• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
যন্ত্রের ছোঁয়ায় বাড়ছে কৃষি উৎপাদন

লোগো আইএমইডি

সংরক্ষিত ছবি

কৃষি অর্থনীতি

আইএমইডির প্রতিবেদন

যন্ত্রের ছোঁয়ায় বাড়ছে কৃষি উৎপাদন

· ব্যয় কমেছে গড়ে এক-তৃতীয়াংশ · মাড়াইপরবর্তী অপচয় কমছে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ১৬ জুলাই ২০১৮

২০১২ সালে দেশের প্রতি শতক জমিতে ধান উৎপাদন হতো ১৮ দশমিক ৩৮ কেজি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫১ কেজিতে। এ হিসাবে পাঁচ বছরে একই জমিতে ধানের উৎপাদন বেড়েছে ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। কৃষি উৎপাদনে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াই এর কারণ বলে দাবি করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। একই কারণে শস্য সংগ্রহের ব্যয় গড়ে এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি (দ্বিতীয় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের লক্ষ্য সামনে রেখে সারা দেশের ৬৪ জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। ২০১২ সালের জুলাই থেকে চলমান প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও দুই দফায় সংশোধনীর মাধ্যমে তা আগামী জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ১৭২ কোটি ১৯ লাখ টাকা খরচ ধরে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। দুই দফায় সংশোধনে ৯৭ শতাংশ বেড়ে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকায়। এর আওতায় আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি কেনায় ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষকদের অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। হাওর এলাকায় যন্ত্রপাতির দামের ৭০ ভাগ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। দেশের অন্যান্য এলাকায় এ হার ৫০ শতাংশ। শেষ পর্যায়ে প্রকল্পের গতি-প্রকৃতি তুলে ধরতে সমীক্ষার আয়োজন করেছে আইএমইডি।

সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় আসা কৃষকদের ফসল সংগ্রহ পরবর্তী সময়ে অপচয়ের হার সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ কমেছে। কিছু এলাকায় অপচয় কমেছে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে ফসল সংগ্রহের পর ব্যয় কমেছে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। কৃষকদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রচলিত নিয়মে ধান কাটা, আঁটি বাঁধা, পরিবহন, মাড়াই ও ঝাড়াই কাজের প্রতিটি ধাপে অপচয় হয়ে থাকে। অন্যদিকে এ কাজে ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ ব্যবহারে অপচয় শূন্যের কোটায় নেমে আসে।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি ড. শামসুল আলম বলেন, উন্নত সার ও বীজের জোগানের পাশাপাশি সেচ নিশ্চিত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। এতে যান্ত্রিকীকরণেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় কৃষি কাজে লাভ কমে আসছে। তা ছাড়া শিল্প ও সেবা খাতে কৃষির উদ্বৃত্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের প্রবণতা শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় কৃষির উন্নতি ধরে রাখতে যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

সমীক্ষায় প্রকল্পের আওতায় আসা দুই হাজার কৃষকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সাড়ে ২৪ ভাগ উপকারভোগী কৃষক বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। তাদের ৪২ শতাংশ মনে করেন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বেড়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে পশুর অভাবে চাষাবাদে বাড়তি সময় লাগত। ফলে সময়মতো ফসল উৎপাদন ও সংগ্রহ সম্ভব হতো না। একটি ফসল সংগ্রহের পর অনেক জমি সারা বছর খালি থাকত। যন্ত্রের ব্যবহারের কারণে এখন একই জমিতে কয়েকবার ফসল চাষ সম্ভব হচ্ছে।

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮৪ দশমিক ৪৫ ভাগ কৃষক জানান, তারা প্রকল্পের আওতায় ভর্তুকি পেয়েছেন। পাঁচ বছরে প্রকল্প এলাকায় কৃষি কাজে পশু সম্পদের তুলনায় যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে ৪১ দশমিক ৬০ ভাগ। মানব শক্তির তুলনায় যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ৯৭ দশমিক ৪০ শতাংশ কৃষকের মতে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে ফসল উৎপাদন খরচ কমেছে। পশু শক্তির বিপরীতে যন্ত্র ব্যবহার করায় খরচ কমেছে ৪৭ দশমিক ৬৫ ভাগ। গড় হিসেবে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে শস্য সংগ্রহোত্তর খরচ এক তৃতীয়াংশ কমেছে।

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া উপকারভোগী ৯০ দশমিক ৬০ শতাংশ কৃষক মনে করেন, প্রকল্প কার্যক্রমের ফলে এলাকায় কর্মসংস্থান বেড়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়া ব্যবসার প্রসার ঘটেছে।

তবে প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা করছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিযন্ত্র প্রাপ্তিতে এলাকার প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ থাকায় প্রকৃত কৃষকরা ভর্তুকির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তা ছাড়া যন্ত্রপাতি মেরামতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে না ওঠায় প্রকল্পটি হুমকিতে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়োত্তর সেবার অপ্রতুলতা, মাঠ পর্যায়ে কৃষি যন্ত্রসেবা কেন্দ্র না থাকা, কৃষি যন্ত্রের ভাড়ার হার নির্ধারিত না থাকা, যন্ত্রের মাধ্যমে রোপণের উপযোগী চারা উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ, কম্বাইন হারভেস্টার চলাচল উপযোগী রাস্তা না থাকায় প্রকল্পটির সুফল ম্লান হচ্ছে বলে মনে করে আইএমইডি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জমির আকার ছোট হওয়ার কারণে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেছে আইএমইডি। তা ছাড়া প্রতিটি জমিতে ভিন্ন ধরনের ফসল চাষ, কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যাংকঋণ না থাকার কারণে বাণিজ্যিক খামার গড়ে উঠছে না বলেও দাবি করা হয়েছে। তা ছাড়া বাস্তবায়ন শেষে প্রকল্পের যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এ প্রকল্পের সুফল ধরে রাখাও কঠিন হবে বলে ধারণা আইএমইডির।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads