• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে অপমান হতাশা চাপ

অরিত্রী আত্মহত্যার ঘটনায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে গতকাল তৃতীয় দিনের মতো শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

ছবি : বাংলাদেশের খবর

শিক্ষা

নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশি ঘটছে

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে অপমান হতাশা চাপ

  • অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
  • প্রকাশিত ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছাত্রী আত্মহননের ঘটনা নতুন নয়। সর্বশেষ সোমবার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর (১৫) জীবন বিসর্জনের ক্ষোভে উত্তাল ওই প্রতিষ্ঠান। ওই ঘটনার পর শিক্ষকদের দুর্ব্যবহার ও নানা অনিয়মের বিষয়টি আবার সামনে চলে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা পড়তে এসে প্রাণ দিচ্ছে কেন?

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, অখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর কম আসে। তাহলে কি নামিদামি প্রতিষ্ঠানে রেজাল্টের জন্য বেশি চাপ দেওয়া হয়?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষকরা বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে বাধা দেওয়ায় ২০১২ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করে নবম শ্রেণির ছাত্রী চৈতী রায়। ‘তোর কী এমন মেধা আছে? তুই তো গাধা। তুই বিজ্ঞানে কীভাবে পড়বি?’- শিক্ষকদের এমন রূঢ় মন্তব্যে তীব্র অভিমান বুকে নিয়ে ঘুমের বড়ি খেয়ে না ফেরার দেশে চলে যায় সে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ রায়ের মেয়ে চৈতি ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকেই জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৬০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল। তার ইচ্ছা ছিল নবম শ্রেণিতে উঠে সে বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে। ভবিষ্যতে ডাক্তার হবে। তবে তার সে ইচ্ছায় বাদ সাধেন শিক্ষকরা। তাকে পড়তে বাধ্য করা হয় ব্যবসায় শিক্ষা, যা সে মেনে নিতে পারেনি।

কয়েক মাস আগে রাজধানীর আরেকটি নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী ইতিকা চারতলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করে। পরীক্ষার উত্তরপত্রে ঘষামাজা সংক্রান্ত বিষয়ে তাকে শিক্ষক বকাঝকা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন। আত্মহত্যার ঘটনাটি ধামাচাপা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নির্যাতনের কারণে কয়েক দিন আগে এক অভিভাবক তার সন্তানকে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি করেন।

নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তুচ্ছ কারণে শিক্ষার্থী এমনকি শিক্ষকও প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছেন। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৯ জন আত্মহত্যা করছে। এদের মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীর সংখ্যাই বেশি। গত চার বছরে এ সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৭ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। চলতি বছরের ১১ মাসে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যা করেছে ৯ শিক্ষার্থী। শুধু গত ১২ থেকে ১৬ নভেম্বরের মধ্যেই আত্মহত্যা করেছে ৩ জন। শিশু অধিকার ফোরাম নামে একটি এনজিও বলেছে, ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৯৭০টি শিশু আত্মহত্যা করেছে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ২১৩, ২০১৬ সালে ১৪৯। আর ২০১৮ সালের প্রথম চার মাসে ১১০টি শিশু আত্মহত্যা করেছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পড়াশোনায় মাত্রাতিরিক্ত চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া, আত্মমর্যাদায় আঘাত, আর্থসামাজিক পরিবেশ, শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি সঙ্কট, পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা, ঠুনকো আবেগ, ব্যক্তিজীবনে হতাশা, দুশ্চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের অভাবে শাির্থীদের মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বকা, বেকারত্ব ও প্রেমঘটিত কারণে শিক্ষার্থীরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নগর সভ্যতায় শিশুরা একা হয়ে পড়ছে, এতে জমছে হতাশা। এ ছাড়া মা-বাবার অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা শিশুদের আত্মহত্যার একটা বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।

চিকিৎসকদের ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন ‘প্লাটফর্ম’-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে মেডিকেল কলেজের পাঁচ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এ পরিস্থিতিতে সবাইকে আরো সহনশীল ও দায়িত্বশীল হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আত্মহত্যাকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা রোধে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে সরকারকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী বলেন, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এরই মধ্যে সেমিনার করেছি। হল এবং বিভাগে হতাশাগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার ও বন্ধুদের সমন্বয়ে আমরা আত্মবিনাশী পথ থেকে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে পারব। এজন্য সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।

শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা এনজিও ‘শিশু অধিকার ফোরাম’র তথ্য মতে, ২০১৬-এর তুলনায় ২০১৭ সালে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, পরীক্ষার ফল মনঃপূত না হওয়া এবং শিক্ষকদের বকাঝকাই এর মূল কারণ। গত ৬ মে এসএসসির রেজাল্ট হওয়ার পর ১৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

কেন শিশুদের মধ্যে এমন প্রবণতা বাড়ছে- এ প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং গবেষক তৌহিদুল হক বলেন, মাত্রাতিরিক্ত পড়াশোনা এবং সর্বোচ্চ ফলের প্রত্যাশার কারণে তাদের মানসিক চাপ বেড়ে যায় এবং এই চাপ থেকে তারা মুক্তি চায় এভাবে। তিনি বলেন, আমাদের স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের আন্তরিকতার ঘাটতি দেখা যায়। অভিভাবকদের মাত্রাতিরিক্ত প্রত্যাশা শিশুদের প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। এ ছাড়া স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের মনমানসিকতা পর্যালোচনার কাঠামো তৈরিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

রাজধানীর একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধান শিক্ষক বলেছেন, আত্মহত্যার জন্য শিক্ষকদের যতটা দায়ী করা হচ্ছে ততটা দায়ী শিক্ষকরা নন। কারণ প্রতিষ্ঠান থেকে চাপ থাকে ভালো রেজাল্টের। অভিভাবকরাও বলতে থাকেন, কেন বাচ্চারা ভালো রেজাল্ট করছে না? এই চাপের কারণে আমরা শিক্ষার্থীদেরকে বলতে বাধ্য হই, তোমরা ভালো রেজাল্ট কর, কিন্তু তাদের বলি না তোমরা ভালো মানুষ হও।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যে, বিশ্বে প্রতিবছর ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। ১৫-২৯ বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে। প্রতি একজনের আত্মহত্যা অপর প্রায় ২৫ জনকে একই প্রবণতার দিকে ঠেলে দেয়। আত্মহত্যা প্রতিরোধের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। উন্নত দেশগুলোতে ৯৫ ভাগ আত্মহত্যা মডেলিংয়ে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার আকাঙ্ক্ষার কারণে হয়, অনুন্নত দেশগুলোতে এ হার মাত্র ৮ ভাগ। ২০১৬ সালের তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, ৭৯ ভাগ আত্মহত্যা মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে হয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল  ইসলাম বলেন, আত্মহত্যা দুই ধরনের হয়। পরিকল্পিত ও আবেগতাড়িত। সাধারণত টিনএজ গ্রুপই আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা করে। এই বয়সে আবেগ বেশি থাকে, ক্রোধ থাকে, অল্পতেই হতাশা গ্রাস করে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের মেয়েটির হয়তো স্কুলে পড়ার চাপ ছিল। এ কারণে সে নকলের আশ্রয় নিতে পারে। এরপর তার মা-বাবাকে ডেকে নিয়ে শিক্ষক বকাঝকা করেছেন। এটা তো তার জন্য একটা বড় ধরনের অপমান। আবার তাকে বলা হয়েছে, তোমাকে টিসি (ছাড়পত্র) দেওয়া হবে। সে মনে করেছে, টিসি দেওয়া মানে জীবনের সব শেষ। এ অপমান, হতাশা, চাপ সে আর নিতে পারেনি।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads