• সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

ফাইল ছবি

ইতিহাস-ঐতিহ্য

বারোভুঁইয়াদের বীরত্বগাথা

  • প্রকাশিত ১৬ এপ্রিল ২০১৮

ইতিহাসবিদদের মতে, বারোভুঁইয়া বলতে আসলে ঠিক বারোজন নয়। এ ক্ষেত্রে অসংখ্য বোঝাতেই বারো শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলায় আফগান শাসন এবং পরবর্তীতে মুঘল শাসনের মধ্যবর্তী সময়ে এইসব ভুঁইয়ারা বাংলার নিয়ন্ত্রণক্ষমতা নিজেদের হাতে রেখেছিলেন। এমনকি তারা পরাক্রমশালী মুঘল শাসক আকবর ও জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

বারোভুঁইয়ারা কখনো যৌথভাবে এবং বেশিরভাগ সময় পৃথকভাবে মুঘল আগ্রাসন প্রতিহত করেছিলেন এবং স্বাধীন বা অর্ধ-স্বাধীন শাসকরূপে তাদের নিজ নিজ এলাকা শাসন করেছিলেন। সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না, কিংবা থাকলেও সেটা ছিল নামমাত্র।

আধুনিক পণ্ডিতদের অনেকেই মনে করেন, বারোভুঁইয়া বলতে ঠিক বারোজনকেই বোঝায়। সে সময়ে বাংলাকে অসংখ্য ভুঁইয়া শাসন করলেও বারোজন ভুঁইয়াকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়। কারণ এই বারোজন মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছিলেন। আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ এবং মির্জা নাথানের ‘বাহারিস্তান-ই-গায়েবী’র বরাত দিয়ে তারা এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তবে, জানা গেছে সম্রাট আকবরের পর জাহাঙ্গীরের আমলেই বাংলার ভুঁইয়ারা মুঘল শাসনের আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হন।

বারো ভুঁইয়াগণ কোনো রাজপরিবারের বংশধর ছিলেন না। তারা ছিলেন জমিদার বা জমির মালিক এবং দেশপ্রেমিক। অদম্য সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে তারা দীর্ঘ তিন যুগ ধরে মুঘল আগ্রাসন প্রতিহত করেছিলেন। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দের পর ইসলাম খান তাদেরকে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেন। এরপর বারোভুঁইয়া নামটি শুধু লোককাহিনী এবং ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেয়। বারোভুঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজনের বীরত্বগাথা-

 

ঈসা খাঁ (১৫২৯-১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দ)

বাংলার বারোভুঁইয়াদের মধ্যে যিনি বীরত্বে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি ঈসা খাঁ। তার সময়ে অন্যান্য ভুঁইয়ারা তাকেই নেতা মনে করতেন। ঈসা খাঁ ছিলেন সরাইলের জমিদার, ভাটি অঞ্চলের শাসক এবং বারোভুঁইয়াদের নেতা।

ঈসা খাঁর দাদা বাইশ রাজপুত সম্প্রদায়ভুক্ত ভগীরথ প্রথমে অযোধ্যা থেকে বাংলায় এসে সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদের অধীনে দেওয়ানের চাকরি গ্রহণ করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর পুত্র কালিদাস গজদানী পিতার দেওয়ান পদ লাভ করেন। পরবর্তীতে কালিদাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সোলায়মান নাম ধারণ করেন এবং সুলতানের কন্যা সৈয়দা মোমেনা খাতুনকে বিয়ে করে সরাইলের জমিদারি লাভ করেন। এ সময় জন্ম হয় তাদের পুত্র ঈসা খান ও ইসমাইল খানের।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদের মৃত্যুর পর জামাতা সোলায়মান নিজেকে বৈধ উত্তরাধিকারী দাবি করে নবপ্রতিষ্ঠিত আফগান শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আফগান শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত ও নিহত হন এবং তার দুই পুত্র ঈসা ও ইসমাইলকে বন্দি করে ইরানি বণিকদের নিকট দাসরূপে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে তাজ খান কররানী বাংলা ও বিহারের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করলে, ঈসা খানের চাচা কুতুব খান তার অনুগ্রভাজন হন এবং দরবারি কাজে নিযুক্ত হন। এ সময়ে তিনি তার ভ্রাতুষ্পুত্রদ্বয়ের (ঈসা ও ইসমাইল) খোঁজ পেয়ে অর্থের বিনিময়ে ইরানি বণিকদের কাছ থেকে তাদের মুক্ত করে আনেন।

ঈসা খান দেশে ফিরে এসে চাচা কুতুব খানের প্রচেষ্টায় তার পিতার সরাইলের জমিদারি লাভ করেন। ১৫৬৫ সালে তাজ খান কররানীর মৃত্যুর পর ঈসা খান আফগান শাসকদের মুঘল আক্রমণ মোকাবিলায় সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন। ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ত্রিপুরার রাজা উদয়মানিক্যের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম অভিযানে দাউদ খানকে সাহায্য করেন। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সোনারগাঁওয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মুঘল নৌবহরকে বিতাড়িত করতেও দাউদ খানের সেনাপতিকে সাহায্য করেন।

১৫৭৬ সালে রাজামহলের নিকটবর্তী আগমহলের যুদ্ধে দাউদ খান কররানী পরাজিত ও নিহত হলে কার্যত বাংলায় আফগান শাসনের অবসান হলেও ঈসা খান এ সময়ে প্রায় স্বাধীনভাবেই তার রাজ্য পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু তিনি যথার্থভাবেই অনুধাবন করেন যে, নিজের সীমিত শক্তি দিয়ে একা মুঘলদের মোকাবিলা করতে পারবেন না। তাই তিনি পার্শ্ববর্তী জমিদার ও আফগান দলপতিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদের সঙ্গে মুঘলবিরোধী রাজনৈতিক ও সামরিক মৈত্রী গঠন করেন। তিনি প্রতিবেশী ত্রিপুরা ও কামরূপের রাজা যথাক্রমে অমরমাণিক্য ও রঘুদেবের সঙ্গেও বন্ধুত্ব সম্পর্ক স্থাপন করেন। এ ছাড়াও ঈসা খান তার সামরিক শক্তির প্রধান অবলম্বন রণতরীগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করেন।

১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সুবাহদার খান জাহান ঈসা খানের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে ভাওয়ালে সৈন্যশিবির স্থাপন করলে ঈসা খান সরাইল সন্নিকটবর্তী কাস্তলে (কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত) মুঘল বাহিনীকে মোকাবিলা করেন। যুদ্ধের প্রথমদিকে ঈসা খান পরাজিত হয়ে ত্রিপুরা রাজ অমর মানিক্যের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ত্রিপুরার সাহায্য আসলে মুঘল বাহিনী পশ্চাৎপসরণ করে। রাজমালার বর্ণনা অনুসারে, আনুমানিক ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার রাজা অমর মানিক্যের ‘অমর সাগর দিঘি’ খননের জন্য অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হলে তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে ঈসা খান এক হাজার শ্রমিক পাঠিয়ে ত্রিপুরার রাজাকে সাহায্য করেছিলেন। তা ছাড়াও, ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি অমর মানিক্যের নৌবাহিনীর অধ্যক্ষরূপে তরফের জমিদার ফতেহ খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে মুঘল সেনাপতিদের বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে ঈসা খান পূর্ব বাংলায় তার শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন। তিনি ১৫৮১-৮২ খ্রিস্টাব্দে নিজেকে ভাটি অঞ্চলের অধিপতি হিসেবে ঘোষণা দেন এবং নিজেই ‘মসনদ-ঈ-আলা উপাধি’ গ্রহণ করেন। সূত্র অনুযায়ী, এ সময় তিনি তার প্রশাসনিক কেন্দ্র সরাইল থেকে সোনারগাঁওয়ে স্থানান্তর করেন এবং সোনারগাঁওয়ের নিকটবর্তী কাত্রাবো, কলাগাছিয়া ও খিজিরপুরে দুর্গ নির্মাণ করেন।

ইতোমধ্যে সম্রাট আকবরের দুই বিদ্রোহী সেনাপতি মাসুম খান কাবুলী ও কতলু খান ঈসা খানের সঙ্গে যোগ দেন। সম্রাট আকবর ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি আজমকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করে মুঘল সেনাপতিদ্বয়ের আশ্রয়দাতা ঈসা খান মসনদ-ই-আলার বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ দেন। এ সময় মুঘল সেনাপতি শাহবাজ খানের সঙ্গে টোকে এবং তারসুন খানের সঙ্গে বাজিতপুরে ঈসা খানের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মুঘল বাহিনী পরাজিত হয়। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সেনাপতি শাহবাজ খান পুনরায় ঈসা খানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় যুদ্ধক্ষেত্র ঢাকা, বিক্রমপুর, সোনারগাঁও, কাত্রাবো প্রভৃতি এলাকায় বিস্তৃত ছিল। মুঘলদের সঙ্গে সংঘর্ষের এ পর্বেও ঈসা খান সাফল্য লাভ করেন। এ সময় তিনি প্রায় সম্পূর্ণ ভাটি এলাকায় নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করে লক্ষ্যা নদীর তীরে কাত্রাবোয় তার রাজধানী স্থাপন করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই ঈসা খান বারোভুঁইয়াদের নেতৃত্ব লাভ করেন।

১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে ঈসা খান কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ির সামন্তরাজা লক্ষণ হাজরাকে পরাজিত করেন। এ বছর মুঘল সুবাহদার শাহবাজ খান পুনরায় ঈসা খানের বিরুদ্ধে ভাটিতে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু মুঘলদের এ অভিযানও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের সাথে ঈসা খানের যুদ্ধ হয়। ১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহ সুবাহদার নিযুক্ত হয়ে বাংলায় আসেন এবং ঈসা খানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে সচেষ্ট হন। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে মানসিংহ রাজমহল থেকে ঈসা খানের বিরুদ্ধে যাত্রা করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হয়নি। ১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মানসিংহ ঈসা খানের বিরুদ্ধে স্থল ও জলপথে দুটি বাহিনী প্রেরণ করেন। মানসিংহের পুত্র দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী প্রথম দিকে কিছুটা সাফল্য অর্জন করেন। এমনকি তারা ঈসা খানের রাজধানী কাত্রাবোও আক্রমণ করে। ঈসা তার মিত্র বাহিনীসহ অনেক নৌকা নিয়ে বিক্রমপুর থেকে ছয় ক্রোশ দূরে উপস্থিত হন এবং মুঘল নৌবাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেললে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হয় (সেপ্টেম্বর, ১৫৯৭)। যুদ্ধে দুর্জন সিংহসহ মুঘল বাহিনীর অনেকে নিহত হয় এবং অনেক মুঘল সৈন্য ঈসা খানের হাতে বন্দি হয়। এরপর মুঘল বাহিনীর সঙ্গে ঈসা খানের আর কোনো যুদ্ধ হয়নি।

ঈসা খানের জীবদ্দশায় মুঘল সম্রাট আকবর পূর্ব বাংলার ভাটি অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এ সময় ঈসা খান ভাটির বিশাল অংশে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সে অঞ্চলকে একটি স্বাধীন রাজ্যে পরিণত করেন। সূত্র মতে, সে সময় ভাটি অঞ্চলের ২২টি পরগণা সরাসরি ঈসা খানের শাসনাধীন ছিল। ঈসা খানের মৃত্যু হয় ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads