• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

ছবি : সংগৃহীত

ইতিহাস-ঐতিহ্য

মসলিনের উত্তরসূরি ঢাকাই জামদানি

  • মনিরা তাবাস্সুম
  • প্রকাশিত ১৭ এপ্রিল ২০১৮

শাড়ি পরতে ভালোবাসেন এমন কারো সংগ্রহে অন্তত একটি জামদানি শাড়ি থাকবে না, এমন কথা ভাবাই যায় না। আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই জামদানি শাড়ি। যার জন্য নারীদের ভালোবাসা একটু অন্যরকম। বহু প্রাচীন আমল থেকেই এটি আভিজাত্যের প্রতীক।

ঢাকাই জামদানি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শনের নাম। জামদানি বিখ্যাত ছিল তার বিচিত্র নকশার কারণে। প্রতিটি নকশার ছিল ভিন্ন ভিন্ন নাম। পান্নাহাজরা, কচুপাতা, আঙুরলতা, বুটিদার, দুবলিজাল, কলমিলতা, পুঁইলতা, কল্কাপাড়, তেরসা, ঝালর, ময়ূরপাখা, প্রজাপতি, শাপলা ফুল, জুঁইবুটি, চন্দ্রপাড়, হংসবলাকা, শবনম, ঝুমকা, জবা ফুল এমনি নানা রকম নাম ছিল এসব নকশার। ভিন্ন জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের বুনন শিল্প হিসেবে প্রাচ্যের বুনন শিল্পে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল জামদানি মোটিভ। যা নিজস্ব স্বকীয়তায় কয়েক শত বছর ধরে ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের বাহক এই জামদানির আছে নানা ইতিহাস। ঢাকাই জামদানির ইতিহাস ঢাকার ইতিহাসের চেয়েও পুরনো। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভবত মুসলমানরাই জামদানির বুনন প্রক্রিয়াটি প্রথম প্রচলন করেন এবং এখনো তাদের হাতেই এ শিল্প একচেটিয়াভাবে সীমাবদ্ধ আছে। জামদানি হলো কার্পাস তুলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের সূক্ষ্ম বস্ত্র। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ির আবির্ভাব। মসলিনের ওপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। বিভিন্ন মত অনুসারে, ‘জামদানি’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। ফারসি জামা অর্থ কাপড় এবং দানা অর্থ বুটি, সে অর্থে জামদানি অর্থ বুটিদার কাপড়।

জামদানি শাড়ির প্রকৃত অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছিল মধ্যযুগের মুসলিম আমলেই। আসলে পারস্য ও মুঘল- এই দুটি মিশ্র সংস্কৃতির ফসল এই শাড়ি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামদানির ব্যবসা মুসলমানরাই শুরু করেছিলেন। দীর্ঘদিন এবং একচেটিয়াভাবে তারাই এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। ঢাকা, সোনারগাঁ, ধামরাই, বাজিতপুর ছিল জামদানি ও মসলিন কাপড়ের জন্য ঐতিহাসিক স্থান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সোনারগাঁ বন্দরের মাধ্যমে মসলিনের মতো সূক্ষ্ম-বস্ত্র ইউরোপে রফতানি হতো।

ঢাকাই মসলিনের স্বর্ণযুগ বলা হয় মুঘল আমলকে। এ সময় দেশ-বিদেশে মসলিন, জামদানির চাহিদা বাড়তে থাকে এবং শিল্পেরও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। সে সময় নানারকম নকশা করা মসলিন ও জামদানি দিল্লি, লক্ষ্নৌ ও মুর্শিদাবাদে চড়াদামে বিক্রি হতো। আঠারো শতকে ইংরেজ দলিল থেকে জানা যায়, মলমল খাস ও সরকার-ই-আলি নামে মসলিন সংগ্রহ করার জন্য দারোগা-ই-মলমল পদবির উচ্চ পর্যায়ের রাজ কর্মচারী নিযুক্ত ছিলেন। সে সময় প্রতিটি তাঁতখানায় একটি দফতর ছিল এবং এখানে দক্ষ তাঁতি, নারদিয়া, রিপুকার প্রভৃতি কারিগরদের নিবন্ধন করে রাখা হতো। দারোগার প্রধান কাজ ছিল মসলিন ও জামদানি তৈরির বিভিন্ন পদক্ষেপে লক্ষ রাখা। তৎকালীন সময়ে ঢাকা থেকে প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যমানের মলমল-খাস মুঘল দরবারে রফতানি করা হতো। ১৭৪৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, দিল্লির বাদশাহ, বাংলার নবাব ও জগৎ শেঠের জন্য প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার জামদানি কেনা হয়। এ ছাড়া ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা প্রায় ৯ লাখ টাকার মসলিন কেনে। প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ১৪ শতকে লেখা তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে সোনারগাঁয়ের বস্ত্র শিল্পের প্রশংসা করতে গিয়ে মসলিন ও জামদানির কথা বলেছেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে জামদানি দিয়ে নকশাওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। এ ছাড়া মুঘল ও নেপালের আঞ্চলিক পোশাক রাঙ্গার জন্যও জামদানি কাপড় ব্যবহূত হতো। বাদশাহ্ আওরঙ্গজেব ছিলেন জামদানির বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। মুর্শিদাবাদের নবাবরাও জামদানির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

তবে আঠারো শতাব্দীর শেষের দিকে মসলিন রফতানি অনেকাংশে হ্রাস পায়। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে। তাঁতিদের ওপর তখন নানা রকম অত্যাচার শুরু হয়। কম মূল্যে কাপড় বিক্রি করতে রাজি না হলে তাদের মারধর করা হতো। সে সময় ধীরে ধীরে জামদানি শিল্প সংকুচিত এবং পরে বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবকেই দায়ী করা হয়। শিল্প বিপ্লবের ফলে বস্ত্র শিল্পে যন্ত্রের আগমন ঘটে এবং কম মূল্যে ছাপার কাপড় উৎপাদন শুরু হয়। দেশীয় সুতার চেয়ে তখন বিলেতি সুতার দাম কম থাকায় দ্রুত বাজার তৈরি হয় সেসব কাপড়ের। ফলে ধীরে ধীরে জামদানি শিল্প তার জৌলুস হারাতে থাকে।

প্রাচীনকাল থেকেই সোনারগাঁ অঞ্চলটিই ছিল জামদানির ব্যাপক উৎপাদন কেন্দ্র। বর্তমানে রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ এবং সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ১৫৫টি গ্রামে এই শিল্পের নিবাস। প্রাচীন সময়ে জামদানি বয়নে একমাত্র মুসলিম কারিগররাই ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। এখনো মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকই এই শিল্পে দক্ষতার সঙ্গে জড়িত। জামদানি শিল্পীদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

জামদানি শিল্প রক্ষায় ১৯৯২ সালে বিসিক জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করে। প্রায় ৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বিসিক নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো ইউনিয়নের নোয়াপাড়ায় ২০ একর জমির ওপর জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এই শিল্পনগরীতে ৪০৯টি শিল্প প্লট রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে বরাদ্দকৃত ৩৯৯টি প্লটের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৬৩টি শিল্পকারখানা স্থাপিত হয়েছে। তাঁতিদের নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য সাপ্তাহিক হাটের ব্যবস্থা রয়েছে। সপ্তাহে প্রতি বৃহস্পতিবার এ হাটে উদ্যোক্তারা জামদানি কারুশিল্পীদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছেন।

সূক্ষ্মবস্ত্র হিসেবে এককালে পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশের মসলিন। এই সৃষ্টিশীল বস্ত্র ছিল সারা দুনিয়ার বিস্ময়, বাংলাদেশের গর্ব ও মর্যাদার বস্তু। সেই মসলিনেরই উত্তরসূরি আজকের জামদানি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads