• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

উদ্যোক্তা

স্বস্তির বিদেশি ঋণ এখন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

টাকার অবমূল্যায়ন ও লাইবর সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিপাকে

  • আলতাফ মাসুদ
  • প্রকাশিত ২৯ মার্চ ২০১৮

অভ্যন্তরীণ ঋণের চড়া সুদ এড়াতে গত এক দশকে দেশীয় উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থার চেয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কম সুদে সে ঋণ পাওয়া যেত। ফলে উদ্যোক্তারা ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন বেশ স্বস্তিতে। কিন্তু এরপর থেকে লাইবর (লন্ডনের শীর্ষ ১৫ ব্যাংকের আন্তঃলেনদেনে সুদের হার) সুদহার বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সেই ঋণ বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজার এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালে তিন মাসের লাইবর সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, যা বর্তমানে দুই শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আর ছয় মাসের লাইবর সুদের হার শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে প্রতি ডলারের দাম ৭৮ টাকা থেকে বেড়ে ৮৪ টাকা ২০ পয়সা হয়েছে। এ সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৭ শতাংশের বেশি। এসব কারণে যে বিদেশি ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ছিল ৫ শতাংশ, সেটা এখন শুধু পয়েন্ট বেসিসে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। 

libor

এ ছাড়া টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ঋণের মূল্যও বেড়ে গেছে। ৭৮ টাকা ডলার হিসেবে ২০১৪-১৫ সালে এক কোটি ডলারের ঋণমূল্য ছিল ৭৮ কোটি টাকা, তা এখন ৮৪ কোটি টাকার বেশি। এতে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়জনিত ক্ষতির মুখে পড়েছে বেসরকারি খাত। এক্ষেত্রে বিদেশি মুদ্রায় আয় নেই, এমন কোম্পানিই ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ধরনের ঋণে বিদেশি দায় ছাড়াও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কিছু ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে, পরিশোধের সময় রিজার্ভে বড় ধরনের চাপ পড়ে। এমনিতেই এখন রফতানির চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় চাপের মধ্যে রয়েছে রিজার্ভ। অবশ্য দেশীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এখনো বিদেশি ঋণকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী হিসেবেই দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, লাইবর হার বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বিদেশি ঋণের বাড়তি সুবিধাটি কমে এসেছে। তবে দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থার তুলনায় বিদেশি ঋণ পরিস্থিতি এখনো ততটা খারাপ হয়ে যায়নি। কারণ এখন অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদহারও বাড়ছে। আর যেসব কোম্পানি স্থায়ী (ফিক্সড) লাইবর হারে ঋণ নিয়েছে, তাদের অবস্থা চলমান হারের তুলনায় ভালো।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার। এ সময় পর্যন্ত বিদেশি ঋণ গ্রহণে এগিয়ে ছিল টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি ও তৈরি পোশাক খাত। মোট বিদেশি ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে এসব খাতে। এর বাইরে সিমেন্ট, ইস্পাত ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের উদ্যোক্তারাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদেশি ঋণ নিয়েছেন। আবার স্থানীয় ব্যাংকে ঋণের সুদ বেশি হওয়ায় অনেক কোম্পানি বিদেশ থেকে অর্থ এনে স্থানীয় ব্যাংকের দায় পরিশোধ করছে।

বিদেশি ঋণ নেওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি পোশাক ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান উৎসই অভ্যন্তরীণ বাজার। এসব প্রতিষ্ঠান এখন বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়জনিত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তারা ঋণ পরিশোধ করে টাকায়। ফলে টাকার অবমূল্যায়নে পরোক্ষভাবে তাদের ঋণের মূল্য ও সুদ বেড়ে গেছে। বাজার থেকে উচ্চমূল্যে ডলার কিনে সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হচ্ছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদেশি ঋণের প্রতি বেসরকারি খাতের ঝোঁক বাড়ে ২০১২ সালের পর। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের গড় সুদহার ছিল ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর এ সময় বিদেশি উৎস থেকে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ হারে ঋণ পাওয়া যেত। ২০১২ সালে বেসরকারি খাতে মোট বিদেশি ঋণ ছিল ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৩ সালের জুন মাসে ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। ২০১৪ সালে বিদেশি ঋণের প্রবাহ আরো বেড়ে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরের বছর বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি ঋণ গ্রহণের শর্তাবলি শিথিল করে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ২০১৫ সালের জুন মাসে এ ঋণ দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৬ সালের জুন মাস শেষে বিদেশি ঋণ দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে। আর ২০১৭ সালের জুন শেষে তা ১০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।

বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণগ্রহীতারা ২০১৬ সালে মূল ঋণের ৪৭৪ মিলিয়ন ডলার ফেরত দিয়েছে। একই সময়ে সুদ বাবদ ৯৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ও কমিশন বাবদ ১ দশমিক শূন্য ৬ মিলিয়ন ডলার দিতে হয়েছে।

গত কয়েক বছরে বিদেশি উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রামীণফোন, এয়ারটেল, সামিট গ্রুপ, বিএসআরএম স্টিলস, মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি, রিজেন্ট এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম, রবি, নেসলে, আবুল খায়ের, ইউনাইটেড গ্রুপ, বেক্সিমকো ইত্যাদি। এরা লাইবর হারের সঙ্গে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ যোগ করে গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পেয়েছিল, যা স্থানীয় ব্যাংকের সুদহারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

২০১০ সালে তিন মাসের লাইবর সুদ ছিল শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০১৫ সাল পর্যন্ত তা মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। লাইবর বাড়তে শুরু করে ২০১৬ সাল থেকে, যা চলতি বছরের মার্চে এসে ২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

২০১৫ সালে সামিট গ্রুপের কোম্পানি সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির কাছ থেকে ৬৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ নেয়। একই বছর দেশীয় তিন ব্যাংকের অফশোর ইউনিটের মাধ্যমে সামিট বিবিয়ানা-২ পাওয়ারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আনতে ২৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়। এর আগে ২০১৩ সালে কোম্পানিটি ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ নিয়েছিল। লাইবর হারের সঙ্গে যোগ করে এসব ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৫ থেকে ৬ শতাংশ। এখন এ সুদহার ১২ থেকে ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

২০১৩ সালে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ নেয় এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেড। ২০১৫ সালে আরো ৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণের অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। ভারতের এইচডিএফসি ব্যাংকের হংকং ইউনিট থেকে নেওয়া এ ঋণের সুদ দাঁড়ায় ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। ঋণ অনুমোদনকালীন ৬ মাসের লাইবর রেট ছিল শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা বর্তমানে ২ দশমিক ২২ হয়েছে। এ সময়ে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৭ শতাংশ। এ হিসেবে পয়েন্ট বেসিসে এ ঋণের সুদ এখন প্রায় ১২ শতাংশ।

বাংলাদেশ এডিবল অয়েল প্রক্রিয়াকরণ, পরিশোধন ও বিতরণের জন্য সিঙ্গাপুর থেকে ৯ মিলিয়ন ডলারের ঋণের অনুমোদন পায়, যার সুদ ছিল ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। চলতি মাসে এ সুদ ১৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

ভারতীয় কোম্পানি সিয়াট বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের উদ্দেশ্যে ২০১৫ সালে ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার অফশোর ইউনিট হংকং থেকে ৩৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়। সুদহার ছিল ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। চলতি মার্চে তা ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

গত বছরের মার্চে তালিকাভুক্ত কোম্পানি জিপিএইচ ইস্পাত ৯৪ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয় মোট ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ সুদে। বর্তমানে এ সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। এটি দেশের বেসরকারি খাতের মোট ঋণের ১০ দশমিক ১৫ এবং জিডিপির ৪ শতাংশ। ২০১০ সালে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এটি সে সময়ের বেসরকারি খাতের মোট ঋণের ৪ ও জিডিপির ২ শতাংশ ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে বাণিজ্যিক ঋণের গড় সুদ ছিল ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ১৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমে আসে। এরপর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশে নামে। আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়। যদিও তারল্য সঙ্কটের কারণে এখন সুদ আবার ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

এ বিষয়ে এমআই সিমেন্টের প্রধান নির্বাহী মাসুদ খান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে এখন কয়েক ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ঋণমূল্য ও সুদের হার বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে এ ঋণের দায়ও বেড়ে গেছে। এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে ভালোভাবেই পড়বে।

বিএসআরএম গ্রুপের কোম্পানি সচিব শেখর রঞ্জন কর বলেন, দুই বছর আগেও বিদেশি ঋণ সুদহারের কারণে স্বস্তিদায়ক ছিল। এখন লাইবর রেট বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় বেড়ে গেছে। তবে দেশীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিদেশি ঋণ এখনো বিনিয়োগ অনুকূল। এখন স্থানীয় উৎসের ঋণের সুদও বেড়ে গেছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads