• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
মাস্টার্সের সমমান হলো দাওরায়ে হাদিস

কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে

সংরক্ষিত ছবি

শিক্ষা

নীতিগত অনুমোদন মন্ত্রিসভায়

মাস্টার্সের সমমান হলো দাওরায়ে হাদিস

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৪ আগস্ট ২০১৮

কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি এবার আইনি বৈধতা পাচ্ছে। এজন্য ‘কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের (তাকমীল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান আইন, ২০১৮-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ ছাড়া মন্ত্রিসভায় ‘বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৮’-এর খসড়াও চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে আইন দুটির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

এর আগে গত বছরের এপ্রিল মাসে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি দেয় সরকার। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, গত বছরের ১৩ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে সে অনুযায়ী সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রস্তাবিত আইনানুযায়ী হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী বিদ্যমান ছয়টি কওমি মাদরাসা বোর্ডের সমন্বয়ে একটি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থাকবে। ‘আল-হাইয়্যাতুল উলিয়ালিল জামিয়াতুল কওমিয়া বাংলাদেশ’ নামের কমিটিই এই বোর্ড হিসেবে কাজ করবে। এর কার্যালয় হবে ঢাকায়। কমিটির চেয়ারম্যান হবেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি। এ কমিটি সনদবিষয়ক যাবতীয় কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলে বিবেচিত হবে। এই কমিটির নিবন্ধিত মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের সনদ মাস্টার্সের সমমান বলে বিবেচিত হবে। দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষাও হবে এই কমিটির অধীনে। দাওরায়ে হাদিসের সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষাপদ্ধতি, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল, সনদ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক সব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক বা একাধিক উপকমিটি গঠন করতে পারবে ওই কমিটি। এসব বিষয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে ওই কমিটি। প্রস্তাবিত আইনানুযায়ী, এ কমিটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে।

কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ সনদ দাওরায়ে হাদিসের মান সাধারণ শিক্ষার ইসলামিক স্টাডিজের সমমান করা হলেও দাওরায়ে হাদিসের আগের ধাপগুলোর মান কী হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব কোনো জবাব দিতে পারেননি।

কওমি শিক্ষার্থীদের আগের সনদগুলোর স্বীকৃতি না দিয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রির স্বীকৃতি কীভাবে হয়— এমন প্রশ্নের জবাবে শফিউল আলম বলেন, এটা সরকারের পলিসি। আইনের বাইরে আমাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। দাওরায়ে হাদিস যেখানে পড়ানো হবে, সেগুলো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নয়। এই অধিভুক্তি ছাড়াই কীভাবে মাস্টার্স সনদ দেওয়া হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, এটা একটি ব্যতিক্রমী বিষয়। এটা হলো মূলত কওমি মাদরাসায় প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে তাদের মূল ধারায় নিয়ে আসা। সরকারের এই কাঠামোতে নিয়ে আসা এটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া এই আইনের অধীনে কওমি মাদরাসা নিয়ন্ত্রণে থাকা বর্তমানের ছয়টি বোর্ড ভেঙে একটি বোর্ড করার কথা বলা আছে। এর নাম হবে ‘আল-হাইয়্যাতুল উলিয়ালিল জামিয়াতুল কওমিয়া বাংলাদেশ’। একটিই বোর্ড হবে, কার্যালয় হবে ঢাকায়। এই বোর্ডে মোট ১৫ জন সদস্য থাকলেও তাতে সরকারের কেউ থাকবেন না। বোর্ডে সরকারের কোনো প্রতিনিধি কেন থাকবেন না এ প্রশ্নেরও জবাব দিতে পারেনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সরকারের প্রতিনিধি ছাড়া একটি বোর্ডের মাধ্যমে কীভাবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হবে— সেই প্রশ্নে শফিউল আলম বলেন, কমিটি যেটা ছিল সেটাকে বোর্ড আকারে নিয়ে আসা হয়েছে। ছয়টি বোর্ডকে একীভূত করে এই বোর্ড করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ইসলামিক আরাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে নতুন এই আইনের খসড়ায় কিছু বলা নেই। ভবিষ্যতে হয়তো বিবেচনায় আসতে পারে।

কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ সনদের স্বীকৃতির ঘোষণা এবং প্রজ্ঞাপন এক বছর আগেই এসেছে। ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারাসিল আরাবিয়ার সভাপতি আল্লামা আহমেদ শাহ শফির নেতৃত্বে আলেমরা গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেই এই ঘোষণা আসে। তার দুই দিন পর হয় প্রজ্ঞাপন। আর গত মার্চে ১০১০ জন কওমি আলেমকে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (ষষ্ঠ পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে আইনের খসড়ায় মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আগে থেকেই কওমি সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এখন সেটাকে আইনি কাঠামোতে নিয়ে আসা হচ্ছে। এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন শাহ আহমেদ শফি। তিনি ইচ্ছা করলে যে কাউকে কমিটিতে যোগ করে নিতে পারবেন। তবে সব মিলিয়ে সদস্য সংখ্যা ১৫ জনের বেশি হবে না। কমিটি ‘দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে’ থাকবে।

কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি এই মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি। আর এই দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়ার পর ১৯৯৯ সালে বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট করে কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল ইসলামী ঐক্যজোট। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ধর্মভিত্তিক এই দলগুলোর আক্বিদাগত ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও কেবল এই ইস্যুতে তারা তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি হয়। তবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এই স্বীকৃতির বাস্তবায়ন হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সময় কওমি আলেমদের মুরব্বি আহমেদ শাহ শফিকে প্রধান করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। তবে সে সময় নিজেদের মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ শক্তির বিরোধিতায় সেটা আর এগোয়নি।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads