• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮
চলনবিলের বিশাল জলরাশি হতে পারে দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র

ছবি: বাংলাদেশের খবর

ভ্রমণ

চলনবিলের বিশাল জলরাশি হতে পারে দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র

  • জাহাঙ্গীর আলম, চাটমোহর (পাবনা)
  • প্রকাশিত ০৬ অক্টোবর ২০২১

প্রায় এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খালের সমন্বয়ে গঠিত উত্তর জনপদের এক বিরল প্রাকৃতিক জলসম্পদের ঐতিহ্যবাহী চলনবিল—যার নাম শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে অথই পানিতে উথালপাথাল ঢেউয়ের কথা ভেবে।

চলনবিলের এ রূপ বর্ষার। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রতি ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা যায় চলনবিলকে। বর্ষায় সাগরের মতো বিশাল জলরাশি বুকে নিয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে এ বিল, শরতে শান্ত জলরাশির ওপর ছোপ ছোপ সবুজ রঙের খেলা। হেমন্তে পাকা ধান আর সোঁদা মাটির গন্ধে ম-ম করে চারদিক। শীতে হলুদ আর সবুজের সমারোহ এবং গ্রীষ্মে চলনবিলের রুক্ষ রূপ। প্রতি ঋতুতে চলনবিলের মূল আকর্ষণ নৌভ্রমণ। চলনবিল হতে পারে দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র।

‘ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ নামক বই থেকে জানা যায়, পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ফরিদপুর ও নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই; সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উলাপাড়া এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চল শেরপুর মিলেই ছিল বিশাল আয়তনের চলনবিল। ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ এই তিন অংশে বিভক্ত হয় চলনবিল। বর্তমান চলনবিলে নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ফরিদপুর এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার ৬২টি ইউনিয়ন, আটটি পৌরসভা এবং এক হাজার ৬০০টি গ্রাম রয়েছে। পুরো অঞ্চলের লোকসংখ্যা ২০ লাখের বেশি।

দেশের উত্তর জনপদের চলনবিলের অবয়ব আর ঐতিহ্য যেমন বিরাট, তেমনি এর কিংবদন্তির ভান্ডারও বিশাল। চলনবিল জনপদের মানুষের মুখে মুখে কত যে উপকথা ছড়িয়ে আছে তার হিসাব করা দুরূহ। চলনবিলে দেখতে পাবেন দেশের বড় গ্রামগুলোর অন্যতম কলম গ্রাম। চাটমোহরে জগৎশেঠের কুঠির, বুড়াপীরের দরগা; সিংড়ার হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.)-এর মাজার শরিফ, ফরিদপুরের বনওয়ারীনগর জমিদারবাড়ি, সিরাজগঞ্জের তাড়াশের কাছে পিঠে বিনসরা গ্রাম। সেখানে গিয়ে দেখা মিলবে কিংবদন্তি বেহুলা সুন্দরীর বাবা বাছোবানিয়া ওরফে সায় সওদাগরের বসতভিটা ‘জিয়ন কূপ’। এ ছাড়া নাটোরের গুরুদাসপুরে খুবজিপুর গ্রামে দেখা যাবে চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী জাদুঘর। এখানে পাবেন চলনবিলের বিভিন্ন ঐতিহ্যময় জিনিসপত্র। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে উত্তর জনপদের চলনবিল হতে পারে দেশের একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুরে অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা মরহুম অধ্যক্ষ আবদুল হামিদের হাতে গড়া চলনবিল জাদুঘর এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। জাদুঘরে আছে সুলতান নাসির উদ্দিনের নিজ হাতে লেখা কোরআন মাজিদ। গাছের ছালে বাংলায় লেখা প্রাচীন পুথিসহ অসংখ্য সামগ্রী। প্রায় ৩৫০ বছর আগে সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া এলাকায় ইসলাম প্রচার করতে আসা ঘাসি-ই-দেওয়ানের তিশিখালীর মাজার। এখানে প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

এখানে আনোয়ারা উপন্যাসের লেখক নজিবর রহমানের মাজার। রায় বাহাদুরের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। দেশের বৃহত্তম গোবিন্দ মন্দির, কপিলেশ্বর মন্দির, বারুহাসের ইমামবাড়ি, শীতলাইয়ের জমিদারবাড়ি। হান্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির। রায়গঞ্জের জয়সাগর মৎস্য খামার। চাটমোহরের শাহী মসজিদ, হরিপুরে লেখক প্রমথ চৌধুরী ও বড়াইগ্রামের জোয়াড়িতে লেখক প্রমথ নাথ বিশীর বাড়িসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান বুকে ধারণ করে আছে চলনবিল।

চলনবিলের জনপদে অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, মাজার-জলা রয়েছে আর সেগুলো ঘিরে রয়েছে নানা ইতিকথা, বিশ্বাস। বিলপাড়ের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামে হয়রত শাহ শরিফ জিন্দানি (রহ.)-এর মাজার অবস্থিত। অনেকেই বলেন, মসজিদটি তিনিই নির্মাণ করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, তিনি বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাগদাদ থেকে এ দেশে ষোড়শ খ্রিস্টাব্দে এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য। রাজা ভানসিংহের সময় তার আগমন হয় বলে জানা যায়।

রাজা ভানসিংহের পরিষদবর্গ ও তার ঠাকুররা দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় তিনি তার খিড়কি পুকুরে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেন বলে কথিত আছে। এখনো ভানসিংহের খিড়কি পুকুর রয়েছে। মামার মসজিদের পাশে ভাগ্নের মসজিদ নিয়ে নানা উপকথা শোনা যায়। কোনো এক ভাগ্নে মামার সাথে পালা দিয়ে এক রাতে নাকি মসজিদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাতের মধ্যে ছাদ দেয়া সম্ভব হয়নি, তাই সেটি ছাদবিহীন অবস্থায় ছিল। কেউ বলে, সেই ভাগ্নে ওই রাতেই মারা যাওয়ায় মসজিদটির নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকে।

বিলপাড়ের চাটমোহরের হান্ডিয়ালে শেঠের বাঙ্গালা ও শেঠের কুঠি মীরজাফরের সহচর জগৎশেঠের বিশ্রামাগার ছিল বলে লোকে এগুলোকে আজো ঘৃণার চোখে দেখে। হান্ডিয়ালে রয়েছে বুড়াপীরের দরগা। শোনা যায়, ১২৯২ বাংলা সনে গঙ্গাধর সরকার নামক একজন সরকারি সার্ভেয়ার বুড়াপীরের নিষ্কণ্টক জমি বাজেয়াপ্ত করতে চাওয়ায় তার রক্তবমি শুরু হয়। শেষে বুড়াপীরের দরগায় গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে আরোগ্য লাভ করেন।

চাটমোহরের সমাজ গ্রামের সমাজ মসজিদ নির্মাণ নিয়ে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। শেরশাহর ছেলে সলিম মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে শোনা যায়। সলিমের জন্মের আগেই তার মাকে শেরশাহ ভুল বুঝে দিলি চলে যান। পরে পুত্র সলিমকে স্বীকৃতি দেন এবং তাকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। লোকজন আজো বিশ্বাস করেন, হজরত আশরাফ জিন্দানি র.-এর দোয়ায় শেরশাহের ভুল ভাঙে।

বিলপাড়ের সিরাজগঞ্জ জেলার নিমগাছিতে ফকির দলের আস্তানা ছিল। শোনা যায়, বিদ্রোহী ফকিরদল মুক্তাগাছার মহারাজার পূর্বপুরুষ চন্দ্রশেখর আচার্যকে ময়মনসিংহ থেকে বন্দী করে নিমগাছিতে আটক রেখেছিল। নিমগাছির হাটখোলার পশ্চিমে ভোলা দেওয়ান নামে এক কামেলের মাজার রয়েছে। মাজারের পাশে একটি মসজিদ আছে। মাজারের ওপরে একটি বটগাছে সারা বছর মৌচাক থাকত বলে হিন্দুরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে মাজারে তেল-সিঁদুর দিতো।

চলনবিলের কোহিত ডাকাতের কথা মানুষ এখনো বলে। কার সাধ্যি কোহিতকে আটকে রাখে। একবার নাকি পুলিশ ধরেছিল তাকে। দড়ি দিয়ে নয়, ডা্লা বেড়ি দিয়ে বেঁধেছিল কোহিতকে। নৌকায় করে নেয়ার সময় কোহিত শুধু একটি ডুব দিতে চেয়েছিল। ডুব দেয়ার পর সে অদৃশ্য হয়ে যায়। পুলিশের হাতে পড়ে থাকল শুধু শিকল আর ডা্লা।

বেহুলা-লখিন্দরের উপকথা শুনে কে না মোহিত হয়। লখিন্দরের বাবা চাঁদ সওদাগর মনসা দেবীকে মানত না, তাই নিয়ে কত কা্ল। সেই চাঁদ সওদাগরের সময় চাঁদের বাজার লাগত চলনবিল পাড়ে। আজকের বস্তুল হাইস্কুলের ঠিক পাশের ভিটায়। বিনসাড়া গ্রামে রয়েছে বেহুলা-লখিন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর পাশেই আছে বেহুলার কুয়া (কূপ)। বেহুলা চাঁদের বাজারে যে নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করত সেটি বেহুলার খাড়ি নামে পরিচিত। বেহুলার খাড়ি নামক এই জোলা এখনো রয়েছে। খাড়ির পাশে নৌকাসদৃশ ডিবি রয়েছে। গ্রামের লোক এখনো বিশ্বাস করে, ডিবির নিচে বেহুলার নৌকা রয়েছে।

নিমগাছি হাটের পশ্চিমে জয়সাগর নামে এক বিশাল দীঘি রয়েছে। এই দীঘি নিয়ে নানা উপকথা প্রচলিত। রাজা অচ্যুত সেন এক যুদ্ধে জয়লাভ করে বিজয়ের স্মৃতিস্বরূপ জয়সাগর খনন করেছিলেন। দীঘি ১২ বছর ধরে খনন করার পরও নাকি এ দীঘিতে পানি ওঠেনি। এক রাতে রাজাকে এক সাধু স্বপ্নে দেখায় তার ছেলেকে বিয়ে দেয়ার পর বাসর রাতে সে দীঘিতে নেমে একমুঠো মাটি তুললে পানি উঠবে। রাজার ছেলে তা করায় দীঘি পানিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাজকুমারের সলিল সমাধি ঘটে। এরপর রাজবধূও সেখানে প্রাণ বিসর্জন দেয়। এই রাজবধূ নাকি অভিশাপ দিয়ে যায় কেউ এর পানি ছুঁবে না। লোকে ভয়ে এর পানি ব্যবহার না করায় জঙ্গলে ভরে যায় দীঘি। দীঘির মাঝে বেলগাছ জন্মে। সেই বেলও ভয়ে কেউ ছুঁতো না। এখন সেখানে মাছের চাষ হচ্ছে।

চলনবিলপাড়ের নটমন্দির, তারাশ কপিলেম্বর মন্দির, মামা-ভাগ্নের মসজিদ, আনুখাঁর দীঘি, পাগলাপীর, বারুহাসের বাঙ্গালা, তিসিখালীর ঘাসি দেওয়ানের মাজার, চৌগ্রামের বুড়াপীরের মাজার, চাপিলার মসজিদ, পলশুরা পাটপাড়া মসজিদ, গুরুদাসপুর এলাকার নীলকুঠি নিয়ে কত উপকথা ছড়িয়ে আছে তার হিসাব করা দুরূহ। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে চলনবিল হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলা দিয়ে চলনবিলে প্রবেশ করা সম্ভব। সামগ্রিক বিবেচনায় চলনবিল বৃহৎ। এর পুরো অংশ একদিনে ঘুরে দেখা কষ্টসাধ্য। চলনবিলের সমগ্র অংশ ঘুরে দেখতে দর্শনীয় স্থানগুলো আগে চিহ্নিত করে নিতে হবে। চলনবিলের অপরূপ দৃশ্যকে উপভোগ করতে বর্ষাকালকে বেছে নিতে হবে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads