• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
বৈষম্যের শিকার আমাদের নারী ক্রিকেটাররা

ছবি : ইন্টারনেট

সম্পাদকীয়

বৈষম্যের শিকার আমাদের নারী ক্রিকেটাররা

  • প্রকাশিত ২৯ জুন ২০১৮

রাশিয়ায় চলতি বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনায় মত্ত সারা বিশ্ব। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। ঠিক এ সময় একটি সুখবর বাংলার নারী ক্রিকেটাররা বয়ে এনেছেন। সেটি হলো এশিয়া কাপ জিতে তারা দেশে ফিরে এসেছেন। তাও আবার ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে। যেখানে ফাইনাল খেলাটাই ছিল বাংলার বাঘিনীদের স্বপ্ন, সেখানে ভারতকে হারিয়ে ঘরে ফিরেছেন তারা। এই সাফল্য নিঃসন্দেহে খুব বড় অর্জন। এজন্য নারী ক্রিকেটাররা দেশ ও জাতির পক্ষ থেকে পেয়েছেন আন্তরিক ধন্যবাদ। এই অসামান্য সাফল্য যারা বয়ে এনেছেন, তারা কেমন আছেন? খুব কি ভালো? এ মুহূর্তে আলোচনায় উঠে এসেছে তাদের বেতন কাঠামোর বিষয়টি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্থান পেয়েছে পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের বেতন বৈষম্যের একটি চার্ট। তাতে দেখা যায়, পুরুষ ক্রিকেটারের তুলনায় একজন নারী ক্রিকেটার অবিশ্বাস্যরকম কম বেতন পাচ্ছেন।

পুরুষ ক্রিকেটারদের বেতন কাঠামোয় দেখা যায়— ‘এ’ প্লাস ক্যাটাগরি ৪ লাখ টাকা; ‘এ’ ক্যাটাগরি ৩ লাখ টাকা; ‘বি’ ক্যাটাগরি ২ লাখ টাকা; ম্যাচ ফি—  পুরুষ ওডিআই ক্যাটাগরি ২ লাখ টাকা এবং প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ৪০ হাজার টাকা। অন্যদিকে নারী ক্রিকেটারদের বেতন কাঠামো— ‘এ’ গ্রেড ৩০ হাজার টাকা; ‘বি’ গ্রেড ২০ হাজার টাকা;  ‘সি’ গ্রেড ১০ হাজার টাকা; ম্যাচ ফি— নারী ওডিআই ক্যাটাগরি ৮ হাজার টাকা এবং প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ৬০০ টাকা। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বেতন বৈষম্যের জাঁতাকলে কীভাবে নিষ্পেষিত ক্রিকেটে আমাদের এশিয়া কাপ জয়ী মেয়েরা।

বেতন বৈষম্যের এই চার্ট দেখে গত ১২ জুন ২০১৮ গল্পকার মোজাফফর হোসেন তার নিজের ফেসবুকের টাইমলাইনে লেখেন— ‘ছোটবেলায় দেখা মাটিকাটা কিংবা ইটভাটার কাজে নারী-পুরুষ শ্রমিকের মজুরির পার্থক্য ছিল। কিন্তু তাই বলে এত বেশি ছিল না! হয়তো পুরুষের অর্ধেক পেত নারীরা। এখন মোটামুটি একইরকম পায় বলে জানি। একটু এদিক-সেদিক কোথাও কোথাও হতে পারে। তবে সেটা ব্যক্তিমালিকানাধীন বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষ ভেদে একই কাজের জন্য কোনো বেতন বৈষম্য আছে বলে জানা ছিল না। পুরুষ ক্রিকেটে বোর্ডের আয় বেশি— স্পন্সর, টিভিস্বত্ব, টিকেট বিক্রি ও আইসিসি থেকে তুলনামূলক আয় অনেক বেশি। তাই বেতন কাঠামোতে পার্থক্য থাকতে পারে। সব দেশেই সেটা আছে। তাই বলে ৪ লাখের বিপরীতে মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা! অথচ ভারতে একজন নারী ক্রিকেটার পান বোর্ড থেকে মাসে ৫ লাখ রুপি, বছরে ৬০ লাখ।

বর্তমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী নারী ক্রিকেটারদের ঢাকায় ভালোমতো থাকা-খাওয়া সম্ভব নয়। অবসর গ্রহণের পর তাদের ক্ষেত্রে অন্য পেশায় যাওয়া মুশকিল হবে। তা ছাড়া নারী ক্রিকেটারদের খেলার বাইরে ক্রিকেটীয় পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগও কম। মানে কোচ-ধারাভাষ্যকার কিংবা আম্পায়ার হওয়ার সুযোগ কম। এই প্রতিকূল অবস্থা বজায় থাকলে অনেকে মেয়েই খেলার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করবেন না। ফলে নারী ক্রিকেটে উন্নতি আশা করা সম্ভব নয়। অন্যদের সঙ্গে রেসে টিকে থাকতে হলে নারী ক্রিকেটে সুবিধা বাড়াতে হবে এবং একে পেশা হিসেবে নারী ক্রিকেটাররা যাতে ভাবতে আগ্রহ বোধ করেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে আগে।

নারী শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য নিয়ে অনেকে লিখে থাকেন, অনেক শ্রমজীবী নারীকে বলতে শুনেছি, কীভাবে তার দিন চলে, কোন অবস্থার মধ্যে তাকে বসবাস করতে হয়। বিস্মিত হয়েছি তার কষ্টের কথাগুলো শুনে। কোনো এক বন্দরে নারী শ্রমিকদের দৈনিক আয় ৯ টাকা ৫০ পয়সা। কথাটা শুনে আমরা শুধু অবাক নই, বিস্মিতও হয়েছি। যেমন বিস্মিত হয়েছি সোনার মুকুট জয় করে আনা আমাদের বাঘিনীদের বৈষম্যের বেতন লিস্ট দেখে— বারবার ভেবেছি এখন কি আসলেই ২০১৮ সাল চলছে?

ভারতের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী বলেন,  ‘মেয়েদের ক্রিকেটে এটা মহৎ অর্জন।’ বিসিবির কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘সামনে মেয়েদের আরো ভালো খেলতে এই সাফল্য অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করবে। মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে আমরা অনেক দিন ধরেই কাজ করছি। আসলে সেভাবে রেজাল্ট পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশ্যই এটা একটা বড় ধরনের প্রেরণা হয়ে থাকবে মহিলা ক্রিকেটের জন্য।’

কিন্তু এই অর্জনের পর মেয়েদের সুযোগ-সুবিধা বাড়বে তো? এই প্রশ্নের জবাবে সিইও বলেন, ‘আমরা (বিসিবি) আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছি। মেয়েদের জন্য ভারত থেকে কোচ এসেছেন। তাদের কোচিং স্টাফও সমৃদ্ধ। সব মিলিয়ে আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।’

২০০৪ থেকে শুরু হয়েছে মেয়েদের এশিয়া কাপ ক্রিকেট। এই ক্রিকেটে ভারতের ছিল একক আধিপত্য। ভারত গত ৬ আসরের সবগুলোতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর বাংলাদেশ এবারের আসরসহ তিনটি আসরে মাঠে নেমেছে। আগের দুই আসরে বাংলাদেশের মহিলা দল ভালো করতে না পারলেও তৃতীয় আসরে নেমে শিরোপা জেতার স্বাদ পেয়েছে। এতদিন ভারতের বিপক্ষে খেলা মানেই ছিল বাংলাদেশের হার। কিন্তু এবারই অসাধ্য সাধন করেছে বাংলাদেশ মহিলা দল। হারের বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টেই ভারতের বিপক্ষে জিতল।

দেশে মহিলা ক্রিকেটারদের হাত ধরে ট্রফি এসেছে দেশে, এরই মধ্যে কেটে গেছে ঈদের আমেজও। শুরু হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপের উল্লাস। বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন টিভির পর্দায়। টিনশেড বাসা থেকে বহুতল ভবনের ছাদে উড়ছে সমর্থনকারী দেশের পতাকা। এরই মধ্যে খবর পাওয়া গেছে খেলায় ভিন্ন দেশ সমর্থনকারী এক দম্পতির ওপর হামলা চালিয়েছে অন্য দেশের সমর্থনকারীরা। বিষয়টি লজ্জার, একই সঙ্গে হতাশারও। জাতি হিসেবে আমরা যে ‘হুজুগে বাঙালি’ তা আবারো প্রমাণিত হলো।

সুদূর রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের আমোদ-আহ্লাদে আপ্লুত হলেও আমরা আমাদের এশিয়া কাপ জয়ী মহিলা ক্রিকেটারদের নিয়ে গর্বিত। তারা দেশ ও জাতির জন্য বিশাল সাফল্য বয়ে এনেছেন। তাই তাদের প্রতি সুবিচার করতে হলে বেতন বৈষম্যের বিষয়টির সুরাহা করতে হবে সবার আগে। যোগ্যতার ভিত্তিতেই মহিলা ক্রিকেটাররা এই অধিকার পাওয়ার দাবিদার। বেতন বৈষম্যের জাঁতাকল থেকে তাদের উদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি।

 

লেখক : 

রহিমা আক্তার মৌ

গল্পকার

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads