• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

ছবি : সংগৃহীত

ইতিহাস-ঐতিহ্য

মসলিন : কাপড় নয়, যেন আলো ও ভোরের কুয়াশা

  • প্রকাশিত ১৭ এপ্রিল ২০১৮

বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং মসলিনকে তুলনা করেছিলেন ভোরের হালকা কুয়াশার সঙ্গে। সপ্তদশ শতাব্দীর ফরাসি রত্ন ব্যবসায়ী ও পরিব্রাজক জাঁ-বাপতিস্ত তার্ভেনিয়া মসলিন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘মনে হয় একটা মাকড়সার জাল। এতই সূক্ষ্ম যে হাতে ধরলে প্রায় বোঝা যায় না কী ধরেছি।’ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে একে বলা হয়েছিল, ‘বোনা বাতাস’; যেন সেলাই করে বাতাসের কাপড় বানিয়ে দিয়েছে কেউ। দৃকের প্রধান নির্বাহী সাইফুল ইসলাম মসলিনকে তুলনা করেছেন আলোর সঙ্গে। তিনি দীর্ঘদিন মসলিন নিয়ে গবেষণা করছেন। এক লেখায় তিনি লিখেছেন, বিদেশের গ্যালারিতে কাচের ভিতর দিয়ে মসলিন দেখেছি, মনে হচ্ছে ভিতর থেকে আলো বেরোচ্ছে।

বাংলাদেশে এমন কেউ নেই যিনি একটু বড় হওয়ার পর, একটু লেখাপড়া শেখার পর শোনেননি মসলিন কী? ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের ছেলেমেয়ে জেনে যায় মসলিন হচ্ছে অতি সূক্ষ্ম, অতি হালকা এক কাপড়, যা একটা আঙটির ভিতর দিয়েও চলে যায়, একটা ম্যাচবক্সের ভিতরই জায়গা নিয়ে নিতে পারে আস্ত একটা মসলিন কাপড়। কিন্তু, সেই মসলিন আসলে কী! দেখতেই-বা কীরকম দু-একটি ছবি দেখা ছাড়া তার সম্পর্কে সঠিক ধারণা হয়তো অনেকেরই নেই। মসলিন হারিয়ে গেছে ২০০ বছর আগে। এখন তা পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। খুব সৌভাগ্যবান হলে জাদুঘরে গিয়ে সেসব দেখা যায়। তবে, সংরক্ষিত বলে ছোঁয়া যায় না।

ধারণা করা হয়, ইরাকের ব্যবসাকেন্দ্র মসুল থেকে ‘মসলিন’ শব্দটি এসেছে। মসুলের সূক্ষ্ম কাপড়কে ইউরোপীয় বণিকরা বলতেন ‘মসুলি’। সবচেয়ে সূক্ষ্ম মসলিনের নাম ছিল মলমল। বিদেশি পর্যটকরা এই মসলিনকে কখনো কখনো মলমল শাহী বা মলমল খাস নামে উল্লেখ করেছেন। অনেক সময় দু-তিনটি পরিবার একসঙ্গে মিলে একটিমাত্র কাপড় বুননের কাজ করত। ঢাকার তাঁতিদের তৈরি কাপড়ের মান বিভিন্ন ধরনের হতো। সম্রাট, উজির, নওয়াব প্রমুখ অভিজাত শ্রেণির জন্য বোনা হতো সূক্ষ্ম ও মিহি বস্ত্র এবং দরিদ্রদের জন্য মোটা ও ভারী কাপড়। কাপড়ের সূক্ষ্ম ও স্বচ্ছ, উৎপাদনের উৎস এবং ব্যবহার ভেদে ঢাকাই মসলিনের বিভিন্ন নাম দেওয়া হতো। নামগুলো ছিল মলমল (সূক্ষ্মতম বস্ত্র), ঝুনা (স্থানীয় নর্তকীদের ব্যবহূত বস্ত্র), রঙ্গ (স্বচ্ছ ও জালিজাতীয় বস্ত্র), আবি-রাওয়ান (প্রবহমান পানির তুল্য বস্ত্র), খাস (বিশেষ ধরনের মিহি বা জমকালো), শবনম (ভোরের শিশির), আলাবালি (অতি মিহি), তনজিব (দেহের অলঙ্কার সদৃশ), নয়ন-সুখ (দর্শন প্রীতিকর), বদন-খাস (বিশেষ ধরনের বস্ত্র), শিরবন্দ (পাগড়ির উপযোগী), কামিজ (জামার কাপড়), ডোরিয়া (ডোরা কাটা), চারকোনা (ছক কাটা বস্ত্র), জামদানি (নকশা আঁকা) ইত্যাদি।

একসময় মসলিন পরতেন পৃথিবীর বিখ্যাত রাজা-বাদশাহ ও রানিরা। টিপু সুলতান থেকে শুরু করে ওলন্দাজ রানিরাও পরেছেন মসলিনের পোশাক। চীন থেকে রোম-মিসর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল তার খ্যাতি। না, সাধারণ মানুষের তা পরার সৌভাগ্য হতো না, নিঃসন্দেহেই। একটি মসলিন কাপড় বুনতে সময় লাগত ছয়মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত। অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য। তবে সাধারণ তাঁতিরাই তা বুনতেন। এই ঢাকা জেলার আশপাশে, গাজীপুর, ধামরাই, কাপাসিয়া, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁয়ের আশপাশের অঞ্চলে। মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রের তীর ধরেই জন্মাত একসময় সেই মসলিন তুলা উৎপাদনের ফটি গাছ। গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির লেখায়ও উল্লেখ আছে মসলিনের কথা। ঢাকার অদূরে নরসিংদী জেলায় উয়ারী-বটেশ্বর আবিষ্কার হওয়ার পর এটা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে, সেই সুপ্রাচীনকাল থেকেই, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে থেকেই গাঙ্গেয় বদ্বীপের এ অঞ্চল থেকে মসলিন নিয়ে পালতোলা জাহাজ যেত পৃথিবীর বিখ্যাত সব বন্দরে। মুঘল আমলেই মসলিনের বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জিত হয়। ইংরেজ, ওলন্দাজ, ফরাসি বণিকরা স্বীকার করেছেন মসলিন একেবারেই ঢাকা ও তার আশপাশের অঞ্চলের আশ্চর্য এক সূক্ষ্ম সুতো। ইসা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁয়ের খ্যাতি ছিল মসলিনের জন্যই। মসলিন কাপড়ের বাণিজ্য করার জন্যই একসময় ঢাকায় গড়ে উঠেছিল ইউরোপিয়ানদের বাণিজ্যকুঠি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক প্রয়োজন ছাড়া আর কারো জন্য যেন কোনো তাঁতি মসলিন কাপড় না বানাতে পারে- এই জন্য ইংরেজরা মসলিন শিল্পীদের হাত কেটে দিয়েছিল বলেও জনশ্রুতি আছে।

কিন্তু কীভাবে হারিয়ে গেল বাংলার এ ঐতিহ্য মসলিন? তা কি শুধু আবহাওয়ার কারণে, নাকি সত্যিই এর পেছনে আছে কোনো বিদেশি চক্রান্ত? মসলিন তুলা যে গাছ থেকে জন্ম হয় সেই ফুটি কার্পাস প্রজাতিটিই একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বাংলাদেশের ভূমি থেকে। কাছাকাছি প্রজাতির কিছু তুলা নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে আগের মতো আর কিছুতেই হয় না। সে রকম দক্ষ কারিগর নেই, থাকলেও সুতা কাটার সূক্ষ্ম শানা তৈরি হয় যে বাঁশ থেকে সেই বাঁশই নেই। তারপরও বহুভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। নিরলসভাবে এ কাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন যিনি লেগে আছেন তিনি দৃকের প্রধান নির্বাহী সাইফুল ইসলাম। তারই উদ্যোগে এবং আড়ং ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় দু’বছর আগে ঢাকায় প্রথমবারের মতো জাতীয় জাদুঘরে বসেছিল মাসব্যাপী ‘মসলিন পুনরুজ্জীবন’ শীর্ষক প্রদর্শনী। এ উপলক্ষে অনেক দেশি-বিদেশি মসলিন গবেষক এক হয়েছিলেন।

মসলিন ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা গেলে বাংলাদেশের এক সোনালি অধ্যায় পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হবে।

সারা বিশ্বের কাছে এখন বাংলাদেশের পরিচিতি গার্মেন্ট কারখানার দেশ হিসেবে, তাকে অনেকে বলেন দর্জির দোকান। কিন্তু, কাপড় নিয়ে একসময় এ অঞ্চলের মানুষের কীরকম ঐতিহ্য ছিল মসলিনই তার নিদর্শন। মসলিন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়, রেশমের মতো তা সমগ্র পৃথিবীরই সম্পদ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads