• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
জাতীয় ঐক্যের সম্ভাবনা কতটুকু

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, মানুষের মনে উদ্বেগ ও শঙ্কা ততই বাড়ছে

আর্ট : রাকিব

মতামত

জাতীয় ঐক্যের সম্ভাবনা কতটুকু

  • মহিউদ্দিন খান মোহন
  • প্রকাশিত ২৬ আগস্ট ২০১৮

জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই রাজনৈতিক অঙ্গনে পোলারাইজেশন শুরু হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নতুন হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, সব গণতান্ত্রিক দেশেই ঘটে থাকে। নির্বাচনে জয়লাভ এবং পরবর্তী সময়ে সরকারে যাওয়ার লক্ষ্যে দলগুলো একদিকে নিজেদের ঘর গোছানো, অন্যদিকে মিত্রের সংখ্যা বাড়িয়ে ফলাফল নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা অস্বাভাবিক কিংবা অভিনব কিছু নয়। বরং রাজনীতির ময়দানে খেলার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

আমাদের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সমাগত প্রায়। কম-বেশি মাস পাঁচেক বাকি আছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ অথবা আগামী বছরের জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, মানুষের মনে উদ্বেগ ও শঙ্কা ততই বাড়ছে। নির্বাচন সঠিক সময়ে হবে কি-না, এই সরকারের অধীনে, নাকি বিএনপির দাবি অনুযায়ী নির্দলীয় সরকারের অধীনে হবে, তা নিয়ে অনেকেই সংশয়ে আছেন। বিএনপি অনেক আগে থেকেই নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানিয়ে এলেও ক্ষমতাসীন সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রীরা বলে আসছেন, বর্তমান সংবিধানে বর্ণিত রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী নির্বাচন হবে। আর এ বিষয়ে তারা বিরোধী দল তথা বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না। ফলে দেশবাসীর মনে শঙ্কা জেগেছে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশ পুনরায় অরাজকতার কবলে পড়ে কি-না।

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপায় খুঁজে বের করার জন্য আলোচনায় বসতে সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে আহ্বান জানিয়ে আসছে বিএনপি। কিন্তু সরকারপক্ষ সে আহ্বানে সাড়া না দিয়ে নাকচ করে দিচ্ছে। এখানে লক্ষণীয় হলো, সাধারণত এ ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারই বিরোধী দলকে আলোচনায় বসতে আহ্বান জানিয়ে থাকে। কিন্তু এবারই ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বিরোধী দলই আলোচনা-সংলাপের আহ্বান জানিয়ে চলেছে, আর সরকার তা নাকচ করে দিচ্ছে। এর কারণ অবোধ্য নয়। সাংবিধানিক বিধান এবং সাংগঠনিক শক্তির কারণে সরকার এ মুহূর্তে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। তারা ধরেই নিয়েছে যে, তারা যদি স্বেচ্ছায় বিএনপির দাবি মেনে না নেয়, তাহলে বিএনপির পক্ষে তা আদায় করা সম্ভব হবে না। বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাই যে ক্ষমতাসীনদের এ আত্মবিশ্বাসের মূল কারণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিগত প্রায় দশ বছরের ঘটনাবলি তাদের মনে এ ধারণা জন্ম দিয়েছে। তারা মনে করেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি বিএনপির নেই। এজন্যই সরকার বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপের প্রয়োজন বোধ করছে না।

অপরদিকে, বিএনপি বলে আসছে, তাদের নেত্রীর মুক্তি, তাকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া এবং নির্দলীয় সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। প্রয়োজনে এসব দাবি আদায়ের জন্য জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তারা ‘দুর্বার গণআন্দোলন’ গড়ে তুলবেন। আর সরকারপক্ষ বলছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া বিএনপির একান্ত দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সরকার কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নেবে না। যদিও সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি মন্তব্য নির্বাচনের আগে সংলাপের দুয়ার খুলে যেতে পারে- এমন আবহ সৃষ্টি করেছিল।

তিনি বলেছিলেন, সংলাপ না হলেও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হতে পারে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের এ উক্তি যে বিএনপিকে অতিমাত্রায় উৎসাহী ও আশাবাদী করে তুলেছিল, তাদের প্রতিক্রিয়া থেকেই তা অনুমান করা গেছে। কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্য যে নিছক কথার কথা, তা পরবর্তী সময়ে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্পষ্টই বলে দিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না।

এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি তাদের মিত্রের সংখ্যা বাড়িয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ের চেষ্টায় রত হয়েছেন তারা। এ লক্ষ্যে ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা বেশকিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তারা প্রাথমিক আলোচনাও করেছেন। এসব দলের মধ্যে রয়েছে- সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা বাংলাদেশ, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি এবং বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।

উল্লেখ্য, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম ও কাদের সিদ্দিকীর দল ছাড়া বাকি তিনটি দল ইতোমধ্যেই যুক্তফ্রন্ট নামে একটি জোট গঠন করেছে। বিএনপি চাচ্ছে যুক্তফ্রন্ট, গণফোরাম ও কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর নির্বাচনী মোর্চা গড়ে তুলতে। বিএনপির এ প্রয়াস কতটা সফল হবে এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ বৃহত্তর মোর্চায় যেতে কাদের সিদ্দিকী যে শর্ত আরোপ করেছেন, তা পূরণ করা বিএনপির জন্য খুবই কঠিন। মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী স্পষ্টই বলে দিয়েছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে একই জোটে তিনি বা তার দল যাবে না। বিএনপির জন্য এটি একটি কঠিন সমস্যা। প্রস্তাবিত জাতীয় ঐক্য গড়তে গিয়ে তারা তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতকে বিসর্জন দেবে কি-না, দিলেও তাতে লাভ-ক্ষতির পরিমাণ কেমন হবে- সে হিসাব কষে নিতে হবে। জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে জামায়াতের যে ভোট বিএনপির পক্ষে যাবে, সে তুলনায় কাদের সিদ্দিকীর দলের ভোট একেবারেই নগণ্য।

গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর গণফোরাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে সমাবেশের উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো একমঞ্চে উঠবে। ওই সমাবেশ থেকে জাতীয় ঐক্যের সূচনা করার ইচ্ছা রয়েছে সরকারবিরোধী প্রধান দল বিএনপির। অনেকে মনে করেন, তার সূত্রপাত ঘটেছে গত ৬ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজে’র সংহতি সমাবেশে। ওই সমাবেশে বিএনপি, গণফোরাম, বিকল্পধারা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। তারা সবাই প্রায় একই সুরে কথা বলেছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের অনুষ্ঠানে সরকারবিরোধী পাঁচ দলের নেতাদের অংশগ্রহণ ও একই সুরে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাকে বৃহত্তর জোট গঠনের ড্রেস রিহার্সেল বলে মনে করছেন। তাদের মতে, বিএনপি সরকারবিরোধী যে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তুলতে চাচ্ছে, উল্লেখিত সমাবেশটি তারই পূর্বাভাস। তবে ওই সমাবেশে কাদের সিদ্দিকী এবং জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়নি। তাদের এ অনুপস্থিতি জাতীয় ঐক্য গঠনের পথে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এটা পরিষ্কার যে, জামায়াতে ইসলামীকে রাখা হলে সে জোটে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী কোনোভাবেই সম্পৃক্ত হবেন না। ফলে যে জাতীয় ঐক্যের কথা বিএনপি বলে আসছে, তা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হবে কি-না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এদিকে বিএনপি অক্টোবর মাসকে টার্গেট করে আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে বলে সংবাদমাধমে খবর বেরিয়েছে। গত ১১ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন- এই দুই ইস্যুতে আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে বিএনপি। অক্টোবরে যেহেতু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে, তাই ওই মাসেই দাবি আদায়ে পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। আগামী ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় যে সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, সেখান থেকেই বৃহত্তর জোট গঠন ও চূড়ান্ত আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।

অপরদিকে গত ১৬ আগস্টের বাংলাদেশের খবর-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য নির্বাচনকালীন সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। তারা স্বল্প সময়ের আন্দোলনে ‘ছোট কলেবরে’র ওই সরকারকে গদি থেকে নামানোর পরিকল্পনা করছে। অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কিছুটা ছোট আকারের মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে। এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পত্রিকাটিকে বলেছেন, ‘জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য ২০ দলীয় জোট বার বার সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসছে। সরকার এতে সাড়া না দিলে দাবি আদায়ে রাজপথে নামা ছাড়া আর বিকল্প থাকবে না।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের সাম্প্রতিক নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সফলতা বিএনপিকে অনেকটাই আশাবাদী করে তুলেছে। তারা মনে করছেন, জনগণকে নিয়ে মাঠে নামতে পারলে সে আন্দোলন সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু বিএনপির আহ্বানে জনগণ কতটা সাড়া দেবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেখানে দলের নেতাকর্মীরাই মাঠে নামে না, সেখানে সাধারণ মানুষ কেন মাঠে নামবে? আর দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করার মতো আন্দোলন বিএনপি আদৌ গড়ে তুলতে পারবে কি-না, তা নিয়েও কম-বেশি সবারই সংশয় রয়েছে।

তা ছাড়া ২০ দলীয় জোটে বিএনপির বাইরে একমাত্র জামায়াতে ইসলামীর দেশব্যাপী সাংগঠনিক বিস্তার রয়েছে। বাকি দলগুলোর বেশিরভাগই ‘এক নেতা এক দল’ ধরনের। কোনোটির আবার পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটিও নেই। ফলে আন্দোলন বা নির্বাচনে ওই সাইনবোর্ড সর্বস্ব দলগুলো কোনো গুরুত্ব বহন করে না। এখন আবার যাদের নিয়ে বিএনপি ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তুলতে চাচ্ছে, তাদের অবস্থাও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। দলগুলোর এক বা দুজন শীর্ষনেতা জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হলেও তৃণমূল পর্যায়ে তাদের কোনো ভিত্তি নেই। ফলে এদের নিয়ে জোটের পরিধি বাড়ালে তা মৌখিক ‘জাতীয় ঐক্য’ হয়তো হবে, তবে কার্যক্ষেত্রে তা কতটুকু কাজে আসবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর মধ্যে আবার বিকল্পধারার যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী বৃহত্তর জোট হলে যুক্তফ্রন্টের জন্য দেড়শ আসন দাবি করে গোড়াতেই খটকা লাগিয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে বি. চৌধুরী ও মাহী চৌধুরীর বিএনপিবিরোধী তৎপরতায় অনেকেই ক্ষুব্ধ। তারা এদের সঙ্গে জোট গঠনের প্রবল বিরোধী।

এ পরিস্থিতিতে বিএনপি সমমনা দলগুলোকে নিয়ে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ নামে যে শিশুটির জন্ম দিতে চাচ্ছে, তা আদৌ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে, নাকি আঁতুড়ঘরেই মুখ থুবড়ে পড়বে- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads