• রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯
পাহাড় সমুদ্রের টানে

সংগৃহীত ছবি

ভ্রমণ

পাহাড় সমুদ্রের টানে

  • ফিচার ডেস্ক
  • প্রকাশিত ০৫ জুন ২০২২

মিথু হোসাইন

ইটপাথরের শহরে থাকতে থাকতে জীবন কেমন একগুঁয়ে হয়ে যাচ্ছিল, ভাবছিলাম এই যান্ত্রিকতা থেকে দূরে কোথাও যেতে পারলে প্রশান্তি পাবো। সেই সুযোগ এনে দিলো বান্ধবী জান্নাতুন ফেরদৌসি বৃষ্টির সীতাকুণ্ডে ট্র্যাকিং করার প্ল্যানে। জানালো একটা ট্রাভেল গ্রুপের সাথে সীতাকুণ্ড ভ্রমণের পরিকল্পনা। সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম।

চারদিকে সবুজ, ছোট বড় পাহাড়, সারি সারি গাছ, পাখিদের মধুর কণ্ঠে কিচিরমিচির, সাথে সমুদ্রের গর্জন ভাবতেই কল্পনায় হারিয়ে গেলাম। রাত তখন ১১টা বেজে ৩৫, আমরা রওয়ানা হই সীতাকুণ্ডের উদ্দেশে, আমাদের যাত্রা শুরু হয় কলাবাগান থেকে।  বাসের মধ্যে গানের আসর জমিয়ে ভ্রমণ আরো আনন্দময় করলেন গ্রুপের সদস্যরা। ভোর ৫টার দিকে পৌঁছে যাই সীতাকুণ্ড বাসস্টেশনে। বাস থেকে নেমে আমরা কয়েক মিনিট হেঁটে সরাসরি সীতাকুণ্ড বাজারে একটা হোটেলে নাস্তা করি। তারপর সিএনজি দিয়ে আমরা গুলিয়াখালি  এর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে হারিয়ে যাচ্ছিলাম আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা ধরে পাখিদের চমৎকার শব্দে সত্যিই অন্য রকম লাগছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাই গুলিয়াখালি। এতো সবুজ চারদিকে স্নিগ্ধ বাতাস। সমুদ্রে কখনো জোয়ার কখনো ভাটা অপরূপ সৌন্দর্য মুগ্ধ করে আমাদের সবাইকে। এবার আমরা যাত্রা শুরু করি চন্দ্রনাথ পাহাড় জয় করার উদ্দেশ্যে।  সবার  মনেই আনন্দ ভরপুর কারণ আমরা চন্দ্রনাথ পাহাড় জয় করতে যাচ্ছি। একটা বিষয় খেয়াল করলাম অনেক পর্যটকরা পাহাড়ের পরিবেশ নষ্ট করে ফেলছে! তারা খাবার খেয়ে খালি প্যাকেট, চিপসের খোসা, বা বোতল ফেলে পাহাড়ের রাস্তাগুলো নোংরা করে ফেলছে।  আমরা যদিও এই ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলাম। সবারই সচেতন থাকা উচিত। রিভেঞ্জ অফ নেচার বলে একটা শব্দ আছে প্রকৃতি আমাদের তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেয়। তাহলে আমরা কেনো প্রকৃতির যত্ন নিবো না। আমি এবং আমরা সবাই খুবই উত্তেজিত চন্দ্রনাথ পাহাড় জয় করার জন্য। আমি মনে হয় একটু বেশই উত্তেজিত ছিলাম বার বার বৃষ্টিকে বলছিলাম আর কত উপরে উঠবো।

আমার প্রথম পাহাড়ের সাথে মিতালী হবে ভাবতেই আনন্দ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছিল। আমি তো খুব ছোটবেলায় বইতে টিভিতে পাহাড় দেখেছি।

প্রাকৃতির মাঝে মনপ্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়া কল্পনার অনুভূতি আর কিছুক্ষণ পর পূরণ হচ্ছে ভাবতেই মন নেচে উঠছে। মনের আনন্দে গান গেয়ে যাচ্ছি। আমরা খানিকটা আসার পর ক্লান্তি দূর করতে লেবুর শরবত খাই। কিছুক্ষণেই ক্লান্তি হারিয়ে যায় প্রকৃতির সৌন্দর্যের রূপে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তা ২টা।  একটা আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু মাটির পথ অন্যটা খাড়াখাড়া সিড়ির পথ। তবে বা দিকের মাটির পথে যাওয়াই ভালো।

আমরা সবাই একটা করে লাঠি নিয়েছি।  লাঠিটা আমাদের খুব সাহায্য করেছে পাহাড়ে উঠতে। বৃষ্টির সময় পাহাড়ে উঠা বিপজ্জনক। পা পিছলে পড়ে গেলে বিপদ। এমন কী বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

তাই খুব সাবধানতা অবলম্বন করাই ভালো। আমি শুধু একটা ভয় পাচ্ছিলাম সেটা হচ্ছে সাপের। আমি সাপ ভীষণ ভয় পাই। কিন্তু এসব কিছু দেখিনি সুন্দরভাবে উঠেছি।  চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উচ্চতা ১১৫২ ফুট।  এতোটা পথ হাঁটার পরও ক্লান্ত হয়নি কারণ আমার ইচ্ছা ধৈর্যশক্তি সবটা আমাকে প্রবল বাড়িয়ে দিয়েছিল চন্দ্রনাথ পাহাড় জয়ের নেশাটা। আমি দেখেছি কিছু বিদেশি পর্যটকরাও চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উদ্দেশে হাঁটছে। হাজারও  পর্যটক যাচ্ছিল চন্দ্রনাথ জয়ের উদ্দেশে।

একদল ছেলে তারাও হয়তো কোনো গ্রুপ করে বন্ধুরা মিলে পাহাড়ে যাচ্ছিল গলা ছেড়ে গান ধরে...যাচ্ছি ছুটে বহুদূরে জেনো পৃথিবী ছেড়ে....

পাহাড়ে পানি শরবত এর ছোট ছোট খাবার দোকানগুলো রয়েছে। দাম একটু বেশি হলেও শান্তিটা দরকার। ছোট ছোট ঝরনা পেয়েছিলাম আমরা পাহাড়ে উঠার সময়। আমরা ঝরনায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি।

হাঁটছি তো হাঁটছি আর ভাবছিলাম এই বুঝি পাহাড়ে চূড়ায় পৌঁছে যাবো। আমাদের গ্রুপের সবাই, সবাইকে বলছিলাম আর কিছুক্ষণ হাঁটলেই হয় তো পাহাড় দেখতে পাবো। পাহাড়টা সবুজঘেরা চারদিকে সবুজের সমাহার। মন চোখ জুড়িয়ে যায়। যখন আমরা অনেকটা পথ হাঁটার পর একটু খানি পাহাড় দেখতে পাই মনের ভিতরে একটা অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হতে শুরু করলো!

২ ঘণ্টা হাঁটার পর অবশেষে আমরা ‘চন্দ্রনাথ পাহাড়’ জয় করলাম! যাত্রার দীর্ঘ ক্লান্তি যেন নিমিষেই হারিয়ে গেল। যখন আমরা পাহাড়ের চূড়োয় উঠলাম, এ এক অন্যরকম সৌন্দর্যের হাতছানি চতুর্দিকে পৃথিবীটা এমন অদ্ভুত সুন্দর, অনুভূতিগুলো আসলে ব্যক্ত করার ক্ষমতায় আমার নাই। পাহাড়ের ওপরে স্নিগ্ধ বাতাস, সবুজের ক্যানভাস আহা কী সুন্দর! খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে  একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়েছিলাম সব ক্লান্তিকে দূর করতে।

প্রকৃতির এমন মায়া যেন আমারে দিলো নতুন এক জীবনের অভিজ্ঞাতা। যেই অভিজ্ঞাতা কেবল সুন্দরের।

 শান্তি জিনিস কী, ফিল করতে পারবেন! একপাশে বিশাল এক সমুদ্র, অন্য পাশে সবুজের সমারোহে ঘেরা উঁচুনিচু পাহাড়। আকাশের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল মেঘগুলো ছুটাছুটি করছে। আমার জীবনে সব থেকে সুন্দর অনুভূতি ছিল এই  চন্দ্রনাথ পাহাড় জয়। আমরা যেহেতু দুপুর দিকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গিয়েছি সময় কম ছিল। আমার ইচ্ছা করছিল আমি কায়েক ঘণ্টা একা একা পাহাড়ের কোনো এক কোণায় বসে থাকি। রোদ ছিল কিন্তু এতো সবুজ চারদিকে এতো গাছ আর মৃদু বাতাস। আমার কাছে এরচেয়ে খুশির মুহূর্ত কিছু ছিল না তখন, যেন আমি স্বর্গীয় কোনো জায়গায় অবস্থান করছি, আমার কোনো দুঃখ বিষাদ কিছু নেই, আমিই পৃথিবীর একমাত্র সুখী মানুষ। মহান আল্লাহ যে এতো সুন্দর রূপ প্রকৃতিকে দিয়েছেন মাশাল্লাহ! সবুজের ক্যানভাসে আঁকা যেন এক চমৎকার শিল্প, এঁকে রেখেছে কোনো এক মহান শিল্পী রঙ তুলিতে। আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম প্রকৃতির মাঝে! আমরা তখন নেটওয়ার্কের বাইরে, ভাবলাম একটা শান্ত নিবিড় পরিবেশ খুঁজে প্রকৃতির আরেকটু সান্নিধ্যে যাই। কানে হ্যাডফোন গুঁজে দিলাম, ‘এমন যদি হতো আমি পাখির মতো...’ বাজতে বাজতে মনে হলো যেন আমিই সেই পাখি, যে একটা জীবন কেবল স্বপ্নই দেখেছে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াবার। এই সময়টা, ঠিক এই সময়টাই বোধহয় আমি মুক্তির স্বাদ নিলাম।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads