• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
ঈদের ছুটিতে গাঁয়ের পথে

এখন আর সন্ধ্যা হলেই নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায় না গ্রামগুলো

আর্ট : রাকিব

মতামত

ঈদের ছুটিতে গাঁয়ের পথে

  • মহিউদ্দিন খান মোহন
  • প্রকাশিত ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

দুই ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে যে পরিমাণ মানুষ গ্রামে চলে যায়, বিশ্বের আর কোনো দেশে কোনো বিশেষ উৎসব উপলক্ষে এমনটি ঘটে কি না আমার অন্তত জানা নেই। অনেকের মতে, প্রতি ঈদে কম করে হলেও পঞ্চাশ লাখ লোক রাজধানী ছেড়ে গ্রামে যায় স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে। অনেকেই নানা ব্যস্ততার জন্য গ্রামে গিয়ে দু’চার-দশ দিন থাকতে পারেন না। সারা বছর জীবিকা নির্বাহের তাগিদে স্ত্রী-সন্তানসহ শহরে বাস করেন। গ্রামে গিয়ে স্বজনদের খোঁজখবর নিতে পারেন না, দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। নিকটজনদের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে মন আকুলিবিকুলি করলেও বাস্তবতার কারণেই তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ঈদ এলেই সে সুযোগ সৃষ্টি হয়। পরিবার নিয়ে সবাই গ্রামের দিকে যাত্রা  করেন। সবাই যে যেতে পারেন তা অবশ্য নয়। তবে সুযোগ পেলে এবং কঠিন কোনো অসুবিধা না থাকলে কেউই এ সুযোগ হেলায় হারাতে চান না। আর সে জন্যই ঈদের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই শহর ফাঁকা হতে থাকে। গ্রামমুখী যানবাহনে দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়। বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার বোঝাই হয়ে সবাই ছুটতে থাকে যার যার আপন ঠিকানায়। যার ফলে গ্রামমুখী এসব যানবাহনে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। যখন ঘোষণা আসে ঈদের লঞ্চ, স্টিমার, ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রির, তখন থেকেই শুরু হয় প্রতিযোগিতা। কে কাকে পেছনে ফেলে বাড়ি যাওয়ার কাঙ্ক্ষিত টিকেটটি আগে সংগ্রহ করবে, তার প্রতিযোগিতা চলে। টিকেটটি হাতে পাওয়ার পর প্রশান্তির হাসি হাসতে দেখা যায় অনেককে। তারপর রাস্তার সীমাহীন দুর্ভোগকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সবাই ছোটেন যার যার গন্তব্যে। শহরবাসী মানুষের ঈদ উপলক্ষে এই যে গ্রামে ছুটে যাওয়া, এটাকে আমার কাছে ভিন্ন মাত্রার এক অভিব্যক্তি বলেই মনে হয়। এ তো শুধু স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির বিষয় নয়, এর মধ্যে নিহিত আছে মানুষের জন্মস্থানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়, যাকে বলে নাড়ির টান। শহরের কর্মব্যস্ততায় আমাদের জীবন হয়ে ওঠে একঘেয়ে, অনেকটা যান্ত্রিক। প্রাণ খুলে দু’দণ্ড কথা বলার ফুরসৎ কারো নেই। নাগরিক জীবনের এ একঘেয়েমি থেকে কয়েক দিনের মুক্তির জন্য তাই আমরা মুখিয়ে থাকি। আর সে কাঙ্ক্ষিত সুযোগটি এলে কেউ তা হাতছাড়া করতে চাই না।

এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে গ্রামে কাটিয়ে এসেছি পাঁচ দিন। যদিও আমার গ্রাম ঢাকা থেকে খুব দূরে নয়, জিরো পয়েন্ট থেকে কম-বেশি একত্রিশ-বত্রিশ কিলোমিটার। মাসে এক-দু’বার যে যাওয়া হয় না তাও নয়। তবে ঈদ উপলক্ষে যাওয়া আর সে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য অনেক। ঈদ এলেই সারা বছরের ঘুমন্ত গ্রামগুলো যেন জেগে ওঠে। বাড়িতে বাড়িতে লোক সমাগম বাড়ে। শহরের ইট-কাঠের খাঁচায় বন্দি শিশুরা এখানে এসে হয়ে যায় মুক্তবিহঙ্গ। ওদের সে আনন্দ উচ্ছলতা দেখলে নিজের ছেলেবেলার মধুর স্মৃতি মনের পর্দায় ভেসে ওঠে।

গ্রামে যে ক’দিন ছিলাম সকাল-বিকাল দেখা হয়েছে নানাজনের সঙ্গে। সারা বছর যাদের সঙ্গে দেখা হয় না, কথা হয় না, যোগাযোগ থাকে না, তাদের সঙ্গেও এই একটা উৎসব উপলক্ষে দেখা হয়ে যায়। আর সত্যি বলতে কি, প্রতি ঈদে আমার বাড়ি যাওয়ার পেছনে এটা একটি বড় কারণ। ছেলেবেলার খেলার সাথীদের সঙ্গে ক’টা দিন কাটাতে বেশ ভালোই লাগে।

অনেক পরিবর্তন এসেছে গ্রামীণ জীবনে। এখন আর সন্ধ্যা হলেই নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায় না গ্রামগুলো। অনেক রাত অবধি জেগে থাকে। আমাদের গ্রামের মাথায় যে বাসস্ট্যান্ড, ওটাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে ছোটখাটো একটি বাজার। রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত সরব থাকে ওটা। এখন আবার চলছে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজ। ফলে জায়গাটি এখন জমজমাট থাকে সারাদিন। ট্রাক, লরি, ভেকু, মাটি টানার ট্রাক, বুলডোজার ইত্যাদির চলাচলে সারাক্ষণ সরগরম এলাকাটি। বিকাল থেকে সেখানে জমে ওঠে জমজমাট আড্ডা। নানা বয়সী ছেলেবুড়ো চায়ের দোকানগুলোতে আসর গুলজার করে। সেসব আসরে যোগ দিয়েছি আমিও।

গল্পগুজবের এক পর্যায়ে রাজনীতি দখল করে নেয় আলোচনার কেন্দ্রটি। গ্রামের মানুষ এখন আর আগের মতো অসচেতন নেই। রাজনীতি সম্বন্ধে তারা এখন বেশ সচেতন। এমনকি কোনো কোনো বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা শুনলে অবাক হতে হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোন বিষয়টি তাদের অজানা? দেশে কী হচ্ছে, কী হতে যাচ্ছে বা কী হতে পারে, তা নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনার কথা জানা যায় আলাপ করলেই। তারপরও যেহেতু রাজধানীতে থাকি, রাজনীতি নিয়ে ভাবি, তাই তাদের ধারণা আমিই তাদের আসল খবরটি দিতে পারব। যতই বলি, আপনারা এখানে বসে যা জানেন আমি ঢাকায় বসে ততটুকুই জানি, ততই তারা আসল খবর চেপে যাচ্ছি বলে তা জানতে আমাকে চেপে ধরে। অগত্যা রাজনীতি সম্পর্কে তাদের ধারণার বাইরে কিছু ব্যাখ্যা দিয়ে খুশি করতে হয়। তারা জানতে চায় নির্বাচন সময় মতো হবে কি না, বিএনপির দাবি সরকার মানবে কি না, নাকি শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হবে ইত্যাদি। তাদের সঙ্গে কথা বলে যে বিষয়টি আমার ধারণায় এসেছে তাহলো— আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে আবার অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, সে আশঙ্কায় রয়েছে তারা। আবারো সেই লগি-বৈঠা বা পেট্রল বোমার আন্দোলনের কবলে পড়ে জনজীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে কি না সেজন্য তারা উৎকণ্ঠিত। গ্রামের সরল মানুষগুলোর ততোধিক সরল উক্তি হলো, আমাদের ওপর নেতাদের আস্থা নেই কেন? তারা যদি আমাদের জন্য ভালো কাজ করেই থাকেন, তাহলে ভোট তো আমরা তাদেরই দেব। তাদের এ কথার জবাব দিতে পারিনি। আর সে দায়িত্বও আমার নয়। জনগণের এ প্রশ্নের জবাব তো দেবেন তারা, যারা দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক।

জনগণের সে প্রশ্নের জবাব কেউ দিক বা না দিক, গ্রামে যে ইতোমধ্যেই নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তা স্বচক্ষেই দেখতে পেলাম। জনগণ তথা ভোটারদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক নেতাদের ডিজিটাল ব্যানার, ফেস্টুন আর পোস্টারে সয়লাব হয়ে গেছে গ্রামগঞ্জ, হাট-বাজার। রাস্তার মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছে নেতাদের প্রকাণ্ড ছবিসহ বিশাল বিশাল বিলবোর্ড। গাছে গাছে ঝুলছে ফেস্টুন। তাতে লেখা আছে— ‘অমুক ভাইকে এমপি হিসেবে দেখতে চাই’। চায়ের দোকানে চলছে কে কোন দলের মনোনয়ন পাচ্ছে সে আলোচনা। ঈদের পরদিন দেখা গেল এমপি মনোনয়ন প্রার্থীরা এলাকাবাসীর সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে বেরিয়েছেন গাড়ি বহর নিয়ে। বাজারে দোকানে দোকানে গিয়ে করমর্দন করছেন, মুখে হাসি বজায় রেখে করছেন কোলাকুলি, বিনিময় করছেন কুশলাদি। এর মধ্যে আবার একই দলের একাধিক গ্রুপও ছিল। এসব দেখে একজন মন্তব্য করলেন, আহা, নেতারা যদি সারা বছর এমনভাবে আমাদের খোঁজখবর নিতেন!

রাজনীতি ছেড়ে অন্যদিকে যাই। গ্রামের সামাজিক পরিবেশে অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পরিবর্তন এসেছে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও। আমাদের গ্রামের বাসস্ট্যান্ডে সকাল ৭টা-সাড়ে ৭টার মধ্যেই পৌঁছে যায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকা। এদিক দিয়ে রাজধানী ঢাকা আর আমার গ্রাম মাশুরগাঁওয়ের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। আর বিদ্যুৎ এবং ক্যাবল টিভির কল্যাণে বিশ্ব এখন গ্রামের টিনের ঘরে ধরা দিয়েছে। সেখানেও দেখা গেল ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের আগ্রাসন। জিজ্ঞেস করে এমন কম লোকই পেয়েছি, যিনি আমাদের জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভির অনুষ্ঠান দেখেন। এমনকি বেসরকারি চ্যানেলের খবর আর দুয়েকটি টক শো ছাড়া অন্য অনুষ্ঠানের দর্শক খুবই কম। অন্যদিকে ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের শিডিউল প্রায় সবার মুখস্থ, বিশেষ করে মহিলাদের। আমি যখন গ্রামে অবস্থান করছিলাম তখন কোনো কারণে ভারতীয় টিভি চ্যানেল ‘স্টার জলসা’র সিরিয়াল প্রচার বন্ধ ছিল। তা নিয়ে গ্রামের মহিলাদের সে কী উদ্বেগ! কয়েকজন আবার আমার কাছে এর কারণ জানতে চাইল। আমার জবাবে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। বলেছিলাম, ভারতীয় সিরিয়াল না দেখে দেশেরটা দেখুন। ঈদ উপলক্ষে কত ভালো ভালো অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে আমাদের চ্যানেলগুলোতে! সেগুলো দেখুন। মুখে তারা কিছু না বললেও তাদের অভিব্যক্তি দেখে বুঝেছি, আমার কথা তাদের কাছে ‘তিতকরল্লা’র মতোই মনে হয়েছে।

গ্রামে এখন নগরায়ণের ছোঁয়া। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দু’পাশে হাউজিং কোম্পানির বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড। আমিন মোহাম্মদ টাউন, স্বপ্নধরা, দখিনাচল ইত্যাদি সব কোম্পানির সাইনবোর্ড নজরে পড়ল। জানতে পারলাম, কিছু কিছু কোম্পানি একখণ্ড জমি কিনেই ‘স্বপ্নের শহরে’ বাড়ি করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে মানুষকে। কোম্পানিগুলোর লোভনীয় অফারে অনেকেই প্রলুব্ধ যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। অনেকেই আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন এই বলে যে, মহাসড়কের দু’পাশে যেভাবে হাউজিং কোম্পানিগুলো আবাসন প্রকল্প শুরুর ঘোষণা দিয়েছে, তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বিক্রমপুরের এ অঞ্চলে ফসলি জমি অনেকাংশেই কমে যাবে। বিষয়টির প্রতি সরকারের যথাযথ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলেও তারা অভিমত প্রকাশ করলেন। 

এসব কিছুর মধ্যে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেদনাহত ও উদ্বিগ্ন করেছে তাহলো, মাদকের থাবা। হ্যাঁ, সর্বনাশা মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে আমার গ্রামও রক্ষা পায়নি। শুনলাম, হাত বাড়ালেই নাকি এখন সেখানে গাঁজা, ইয়াবা পাওয়া যায়। আর এর অনিবার্য ফলস্বরূপ যুব সমাজের একটি অংশ চলে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে। তাদের ফেরানোর কেউ নেই। পুলিশের জ্ঞাতসারেই চলে মাদকের ব্যবসা। সাধারণ মানুষ কিছু বলতে পারে না। কারণ যারা এসবের নিয়ন্ত্রক, তারা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাদের হাতও নাকি অনেক লম্বা। ফলে কেউ প্রতিবাদী হতে সাহস পান না। চোখের সামনে যুবসমাজের একটি অংশের ক্ষয়ে যাওয়া দেখছেন, আর কিছু না করতে পারার ব্যর্থতায় ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হচ্ছেন।

গ্রামীণ জনপদে পরিবর্তনের যে ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে তা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। শিক্ষাদীক্ষা, ক্রিয়াকর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান, আধুনিক চিন্তা-চেতনায় আমাদের গ্রামীণ সমাজ শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামনে এগোবে, এটা সর্বজন কাম্য। তবে সে পরিবর্তন যাতে ইতিবাচক ধারায় সাধিত হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখা আমাদের সবারই দায়িত্ব।

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads