• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

ওয়াটারহুইলের ফাঁদে আটকা ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী

ছবি : বিবিসি

জীব বিজ্ঞান

সবচেয়ে দ্রুতগতির মাংসাশী উদ্ভিদ ওয়াটারহুইল

  • আসিফ খান
  • প্রকাশিত ১০ মে ২০১৮

বেঁচে থাকার জন্য জীবজগতের সব সদস্যকেই বাধ্যতামূলকভাবে খাদ্যগ্রহণ করতে হয়। তবে প্রাণী ও উদ্ভিদ ভেদে খাদ্যগ্রহণের ধরন হয় ভিন্ন। যেমন প্রাণীদের মধ্যে কেউ তৃণভোজী, কেউবা মাংসাশী। এরা কেউই নিজেদের খাবার নিজেরা তৈরি করতে পারে না। যারা মাংসাশী তারা অন্য প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে আর তৃণভোজীরা নিজের জন্য খাবার পায় উদ্ভিদ থেকে। এ ছাড়া যারা সর্বভুক তারা উভয় প্রকার খাদ্যই গ্রহণ করে।

তবে পৃথিবীতে একমাত্র উদ্ভিদ বা গাছপালাই নিজের খাবার নিজেই তৈরি করে। সালোকসংশ্লেষণ নামক এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় এরা তৈরি করে নিজেদের খাবার। মাটি থেকে পানি, খনিজ, বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে গাছ। এই দুইয়ের সঙ্গে নিজের পাতার ক্লোরোফিল মিশিয়ে সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে তৈরি করে গ্লুকোজ। আর উদ্ভিদের এই খাবার তৈরির সামর্থ্যের কারণেই খাদ্যশৃঙ্খল ঠিক থাকে। উদ্ভিদ থেকে প্রাণীতে শক্তি প্রবাহের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বজায় থাকে। সুশৃঙ্খল থাকে খাদ্যজাল। আর এ কারণেই বলা যায় বিশ্বের সব প্রাণীই কোনো না-কোনোভাবে গাছেদের কাছে ঋণী।

কিন্তু বিস্ময়কর এই পৃথিবীতে এমন কিছু উদ্ভিদ আছে যারা নিজেরা খাদ্য তৈরির পাশাপাশি পুষ্টির জন্য প্রাণীর ওপর নির্ভর করে। খাবার হিসেবে তারা আস্ত প্রাণীদেহই ‘খেয়ে’ নেয়। এসব উদ্ভিদকে বলা হয় মাংসাশী উদ্ভিদ (Carnivorous plants)। এরা সাধারণত ক্ষুদ্র পোকামাকড়, মাকড়সা ইত্যাদি প্রাণীকে ফাঁদে ফেলে। তবে কখনো কখনো ইঁদুর বা ব্যাঙ জাতীয় ছোট ছোট প্রাণীরা এদের শিকারে পরিণত হয়।

পৃথিবীতে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির মাংসাশী উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ, ওয়াটারহুইল, কলসী গাছ বেশ পরিচিত ও যত্রতত্র দেখা যায়।

আমরা জানি উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো নাইট্রোজেন। এজন্য নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ মাটিতে অধিকাংশ উদ্ভিদ সবচেয়ে ভালো জন্মে। কিন্তু মাংসাশী উদ্ভিদ সাধারণত জন্মে ভেজা আর স্যাঁতসেঁতে জমিতে। আর সেখানে নাইট্রোজেনের পরিমাণ খুব অল্প থাকে। তাই বেঁচে থাকার জন্য এসব মাংসাশী উদ্ভিদ অন্য একটি পদ্ধতিতে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে থাকে। তারা বিভিন্ন প্রাণীকে ফাঁদে আটকে ফেলে। এসব প্রাণী মারা যাওয়ায় পর তাদের মৃতদেহ থেকে নাইট্রোজেনসহ কয়েকটি খনিজ উপাদান সংগ্রহ করে।

তবে শিকার কখন কাছে আসবে এজন্য তাদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। এজন্য পোকামাকড় এবং অন্য প্রাণীদের আকর্ষণ করতে তাদের বিশেষ কিছু পদ্ধতি রয়েছে। কোনো কোনো মাংসাশী উদ্ভিদ বাতাসে এক ধরনের গন্ধ ছড়ায় যা মাছি, মৌমাছি কিংবা পিঁপড়ার মতো পোকামাকড়কে আকর্ষণ করে।

অনেক মাংসাশী উদ্ভিদের দেহে উজ্জ্বল রঙের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়, যা পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করার টোপ হিসেবে কাজ করে। কোনো কোনো উদ্ভিদের পাতার চারদিকে ছোট মুক্তোদানার মতো চকচকে কিছু জিনিসের আবরণে ঢাকা থাকে।  এগুলো উজ্জ্বল রঙ এবং সুমিষ্ট গন্ধের সাহায্যে পোকামাকড়কে প্রলুব্ধ করে ফাঁদে ফেলে। মাংসাশী উদ্ভিদে সাধারণত দুই ধরনের ফাঁদ দেখা যায়। ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ, ওয়াটারহুইল ইত্যাদি উদ্ভিদের প্রত্যক্ষ ফাঁদ আছে। তাদের ওপর কোনো পোকামাকড় বসা মাত্রই কোনো অঙ্গকে নাড়াচাড়া দিয়ে পোকামাকড়কে ফাঁদে ফেলে। দ্রুতবেগে নড়তে সক্ষম এসব অঙ্গ একসঙ্গে দাঁতওয়ালা চোয়ালের মতো কাজ করে। কোনো কোনো উদ্ভিদের ফাঁদের মুখ আবার খুব দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়।

তবে উদ্ভিদভেদে তাড়াতাড়ি হওয়ার তফাতটা কত তা এতদিন জানা ছিল না। গবেষকরা সম্প্রতি হিসাব করে দেখেছেন ওয়াটারহুইল তার শিকারকে ফাঁদে ফেলার ক্ষেত্রে অন্যান্য মাংসাশী উদ্ভিদের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ ও তড়িৎকর্মা।

গবেষকরা দাবি করছেন, একটি ওয়াটারহুইল ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের চেয়ে দশ গুণ দ্রুত তার শিকারকে কব্জা করতে পারে।

বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়েল সোসাইটির এই সংক্রান্ত এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। গবেষণাকর্মটির প্রধান ও ফ্রেইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যানা ওয়েস্টারমেয়ার দেখেন যে শিকার ধরতে ওয়াটারহুইল ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের মতো একই পদ্ধতি অনুসরণ করে না।

এজন্য গবেষকরা উচ্চক্ষমতার একটি ক্যামেরা ব্যবহার করেন। ওয়েস্টারমেয়ার বলেন, ওয়াটারহুইল এত ছোট ও এত দ্রুতগতির যে অপটিক্যাল রেজ্যুলেশনের সর্বশেষ সীমা দিয়ে তাদের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

তাতে গবেষকরা দেখেন এক একটি ওয়াটারহুইল সাধারণত একটি ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের চেয়ে দশ গুণ ছোট, তবে শিকার ধরার ক্ষেত্রে তারা ফ্ল্যাইট্র্যাপের চেয়ে দশ গুণ দ্রুতগতির। আর প্রতিটি ওয়াটারহুইলে কমপক্ষে ১০০টি ফাঁদ রয়েছে।

গবেষকরা দেখেন ওয়াটারহুইল এক সেকেন্ডের ১০ ভাগের এক ভাগ সময়ে তার ফাঁদে শিকারকে আটকে ফেলতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেকেন্ডের ২০ ভাগের এক ভাগ সময়েই শিকারকে কাবু করে ফেলে ওয়াটারহুইল।

উদ্ভিদটি সচরাচর দেখা না গেলেও ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের কিছু অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ জলাশয়ে এদের দেখা যায়। উদ্ভিদটির শিকার ধরার ফাঁদ পানির নিচে থাকে। প্রত্যেকটি উদ্ভিদের কতকগুলো স্বচ্ছ পাতাসহ একটি সরু কাণ্ড থাকে। কাণ্ডের চারদিকে ৮টি পাতা চাকা স্পোকের মতো সাজানো থাকে। পাতাগুলোই ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। পাতাগুলো আকারে বেশ ছোট।

এদের পাতা দুটি খণ্ডে বিভক্ত। এখানে সারিবদ্ধভাবে শুঙ্গ সাজানো থাকে। আর খণ্ডগুলোর মধ্যে থাকে ট্রিগার হেয়ার। একটি পোকা ফাঁদে প্রবেশ করলে পাতার খণ্ড দুটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শিকারকে পরিপাক করে পরবর্তী শিকার ধরার জন্য ফাঁদ আবারো প্রস্তুত করে ফেলে জলাভূমির মাংসাশী এই উদ্ভিদটি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads