। দেশজুড়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে আবারো প্রায় চার মাস বন্ধ থাকে জেলার সকল পর্যটন কেন্দ্র।

গত মাসে জেলার ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শালবনবিহার, ময়নামতি জাদুঘরসহ দর্শনীয় স্থানগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু হলেও আগের মতো দেখা মিলছে না পর্যটকের। এসব স্থানে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ফলে কমেছে সরকারের রাজস্ব আয়। এ ছাড়া দর্শনার্থী কম থাকায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও ভাটা পড়েছে। তবে সকলেরই প্রত্যাশা, করোনো ক্ষত কাটিয়ে আবারো ঘুরে দাঁড়াবে কুমিল্লার পর্যটন খাত।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুমিল্লা কার্যালয় সূত্র জানায়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে শালবনবিহার ও ময়নামতি জাদুঘরে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ৬ মাস পর ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চালু করা হয়। কিন্তু চলতি বছরের মার্চে সারাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে এপ্রিলের শুরু থেকে ফের বন্ধ করে দেওয়া হয় এসব ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। পরিস্থিতি কিছুুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় প্রায় চার মাস বন্ধ থাকার পর গত ১৯ আগস্ট থেকে আবারো এসব প্রত্ন স্থানসমূহ চালু করা হয়। কিন্তু চালুর এক মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও আগের মতো দেখা মিলছে না পর্যটকদের।

সূত্র জানায়, কুমিল্লার লালমাই ও ময়নামতি পাহাড় এলাকায় অন্তত ২৩টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উন্মোচিত হওয়া ১২টির মধ্যে শালবনবিহার ও ময়নামতি জাদুঘর থেকে সরকার রাজস্ব আয় করছেন। অন্যগুলো এখনো বিনা খরচে দেখতে পারছেন পর্যটকরা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শালবনবিহার ও ময়নামতি জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার পর সকলের প্রত্যাশা ছিল, নানা বয়সি পর্যটকের কোলাহলে জেলার এসব স্থান মুখর হয়ে উঠবে। এ ছাড়া করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ধীরে ধীরে প্রাণচাঞ্চল্যময় হয়ে উঠবে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার ঐতিহ্যবাহী লালমাই পাহাড় ঘিরে গড়ে ওঠা সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ব্যক্তিমালিকানাধীন পার্কগুলো। আর কর্মব্যস্ত হয়ে উঠবেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট সকল ব্যবসায়ীরাও। কিন্তু পর্যটকদের পদচারণা তেমন না থাকায় সকলের ধারণা পাল্টে গেছে। এরপরও সুদিনের অপেক্ষায় রয়েছেন কুমিল্লার পর্যটন সংশ্লিষ্ট সকলে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিন শালবনবিহার ও ময়নামতি জাদুঘর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দু'টো স্থানেই দর্শনার্থীদের তেমন চাপ নেই। কোলাহল নেই নানা বয়সী মানুষের। যদিও অন্যান্য বছরে এ সময় দর্শনার্থীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হতো কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া অন্যান্য বছর এমন সময়ে দেশিয় দর্শনার্থী ছাড়াও বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতি থাকত চোখে পড়ার মতো। কিন্তু করোনার কারণে বর্তমানে বিদেশি পর্যটক নেই বললেই চলে।

শালবনবিহার ও ময়নামতি জাদুঘরকে কেন্দ্র করে সেখানে অর্ধশতাধিক দোকানপাট গড়ে উঠেছে। সেগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, পর্যটনসংশ্লিষ্ট এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিক্রি মন্দা। পর্যটক তেমন না আসায় দোকানিদের বিক্রি একেবারেই কম। যার কারনে অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান হাসিবুল হাসান সুমি জানান, ২০১৯ সালের এই সময়ে যেই পরিমাণ পর্যটক এসেছেন, এখন তার তিন ভাগের একভাগও নেই। আগে এমন সময়ে প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আসত। পর্যটকদের সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হতো। আর করোনার প্রকোপের কারণে এখন সেখানে পর্যটক আসছেন প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২শ। এছাড়া বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা একেবারেই কম। তবে আমরা আশাবাদী আবারো পর্যটকদের কোলাহলে প্রাণচাঞ্চল্যময় হয়ে উঠবে এসব এলাকা।

হাসিবুল হাসান সুমি আরো জানান, দর্শনার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারি করা হচ্ছে। মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রবেশের সময় তাদের নিরাপত্তা কর্মীরা এবং টিকিট কাউন্টারে থাকা কর্মীরা স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি তদারকি করছেন। তবে দর্শনার্থী কম আসায় রাজস্ব আয়ও অনেক কমে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শালবনবিহারে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী ফেরদৌস আক্তার লাইজু বলেন, ঐতিহাসিক এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। আমাদের ধারণা ছিল দর্শনার্থীদের চাপ বেশি থাকবে। তাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে এসেছি। তবে আগের মতো এখন আর মজা লাগছে না। পর্যটকের সংখ্যা অনেক কম।

আরেক দর্শনার্থী মো.মহিউদ্দিন আকাশ বলেন, ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ কুমিল্লাকে গৌরবান্বিত করে এই শালবনবিহার। দীর্ঘদিন পর শালবনবিহার ও ময়নামতি জাদুঘরে ঘুরতে এসেছি। এসেই বুঝতে পেরেছি, করোনা আমাদের জীবনের গতিপথ অনেক বদলে দিয়েছে। আগে এই সময়ে যেই পরিমাণ দর্শনার্থীর ভিড় থাকত, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। অনেকদিন পর আসায় সবকিছু যেন নতুন নতুন লাগছে।

শালবনবিহারের সামনে ফুচকা-চটপটি বিক্রি করেন খোরশেদ আলম। কিন্তু পর্যটক কম আসায় তার ব্যবসা মন্দা চলছে। খোরশেদ বলেন, দীর্ঘদিন পর সব কিছু চালু হয়েছে। আশা করেছিলাম ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবো। কিন্তু পর্যটকের উপস্থিতি একেবারেই কম। তবে এরপরও আশা ছাড়িনি, আশা করছি সব কিছু ঠিক থাকলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারব।

খুদে কুটির শিল্প ব্যবসায়ী আবুল কালাম ওরফে কালু বলেন, করোনার কারনে দীর্ঘদিন আমার দোকানটি বন্ধ ছিল। এতে লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম, নতুন করে সব শুরু হচ্ছে, পর্যটকদের ঢল নামবে। আবার ঘুরে দাঁড়ানো যাবে। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিক্রি একেবারেই কম।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads