• সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬
ads

মতামত

কেন এত কোচিং, এত প্রাইভেট

  • আ. ব. ম. রবিউল ইসলাম
  • প্রকাশিত ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আবার আলোচনায় এসেছে বহুল আলোচিত কোচিংবাণিজ্য প্রসঙ্গ। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কোচিংবাণিজ্যকে নতুন ধরনের অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেছেন, ক্লাসরুমে পড়ানোর ব্যর্থতার কারণেই কোচিংবাণিজ্য হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর করার কথা বলেছেন আদালত। আদালতের শুনানিতে বিজ্ঞ আইনজীবীরা বলেছেন, শিক্ষাব্যবস্থায় বৈরী পরিস্থিতি তৈরি করেছে কোচিংব্যবস্থা। কোচিংবাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা ও কোচিংবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে জারি করা রুলের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। শিক্ষায়, ভূমি অফিসে, কাস্টমস, ব্যাংকিং, পুলিশ, চিকিৎসা থেকে শুরু করে সমাজের প্রায় স্তরে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। রাষ্ট্র এগোবে কীভাবে? আমরা কীভাবে বাঁচব।

যেভাবে কোচিংয়ের বিস্তার বাড়ছে তাতে শুধু অভিভাবকরা বিপর্যস্ত হচ্ছেন না, শিক্ষার ভিতও অন্তঃসারশূন্য হচ্ছে। নম্বরভিত্তিক প্রতিযোগিতার ফলে কোচিং সেন্টার নির্দিষ্ট ছকে ফেলে শিক্ষার্থীকে পর্যাপ্ত নম্বর পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে; কিন্তু মেধা ও সৃজনশীলতার পুরো বিষয়ই উপেক্ষিত থাকছে। তারা শিক্ষক পাচ্ছে না, ভালো ফল করার গাইড পাচ্ছে। যারা কিছু কৌশল রপ্ত করাচ্ছেন যা দিয়ে শিক্ষার্থী শিক্ষা বৈতরণী পার করে আসছে। কিন্তু একজন সঠিক মানুষ হওয়ার কলাকৌশল সে কতটা রপ্ত করল তা যাচাইয়ের সুযোগ কমতে কমতে প্রায় শূন্যে ঠেকেছে। এত বেশি প্রতিযোগিতা, এত বেশি পরীক্ষা— একেবারে জীবনের শুরু থেকে এর প্রয়োজন কতটা আছে তাও প্রশ্নহীন নয়।

সত্তর-আশির দশকে এদেশে সম্ভবত কোনো কোচিং সেন্টার ছিল না। তখনো দেশে পড়াশোনা হয়েছে এবং বোধকরি মানসম্মত পড়াশোনা হয়েছে। সেই সময়গুলোতে এখনকার মতো প্রাইভেটও ছিল না, ভর্তিবাণিজ্য ছিল না, ছিল না প্রশ্নপত্র ফাঁস। এদেশের প্রথিতযশা মানুষরা সম্ভবত কেউ-ই কোচিং, টিউশনি করেননি। ওই সময়গুলোতে অনেক শিক্ষক বিনাপয়সায় ছাত্র পড়িয়েছেন। এমনকি ওই সময়ের শিক্ষকরা এখনকার মতো বেতনও পেতেন না। স্বর্ণালি সেই দিনগুলোতে সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা ছিল। স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে, কোনো কোনো শিক্ষকের বাসায় খেয়েপড়ে কোনো কোনো অসচ্ছল ছাত্র তখন বোর্ডস্ট্যান্ড করেছে। মানুষের মতো মানুষও হয়েছে তারা।

তাহলে কেন এত কোচিং, কেন এত প্রাইভেট বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় জরুরি হয়ে উঠল? বরাবরের মতো এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি প্রায় পঞ্চাশজন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২৫ জন ছাত্রছাত্রী কোচিং চালু রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। মাত্র ৫ জন শিক্ষার্থী এই ব্যবস্থা চাননি এবং অধিকাংশ অভিভাবক কোচিং, প্রাইভেট থেকে মুক্তি চান। কোনো কোনো শিক্ষার্থীর মতে, কোচিং সেন্টারে নিরবচ্ছিন্ন ক্লাস হয়। বিভিন্ন সিস্টেমে পরীক্ষা হয়। শিক্ষকরা হাতে-কলমে শেখান, যেটি এখন স্কুল-কলেজগুলোতে নেই। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, স্কুল-কলেজে সেভাবে এখন ক্লাস হয় না, বাধ্য হয়ে তারা কোচিং করে। অপরদিকে শিক্ষকরা বলেন, আমরা তো ক্লাস নিতেই চাই। কিন্তু শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে নিয়মিত আসে না। শুধু ফরম পূরণের সময় আসে।

শিক্ষকতার পাশাপাশি কোচিং করান এমন একজন শিক্ষক বলেন, ‘চিকিৎসকরা যদি চাকরির পাশাপাশি অবাধে এই খাত থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করতে পারেন, তাহলে আমরা চাকরি করার পর ছাত্রদের জ্ঞানদান করে কিছু আয় কেন করতে পারব না?’ বেশ কিছু শিক্ষার্থী ভয়ে ভয়ে বলেন, বর্তমান

সিলেবাসে এবং শিক্ষাপদ্ধতিতে কোচিং-প্রাইভেট না করলে ভালো ফল করা সম্ভব নয়।’ কোচিং করান এমন একজন বেকার রহমত আলী বললেন, সরকার আমাদের চাকরি দিক, কাল থেকেই এসব ছেড়ে দেব।

আবার প্রশ্নফাঁসের ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় এলেই সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয় কোচিং সেন্টারগুলো। তারপরও প্রশ্ন ফাঁসের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা চলমান রয়েছে। অবৈধভাবে ব্যবসা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভুয়া পরীক্ষার্থী সরবরাহ, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। কিছুদিন আগে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকার ইউসিসি, ইউনিএইড, আইকন, আইকন প্লাস, ওমেগা এবং প্যারাগন কোচিং সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করেছে। তথাপি জনমনে কতটুকু স্বস্তি ফিরে এসেছে তা বলা মুশকিল। কেননা কোচিংসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থায় একধরনের শঙ্কা কাজ করা স্বাভাবিক— অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পাসের হার আশাতীত হলেও এসব শিক্ষার্থী বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা নিয়েই পরবর্তী ধাপের যাত্রা শুরু করছে। এর একটি বড় কারণ, দেশে মানসম্মত ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব রয়েছে। শিক্ষার উপযুক্ত মান ধরে না রাখার কারণ হিসেবে শিক্ষকদের নিয়মবহির্ভূতভাবে কোচিংবাণিজ্য ও প্রাইভেট পড়ানো দায়ী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সুতরাং শিক্ষকদের দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে একশ্রেণির শিক্ষকের যোগসাজশে যেসব কোচিং সেন্টার অনৈতিক বাণিজ্য ফেঁদে বসেছে তা রোধ করা জরুরি। আবার শিক্ষকদের উচিত শিক্ষা নির্দেশিকা সঠিকভাবে অনুসরণ করা। এমতাবস্থায় শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পরিদর্শন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে। আর এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করা। তবেই শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কাছ থেকে মানসম্পন্ন শিক্ষার নিশ্চয়তা পাবেন।

বর্তমানে এসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছে সরকার। তার নমুনা আমরা দেখতেও পারছি। মানুষ গড়ার প্রথম ধাপ প্রাথমিক শিক্ষাকে কার্যকরভাবে সফল করার নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে নতুন সরকার। কিন্ডারগার্টেনে ‘কঠিন’ শিক্ষাযন্ত্র থেকে কোমলমতি শিশুদের রক্ষার জন্য সরকারি স্কুলগুলোতে নার্সারি ও শিশু শ্রেণি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি রুখতে নিচ্ছে নানা পদক্ষেপ। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে প্রতিটি শহরে কোচিং, প্রাইভেট সেন্টার। খোদ সরকারও মনে হয় জানে না দেশে কতগুলো কোচিং সেন্টার আছে। কাকডাকা ভোর থেকে রাত অবধি এখন শিক্ষার্থীদের ঠিকানা হয়েছে কোচিং কিংবা প্রাইভেট সেন্টার। প্লে শ্রেণি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এসব কোচিং, প্রাইভেটে।

একটি শহরে যদি দশ হাজার ছাত্রছাত্রী থাকে, তাহলে দশ হাজার ছাত্রছাত্রীই এখন কোচিং, প্রাইভেট পড়ে। কী সর্বনাশা প্রবণতা? কেন এমন হলো? মাননীয় রাজনীতিবিদরা একটি বারও কি আপনারা মহান সংসদে দাঁড়িয়ে এ বিষয়ে কথা বলেছেন? একটি অপরাধপ্রবণ স্থানে শিক্ষা নিচ্ছে আমাদের সন্তানরা, আর এতদিন আমরা চুপ করে আছি? এভাবে চলতে থাকলে আগামীর ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ে উঠবে, ভাবার বিষয়। দেশ পরিচালনার চাবি উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না হয়তো, তাই এখন থেকেই সাবধান হওয়া জরুরি।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করার পর থেকে কোচিং, প্রাইভেট বেড়ে গেছে। এছাড়া নিবেদিত শিক্ষকের সংখ্যা কম। শিক্ষকদের বেতন বাড়াতে হবে। যেভাবেই হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করাতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন শিক্ষামন্ত্রী ভালো করবেন আশা রইল।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

ৎড়নরঁষরংষধস৭৯৪—মসধরষ.পড়স

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads