• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
ইশ! খাবারে বিষ!

ছবি : সংগৃহীত

স্বাস্থ্য

বোটুলিজম

ইশ! খাবারে বিষ!

  • ফিচার ডেস্ক
  • প্রকাশিত ২১ জুন ২০১৮

ফুড পয়জনিং- সাদামাটা অর্থে খাদ্যে বিষক্রিয়া। অর্থাৎ আমরা যা খাচ্ছি তার সঙ্গে যখনই শরীরে ক্ষতিকর কিছু প্রবেশ করে তখনই ফুড পয়জনিংয়ের ঘটনা ঘটে। এর আবার নানান উৎস রয়েছে। তা হতে পারে কোনো ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার শরীর থেকে নিঃসৃত টক্সিন বা বিষ এমনকি রান্নাবান্নার ধাতব হাঁড়ি-পাতিল পর্যন্ত। যা হোক, চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী এযাবৎ কালের মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর ফুড পয়জনিংয়ের অন্যতম একটি হচ্ছে বোটুলিজম। আসুন জেনে নিই এ সম্পর্কে।

বোটুলিজম রোগে যুগ যুগ ধরে মানুষ আক্রান্ত হয়ে আসলেও এর কারণ চিহ্নিত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে। বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী এমিল ফন আরমেনজেন ১৮৯৭ সালে আবিষ্কার করেন ক্লস্টিডিয়াম বোটুলিনাম নামের এক ব্যাকটেরিয়াই বোটুলিজমের জন্য দায়ী। পরবর্তীতে আরো জানা গেল, স্যাঁতসেঁতে অল্প অক্সিজেন ও অল্প পরিমাণ অম্লযুক্ত পরিবেশই বোটুলিজম ব্যাকটেরিয়ার সবচেয়ে বেশি পছন্দ। ফলে আমাদের খাবার-দাবার দীর্ঘদিন অনুরূপ পরিবেশে থাকলে এ ব্যাকটেরিয়া সহজেই বংশবৃদ্ধি ও সংক্রমণ করতে পারে। কিন্তু, যখনই এর ব্যক্তিক্রম ঘটে তখনই এ ব্যাকটেরিয়া স্পোর আকার ধারণ করে, ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষায়। অনুকূল পরিবেশ পেলেই স্পোর ব্যাকটেরিয়ার অবয়ব ধারণ করে বংশবৃদ্ধি ও টক্সিন তৈরি শুরু করে।

বোটুলিজম ব্যাকটেরিয়া খাদ্যের মাধ্যমে বিষক্রিয়া ঘটানো ছাড়া অন্যান্যভাবেও আক্রান্ত করতে পারে মানবদেহকে। যখন বোটুলিজম ব্যাকটেরিয়া কোনো ক্ষতস্থানের মাধ্যমে শরীরে অনুপ্রবেশ করে তখন সেটাকে দ্রুত বোটুলিজম কিংবা শিশুরা যখন খাবার-দাবার বা ধুলা-বালির সঙ্গে এ ব্যাকটেরিয়া গিলে ফেলে তখন সেটাকে শিশুদের বোটুলিজম বলা হয়ে থাকে। কিন্তু, বোটুলিজম মূলত ফুড পয়জনিংয়ের জন্যই বেশি আলোচিত।

ফুড পয়জনিংয়ের মাধ্যমে শরীরে বোটুলিজম টক্সিন বা বিষ প্রবেশের পর ১৮ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে দেহে এর উপসর্গ প্রকোপ পেতে শুরু করে। প্রথম দিকে চোখে ঝাঁপসা দেখা, চোখের পাতা নেতিয়ে পড়া, কথাবার্তা জড়িয়ে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া কিংবা মাংসপেশির দুর্বলতার অভিযোগ থাকবে রোগীর। পরবর্তী সময়ে কোষ্ঠকাঠিন্য, বমির ভাব ও বমি। কিন্তু তার পরের পর্যায়টি মারাত্মক। এ পর্যায়ে বোটুলিজম টক্সিন শরীরের নার্ভ বা স্নায়ুগুলোর ওপর তার আক্রমণ শুরু করে। এ পর্যায়ে মাথা থেকে শুরু করে সারা শরীরের মংসাপেশিগুলো দুর্বল ও কাহিল হয়ে পড়ে। অবশ হয়ে যায় শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়ক মাংসপেশিগুলোও। এ পর্যায়ে রোগীর মৃত্যুবরণের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

বোটুলিজম যতটা ভয়ঙ্কর ততটাই আনকমন। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতিবছর মাত্র শ’খানেক রোগী বোটুলিজমে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশের কোনো তথ্য উপাত্ত নেই। স্নায়ুকে আক্রমণ করে বলে রোগ নির্ণয়ের বেলায় চিকিৎসকদের স্নায়ুযন্ত্রের অন্যান্য রোগের কথাও মাথায় রাখতে হয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য আক্রান্ত রোগীর রক্তের সিরাম ইঁদুরের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেখতে হয় বোটুলিজমের উপসর্গ উক্ত ইঁদুরের দেহেও শুরু হলো কি না? অথবা রোগীর সন্দেহজনক খাদ্য কিংবা রোগীর মল থেকে বোটুলিজম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নির্ণয়। অ্যান্টিবায়োটিক বোটুলিজম ব্যাকটেরিয়ার ওপর সরাসরি কোনো কাজ করে না। বোটুলিজম অ্যান্টি-টক্সিন রোগীর শিরাপথে প্রবেশ করলে তা রক্তের বোটুলিজম টক্সিনের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকরী। শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়ক মাংসপেশি আক্রান্ত হলে চিকিৎসা হলো ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস মাত্র। এ ছাড়া অন্যান্য লক্ষণসমূহের নিজস্ব কিছু চিকিৎসা তো আছেই। বোটুলিজমের চিকিৎসা কেবল হাসপাতালেই সম্ভব।

বোটুলিজমের বিরুদ্ধে টিকা আবিষ্কার হলেও তা খুব প্রচলিত নয়। বরং খাবার-দাবারে সতর্কতাই বোটুলিজমের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক। টিনজাত খাবারের টিন যদি মরচে পড়া হয় বা এর কোনো অংশ ফুটো থাকে তাহলে না খাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। উচ্চ তাপমাত্রা বোটুলিজম টক্সিনকে ধ্বংস করতে পারে। তাই ঘরে রাখা টিনজাত খাদ্য ১০ মিনিট সেদ্ধ করে তারপর খেতে হবে। আর বাচ্চাদের বেলায় একটি বাড়তি সতর্কতা- ১ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদেরকে মধু খাওয়ালে বোটুলিজম হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ফলে তা এড়ানোই ভালো। কিন্তু সবশেষে আবারো বলতে হয়, বোটুলিজম মারাত্মক বা ভয়ঙ্কর কিন্তু খুব সচরাচর এর সংক্রমণ হয় না।

ডা. ফজলে রাব্বী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads