• বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০২২, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯
ঐতিহ্যের বাহক ষাট গম্বুজ মসজিদ

সংগৃহীত ছবি

ভ্রমণ

ঐতিহ্যের বাহক ষাট গম্বুজ মসজিদ

  • প্রকাশিত ২০ মার্চ ২০২২

স্থাপত্য কর্মের একটি অসাধারণ নিদর্শন বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলা। যা মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বর্ণনা করে। খুলনা থেকে ১৫ মাইল দক্ষিণ পূর্ব দিকে এবং ঢাকা থেকে প্রায় ২০০ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত বাগেরহাট জেলা।

বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ১৫টি শহরের একটি তালিকা তৈরি করেছিল ফোর্বস। সেই তালিকায় ৫০টিরও বেশি ইসলামিক স্থাপত্যের সমন্বয়ে তৈরি বাগেরহাট শহরটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। মূলত এই ফোর্বস হলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিন প্রকাশনা সংস্থা। শুধু ফোর্বসই নয় ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কোর প্রকাশিত ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’-এর তালিকায় বাগেরহাট শহরটিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ১৬ শতাব্দীতে এই শহরটির নাম ছিল খলিফাতাবাদ এবং এটি শাহী বাংলায় পুদিনার শহর নামেও পরিচিত ছিল। তবে মসজিদের শহর হিসেবে  বাগেরহাট সুপরিচিত। বাগেরহাট শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন সুলতানাতের একজন প্রশাসক উলুঘ খান জাহান। প্রকৃত নাম উলুঘ খান জাহান হলেও  খান-ই-জাহান নামে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন সাধক, যোদ্ধা, পীর, ফকির, ধর্মপ্রচারক ও সুশাসক। শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয় বিশ্ব দরবারে অতি পরিচিত নাম খান-ই-জাহান। অর্ধ সহস্র বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই নাম এতটুকু ম্লান হয়নি। তার সমাধিতে মৃত্যুর সাল হিসেবে ১৪৫৯ উল্লেখ করা হয়েছে।  যা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে বাগেরহাট শহরটি ১৫ শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়। মসজিদের শহর বাগেরহাট সময়ের বির্বতনে বর্তমানে একটি বিলুপ্ত শহরে পরিণত হয়েছে। তবে এখনো এ শহরে বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রয়েছে। যার মধ্যে ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’  অন্যতম। এটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মসজিদ যা মুসলিম বাংলার স্বর্ণযুগের প্রতিনিধিত্ব করে।

১৮৯৫ সাল থেকে বাগেরহাট জেলাটি নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। নিরীক্ষার এই ধারা বয়েই ১৯০৩-০৪ সালে ষাটগম্বুজ মসজিদের পুনরুদ্ধার দৃশ্যমান হয়। ১৯০৭-০৮ সালের মধ্যে ছাদের ওপর ২৮টি গম্বুজ  পুনরুদ্ধার করা হয়।  এরপর ১৯৮২-৮৩ সালে ইউনেস্কো বাগেরহাট এলাকার জন্য একটি বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৫ সালে একে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য স্থান ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের ৩টি ‘বিশ্ব ঐতিহ্যেবাহী স্থানের’ মধ্যে ষাটগম্বুজ একটি। বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত বাগেরহাটের ঠাকুরদিঘি নামে  একটি স্বাদু পানির জলাশয়ের পূর্ব তীরে রয়েছে  ষাটগম্বুজ মসজিদ। এটি মূলত খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের  সুন্দরঘোনা, বাগেরহাট সদর থানায় অবস্থিত।

আয়তকার মসজিদটির অধিকাংশ টেরাকোটা এবং ইট দ্বারা সজ্জিত। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। তাই এটি কে এবং কোন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে এটি ১৫শ শতাব্দীতে খান জাহান আলী তৈরি করেছিলেন এবং পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। কারণ তুঘলকি ও জৈনপুরী নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট। মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণ বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা। পূর্ব পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভেতরের দিকে ৮৮ ফুট চওড়া।

মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় ৮.৫ ফুট পুরু। ষাটগম্বুজ নামে পরিচিত হলেও মসজিদটিতে মোট গম্বুজ রয়েছে ৮১টি।  ৬০টি পাথরের ওপর ভর করে সাত লাইনে ১১টি করে ৭৭টি এবং চার কোণায় ৪টি করে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে।

মসজিদের ভেতরের পূর্ব দেওয়ালে ১১টি এবং উত্তর দক্ষিণ দেয়ালে ৭টি বিরাট  আকারের খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে। মাঝের দরজাটি অন্যগুলো থেকে বড়।

মসজিদের চার কোণায় ৪টি মিনার আছে। যেগুলোর নকশা গোলাকার এবং ওপরের দিকে সরু হয়ে গেছে। এদের কার্নিশের কাছে বলয়াকার ব্যান্ড ও চূড়ায় গোলাকার ব্যান্ড আছে। মিনারগুলোর উচ্চতা ছাদের কার্নিশের চেয়ে বেশি। সামনের দুটি মিনারে প্যাঁচানো সিঁড়ি আছে এবং এখান থেকেই আজান দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। পশ্চিম দেওয়ালে ১১টি ‘মিরবাব’ আছে। যাতে পাথর ও টেরাকোটার কারুকার্য করা। তবে মেঝেটি ইটের তৈরি। দেয়াল এবং মিরহাবগুলো সালফেট দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। যার অধিকাংশ ক্ষতি সংস্কার করা হয়েছে। ষাটগম্বুজ মসজিদের বর্তমান ইমাম মুজিবুর রহমান। যিনি ৪০ বছর যাবৎ ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন। ষাটগম্বুজ নামকরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, মূলত এটির নাম ছিল ছাদগম্বুজ। কালের বিবর্তনে লোকমুখে এটি ছাদগম্বুজ থেকে ষাটগম্বুজ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। তবে, ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সাতটি সারিবদ্ধ গম্বুজ আছে বলে এ মসজিদের নাম সাত গম্বুজ থেকে ষাট গম্বুজ হয়েছে। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন,  গম্বুজগুলো ৬০টি প্রস্তর নির্মিত স্তম্ভের ওপর অবস্থিত বলেই নাম ষাটগম্বুজ। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত যে খান জাহান আলী এই মসজিদে বসেই ইসলাম প্রচার, নামাজ কায়েম, যুদ্ধের পরিকল্পনা ও বিভিন্ন বিচার সালিসি কার্যক্রম সম্পাদন করতেন। এককথায়  এটি খানজাহান বৈঠকখানা ছিল এবং এই মসজিদটি বহু বছর ধরে বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল।

১৭,২৮০ স্কয়ার ফিটের ওপর অবস্থিত এই মসজিদটির চারপাশ ফুল দ্বারা সুসজ্জিত। মেইন গেটের ঠিক ডানপাশে অবস্থিত বাগেরহাট জাদুঘর।  এছাড়াও মসজিদটির পেছনে রয়েছে ঘোড়াদিঘি ও সবুজ গাছপালায় ঘেরা মনোরম শান্ত ও দৃষ্টিনন্দন  পরিবেশ। দিঘির পশ্চিমে দর্শনার্থীদের বসার জায়গা রয়েছে। যা পর্যটক এবং সাধারণ মানুষকে দূর থেকেই ভেতরে প্রবেশের জন্য আকৃষ্ট করে।

লেখক: শাহীনা নদী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads