• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads

ছবি : ইন্টারনেট

জীব বিজ্ঞান

প্রজাপতির বাহারি পাখা ও বিচিত্র জীবনের গল্প

  • তপু রায়হান
  • প্রকাশিত ১৩ এপ্রিল ২০১৮

প্রজাপতি শব্দটা শুনলে প্রথমেই আমাদের মাথায় রঙ-বেরঙের পাখাওয়ালা পতঙ্গের ছবি ভেসে ওঠে। বেখেয়ালেই মন গুন গুন করে ওঠে-

‘প্রজাপতি, প্রজাপতি,

কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?

টুকটুকে লাল নীল ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা

কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?’

আসলে প্রজাপতি মানেই বর্ণিলতা। বিচিত্র রঙ আর নকশায় সাজানো একটি প্রাণী। লেপিডোপ্টেরা (Lepidoptera) বর্গের এক ধরনের পতঙ্গ। পৃথিবীতে যাদের আবির্ভাব ঘটেছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছর।

লেপিডোপ্টেরা বর্গের এই প্রাণীটির প্রধানত সাতটি পরিবার আছে এবং প্রতি পরিবারেই ভিন্ন ধরনের প্রজাপতির দেখা মেলে।

এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির প্রজাপতির দেখা পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নের (আইইউসিএন) তথ্য মতে বাংলাদেশে ৩০৪ প্রজাতির প্রজাপতি পাওয়া গেছে।

প্রজাপতিকে আমরা হাজারো রঙের দেখলেও শুনলে অবাক হতে হয়, প্রজাপতির শরীরে মেলানিন বা এমন ধরনের কোনো রঞ্জকের উপস্থিতি নেই। তাহলে কেন এমন বর্ণিল হয় প্রজাপতির পাখা?

রঙিন পাখা

প্রজাপতির বর্গ লেপিডোপ্টেরা হচ্ছে একটি ল্যাটিন শব্দ যা দুটি গ্রিক শব্দ ‘লেপিস’ ও ‘টেরন’-এর সমন্বয়ে গঠিত। ‘লেপিস’ অর্থ স্কেল বা আঁশ এবং ‘টেরন’ অর্থ উইং বা পাখা। অর্থাৎ শাব্দিকভাবে লেপিডোপ্টেরা মানে হচ্ছে আঁশযুক্ত পাখা।

আমরা অনেক সময় খেলার ছলে কিংবা অন্য কোনো কাজে প্রজাপতি ধরেছি বা পাখাতে হাত লেগেছে। তখন হাতে এক ধরনের রঙিন কিছু লেগে গেছে। এগুলো হচ্ছে প্রজাপতির শরীরের আঁশ। প্রকৃতপক্ষে প্রজাপতির পাখা হচ্ছে স্বচ্ছ, বর্ণহীন পর্দা। যাতে বিভিন্ন ধরনের আঁশ বিভিন্নভাবে সজ্জিত হয়ে আলোর ইরিডিসেন্ট ধর্মের মাধ্যমে নানা রঙের সৃষ্টি করে।

একটি ছোট প্রজাপতির পাখায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন আঁশ থাকে। মূলত এসবের উপস্থিতির কারণেই প্রজাপতিকে বিভিন্ন রঙে দেখে থাকি। প্রজাতি ভেদে এসব আঁশের সজ্জাতে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। গড়ে এ আঁশগুলো লম্বায় ১০০ মাইক্রোমিটার ও প্রস্থে ৫০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আলো যখন বিভিন্ন স্তরে সজ্জিত এসব আঁশের ওপরে এসে পড়ে তখন বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বিচ্ছুরণ করে। ফলে আমাদের চোখে বিভিন্ন রঙ এসে ধরা পড়ে।

কিন্তু প্রকৃতিতে রঙের মিছিলে প্রজাপতিকে কেন এমন হতে হলো? বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করা, বিপরীত লিঙ্গের সদস্যকে চিনতে পারা ও শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতেই প্রজাপতির এমন বর্ণিল চেহারা।

বিচিত্র জীবন

প্রজাপতির জীবন নিয়ে আলোচনার প্রথমেই আসে এর বিচিত্র জন্ম ও পরিণত হওয়ার পদ্ধতি। প্রজাপতি কত দিন বাঁচে সেটা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে কোনো কোনো প্রজাতির প্রজাপতির জীবনকাল মাত্র সাত দিনের, আবার কোনো প্রজাতির আয়ু প্রায় এক বছর। তবে বেশিরভাগ প্রজাপতির জীবনচক্র শেষ হতে প্রায় এক মাস সময় লাগে, অর্থাৎ এরা সাধারণত এক মাস বাঁচে।

জীবনচক্র

প্রজাপতির জীবনচক্রের চারটি ধাপ রয়েছে। এগুলো হলো- ডিম, লার্ভা, পিউপা এবং পরিণত প্রজাপতি।

ডিম : স্ত্রী প্রজাপতি সাধারণত পাতার ওপর ডিম পাড়ে। এই ডিমগুলোর চারপাশে কোরিওন নামে এক ধরনের শক্ত আবরণ থাকে। আর ডিমগুলো যাতে পাতা থেকে না পড়ে যায় তার জন্য এক ধরনের আঠালো পদার্থ দিয়ে আটকানো থাকে পাতার সঙ্গে। কোনো কোনো প্রজাপতি কেবল নির্দিষ্ট কোনো গাছের পাতাতেই ডিম পাড়ে। আবার কোনো কোনো প্রজাপতি ডিম পাড়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট গাছকে বেছে নেয়। ডিম অবস্থায় বেশ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হয়। শীতের আগে আগে ডিম পাড়া হলে সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রাখা হয় এবং শীত শেষ হলে বসন্তে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। অনেক প্রজাপতি আবার বসন্তে ডিম পাড়ে এবং সেগুলোর বাচ্চা ফোটে গ্রীষ্মে।

লার্ভা : প্রজাপতির ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। এগুলোকে ইংরেজিতে ক্যাটারপিলার, বাংলায় বিছা বা শুয়োপোকাও বলা হয়ে থাকে। এরা খুব দ্রুত বড় হয় এবং এদের বড় হওয়ার জন্য প্রচুর খাবার দরকার হয়। সাধারণত গাছের পাতা খেয়ে থাকে এরা। দুয়েকটি প্রজাপতি অবশ্য পতঙ্গও খেয়ে থাকে। লার্ভা থেকে পিউপা হওয়ার জন্য কয়েক দিন সময় লাগে। এই সময়ের শেষ ভাগেই ডানা তৈরি হয়।

পিউপা : লার্ভা বা ক্যাটারপিলার অবস্থার শেষ সময়ে বিশেষ এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয় এবং লার্ভাগুলো পিউপায় পরিণত হওয়ার জন্য সাধারণত নিজেদের আকারের চেয়ে তুলনামূলক বড় আকারের পাতার নিচের দিকে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ সময় এদের শরীরের চারপাশে নতুন এক ধরনের খোলস তৈরি হয় এবং এগুলো সাধারণত নিশ্চল অবস্থায় পাতার সঙ্গে এঁটে থাকে। পিউপা অবস্থাতেই পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতির গঠন সম্পূর্ণ হয়।

প্রজাপতি : পিউপা অবস্থায় সপ্তাহ দুয়েক সময় কাটানোর পর বাইরের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে রঙিন প্রজাপতি। তবে শুরুতেই প্রজাপতি উড়তে পারে না। এদের ডানাগুলো ভেজা অবস্থায় থাকে। বেশিরভাগ প্রজাপতির ডানা শুকিয়ে নিতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। অনেকের ক্ষেত্রে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ও লাগতে পারে। ডানা শুকালে তবেই উড়ে বেড়ানো শুরু করে প্রজাপতি।

বাসস্থান

আমরা সাধারণত প্রজাপতিকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় দেখি না। সারা দিন রোদে ঘুরে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করতে থাকে। কিন্তু দিনের শেষভাগে ঘটে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। তখন এরা গাছ কিংবা অন্য কোনোকিছুর ওপরে বসে থাকে এবং শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। বিকালের শেষভাগ থেকে পরের দিন ভোর হওয়া পর্যন্ত এরা এভাবেই থাকে। আবার অনেক প্রজাপতিতে ডায়াপজ নামক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। সাধারণত উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে গুটিপোকাগুলো একইরকম অবস্থায় মাসের পর মাস থাকে। বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যের দেখা মেলে। একে ডায়াপজ বলে।

পরিভ্রমণ

অনেকেরই ধারণা প্রজাপতি খুব বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে না অথবা কয়েকটি ফুলে ঘোরাঘুরির মধ্যেই চলাচল সীমাবদ্ধ। কিন্তু এ ধারণা ভুল। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রজাপতি অনেক দূর পর্যন্ত চলতে সক্ষম। কিছু প্রজাপতি প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পথ অতিক্রম করতে পারে।

 

খাবার

আমরা সাধারণভাবে বলতে পারি, সব প্রজাপতিই ফুলের মধু কিংবা গাছের রস খেয়ে থাকে। কিন্তু কিছু পতঙ্গ শিকারি প্রজাপতিরও দেখা মেলে। Miletinae নামক উপপরিবারের সদস্যরা যাদেরকে সাধারণত Hervesters কিংবা Woollz Legs নামে ডাকা হয়, এরা Homoptera উপপর্বের পতঙ্গদের শিকার করে পিঁপড়াদের সঙ্গে মিথোজীবী সম্পর্ক সৃষ্টি করে।

প্রজাপতি ফুলে ফুলে উড়ে শুধু মধুই খায় না পরাগরেণু স্থানান্তরিত করে ফল ও ফসলের পরাগায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তবে কিছু প্রজাপতির লার্ভা গাছ বা ফসলের কচি পাতা খেয়ে ক্ষতিও করে। সব মিলিয়ে প্রজাপতি যে প্রকৃতির অনন্য সাধারণ সৃষ্টি তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads